৯/১১ পরবর্তী যুদ্ধগুলো থেকে যে শিক্ষা নেননি ট্রাম্প
ক্যালেন্ডারের পাতায় আজ এক বিশেষ দিন। সেপ্টেম্বরের ১১ তারিখ ঘটনাবহুল নাইন-ইলেভেন দিবস।
আজ থেকে ২৫ বছর আগে, ২০০১ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির গর্ব নিউইয়র্কের লোয়ার ম্যানহাটনের দৃষ্টিনন্দন বিশ্ব বাণিজ্যকেন্দ্রের ১১০-তলা টুইন টাওয়ার সন্ত্রাসী হামলায় ধসে পড়ে।
ওই এক হামলার ঘটনায় মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে আসে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ এবং পরবর্তীতে অন্যান্যরা ধাপে ধাপে নিজেদের যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা বাড়িয়েছেন।
এখন কার্যত মার্কিন প্রেসিডেন্টরা যখন ইচ্ছা, যেখানে ইচ্ছা সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে পারেন, বিষয়টি বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে বিশ্ববাসী হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।
আজ শুক্রবার সিএনএনের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে কীভাবে সেই ২৫ বছর আগের ঘটনা এখনো মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিকে প্রভাবিত করছে।
মার্কিন কমান্ডার-ইন-চিফের প্রায় ‘অসীম’ ক্ষমতা
প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক ‘অভিযান’ চালিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামের এই অভিযান প্রমাণ করেছে মার্কিন সেনাবাহিনীর ‘কমান্ডার-ইন-চিফ’ কতটা ক্ষমতাবান। বলাই বাহুল্য, এই পদটি মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য বরাদ্দ।
ট্রাম্প মোটামুটি একক সিদ্ধান্তেই এই যুদ্ধ শুরু করেন, যদিও তিনি নিজে বা তার কর্মকর্তারা একে যুদ্ধ বলতেই রাজি নন। তার ভাষায়, ইরান ‘বিশ্বের এক নম্বর সন্ত্রাসের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্র’। কংগ্রেসের অনুমোদন, ন্যাটো মিত্রদের সমর্থন বা জাতিসংঘে কোনো প্রস্তাব উত্থাপন না করেই চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নামেন তিনি।
ছয় মাস গড়ানোর পর নিশ্চিত করেই বলা যায়, আধুনিক যুগে এটাই সবচেয়ে ‘অজনপ্রিয় যুদ্ধ’। অন্তত মার্কিন জনগণ তাই মনে করেন। বিভিন্ন জরিপে এই যুদ্ধের প্রতি জনসমর্থনের করুণ দশা ফুটে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মত, ইরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কোনো ধরনের হুমকির প্রমাণ নেই।
৯/১১ পরবর্তী যুগে বেশ কয়েকটি ব্যর্থ যুদ্ধে অংশ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্লেষকদের মত, অতীতের এসব যুদ্ধ থেকে ট্রাম্প কোনো শিক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করেননি।
হয়তো ভেবেছিলেন একদিনের হামলাতেই কুপোকাত হবে ইরানের শাসকগোষ্ঠী। ভেঙে পড়বে ইরানিদের মনোবল, ধ্বংস হবে পরমাণু প্রকল্প ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা।
কিন্তু বাস্তবতা এখন পুরোপুরি ভিন্ন।
ট্রাম্পের অপরিণামদর্শিতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র এখন এমন এক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে, যেখান থেকে বিজয়ীর বেশে বের হয়ে আসা প্রায় অসম্ভব।
ট্রাম্পের পূর্বসূরীদের ভূমিকা
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রশিক্ষিত সামরিক বাহিনী দীর্ঘদিন ধরেই ধ্বংসযজ্ঞ চালানো ও মানুষ হত্যায় দক্ষ।
তবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, স্পষ্ট কোনো সামরিক বা রাজনৈতিক লক্ষ্য না থাকায় তাদের যুদ্ধকৌশল নিদারুণ ব্যর্থতার জন্ম দিয়েছে।
লক্ষ্য ঠিক না থাকায় দেশটি ভিয়েতনামের জটিল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে, ইরাকে সাম্প্রদায়িক গৃহযুদ্ধের জন্ম দিয়েছে, যার ধারাবাহিকতায় শেষ পর্যন্ত আইসিসের উত্থান হয়েছে, কিংবা ইরান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
ইরান যুদ্ধের ভিত্তি তৈরিতে ট্রাম্পের পূর্বসূরিদের বড় ভূমিকা আছে।
৯/১১-এর পরের কয়েক মাসে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ মূলত আফগানিস্তানের তালেবান ও আল-কায়েদার বিরুদ্ধে শুরু হলেও খুব অল্প সময়ের মধ্যে এটি বড় আকারে ছড়িয়ে পড়ে। ওই যুদ্ধে জাতিসংঘ ও ন্যাটো মিত্রদের সমর্থন ছিল। পরে এর আওতা বাড়িয়ে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের ‘আগাম হামলা’ ও ‘আগাম যুদ্ধের’ নীতিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যে নীতির ভিত্তিতে ২০০৩ সালে ইরাকে আগ্রাসন চালানো হয়।
ওই আগ্রাসনের পর ইরাকে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, যাতে আনুমানিক দুই লাখ বেসামরিক মানুষ নিহত হন।
পরবর্তীতে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ আওতা আরও বাড়িয়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা পাকিস্তান ও ইয়েমেনের মতো দেশের বিরুদ্ধেও ব্যাপকভাবে সশস্ত্র ড্রোন হামলা চালান।
এসব দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ চলছিল না। তা সত্ত্বেও মার্কিন হামলায় হাজারো ‘সন্দেহভাজন সন্ত্রাসী’ এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বেসামরিক মানুষ নিহত হন।
জাতিসংঘ ও ন্যাটোর সমর্থন নিয়ে ২০১১ সালে লিবিয়ার স্বৈরশাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে ক্ষমতা থেকে সরাতে সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন ওবামা। তবে তিনি কংগ্রেসের অনুমোদন নেননি।
গাদ্দাফির পতনের পর লিবিয়ায় যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, তা এক দশক স্থায়ী হয়। দেশটি এখনো বিভক্ত এবং বর্তমানে দুটি সরকার দেশটির বিভিন্ন অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে।
পরে ওবামা মত দেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিল গাদ্দাফির পতনের পর কী ঘটবে, সে বিষয়ে পরিকল্পনা না করা।
সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক যুদ্ধ
‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক যুদ্ধের’ সময় যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন কৌশল কাজে লাগিয়েছে, যার কয়েকটি ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে বুশের ইরাক আগ্রাসন এবং এর দেড় দশকেরও বেশি সময় পর আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ব্যর্থতা, যার পেছনে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট, উভয় দলেরই ভূমিকা ছিল।
আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের চুক্তিটি ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের সময়ে করা হয়েছিল। পরবর্তীতে তা বাস্তবায়ন করেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।
আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর যা হওয়ার কথা ছিল, সেটিই হয়েছে, কট্টরপন্থি তালেবান গোষ্ঠী দেশটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।
ইরাক যুদ্ধ ও আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের ব্যর্থতায় পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বিশ্বের পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের দুর্বলতার পরিচয় দেয়। এতে বিশ্বজুড়ে দেশটির অবস্থান দুর্বল হয়েছে।
তবে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের কিছু বাস্তব সাফল্যও ছিল। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীদের খুঁজে বের করে হত্যার ক্ষেত্রে একটি কার্যকর আধাসামরিক সংস্থায় পরিণত হয় সিআইএ।
জয়েন্ট স্পেশাল অপারেশনস কমান্ড তুলনামূলকভাবে দুর্বল একটি সন্ত্রাসবিরোধী বাহিনী থেকে ব্যাপক মাত্রায় হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করতে সক্ষম একটি শক্তিতে রূপ নেয়।
মার্কিন স্পেশাল ফোর্সেস দক্ষতার সঙ্গে আফগান ও ইরাকি স্থলবাহিনীর সঙ্গে কাজ করে। আর ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি দক্ষতার সঙ্গে শত্রুদের যোগাযোগব্যবস্থায় প্রবেশ করতে সক্ষম হয়।
এই সব উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত আল-কায়েদার নেতৃত্বকে ধ্বংস করে দিতে এবং আইসিসের বৈশ্বিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের অবসানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশ্লেষকদের মত, এসব উদ্যোগের কারণে ৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর দ্বারা বড় ধরনের প্রাণঘাতী হামলা আর ঘটেনি।
৯/১১-পরবর্তী চার প্রেসিডেন্টের অন্যতম প্রধান জাতীয় নিরাপত্তা লক্ষ্য ছিল এটিই।
যেভাবে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সম্প্রসারণ ঘটালেন ট্রাম্প
২০২৫ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ পরিধি নাটকীয়ভাবে বাড়ান।
তিনি দাবি করেন, লাতিন আমেরিকার মাদক চক্রের সন্দেহভাজন সদস্যরা ‘মাদক সন্ত্রাসী’। যার ফলে, চাইলেই তিনি তাদের হত্যা করার নির্দেশ দিতে পারেন।
এর পর ক্যারিবীয় অঞ্চলে মাদক পরিবহনকারী নৌযানগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক ডজন হামলা হয়।
২০২৬ সালের শুরুর দিকে মার্কিন জয়েন্ট স্পেশাল অপারেশনস কমান্ড ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিলে ট্রাম্প তাকেও মাদক সন্ত্রাসী আখ্যা দেন।
এই অভিযানের সাফল্যে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন ট্রাম্প। এর পরই ইরানে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরুর নির্দেশ দেন। ৯/১১-এর পর তুলনামূলক দ্রুত তালেবানকে ক্ষমতা থেকে সরানোর যুদ্ধ তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বুশকে দেড় বছর পর ইরাকে যুদ্ধ শুরু করতে উৎসাহিত করেছিল।
অনেকটা একই কায়দায় ট্রাম্পও ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন।
যে ‘শিক্ষা’ নেননি ট্রাম্প
৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্র যে শিক্ষা কখনো নেয়নি, তা হলো, যুদ্ধে ‘জিতলেই’ কাজ শেষ হয়ে যায় না, যুদ্ধ-পরবর্তী দিনগুলোর জন্যও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল থাকা দরকার। সেটা করা না হলে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
২০০১ সালের ডিসেম্বরে তালেবান যখন পুরোপুরি পরাজিত হয়েছিল এবং গোষ্ঠীটির অনেক নেতা সমঝোতায় যেতে আগ্রহী ছিলেন, তখন বুশ প্রশাসন তাদের সঙ্গে কোনো শান্তিচুক্তির উদ্যোগ নেয়নি। এমন একটি চুক্তি হলে হয়তো পরবর্তীতে বহু বছরের যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হতো।
ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের সরকারের পতনের পর কী ঘটবে, তা নিয়েও পরিকল্পনার ব্যর্থতাগুলো সুপরিচিত।
অথচ মাত্র আট বছর পর গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর কী ঘটবে, সে বিষয়েও ওবামা প্রশাসন কোনো পরিকল্পনা করেনি।
কৌশলগত সাফল্য আর সামরিক বিজয়ের মধ্যে পার্থক্য না বোঝার বিষয়টি ইরান যুদ্ধের সময় আরও স্পষ্ট হয়েছে। তেহরানের ধর্মীয় শাসকদের বিরুদ্ধে একের পর এক সামরিক বিজয় অর্জন করলেও তাতে ইরানের শাসনব্যবস্থায় কোনো অর্থবহ পরিবর্তন আসেনি।
সংঘাতের শুরুর দিনগুলোতে ট্রাম্প নিজেও তা স্বীকার করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আপনি এটা শেষ করলেন, তারপর পাঁচ বছর পর বুঝতে পারলেন, এমন একজনকে ক্ষমতায় বসিয়েছেন, যে আগেরজনের চেয়ে কোনো দিক দিয়েই ভালো নয়।’
এই ভয়াবহ আশঙ্কা মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সত্যি বলে প্রতীয়মান হয়।
৯/১১ পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্যে সরকার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের হতাশাজনক রেকর্ডের পুনরাবৃত্তি হয়। প্রথম দিনের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হলেও কয়েকদিনের মধ্যে তার ছেলে মোজতবা খামেনি ক্ষমতায় আসেন।
নতুন নেতার আবির্ভাবে ইরানের শাসকগোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গি ও কার্যক্রমে সামান্যতম পরিবর্তনও আসেনি।
যুদ্ধে পরাজয় তো দূরে থাক, হরমুজ প্রণালির ওপর নতুন করে পাওয়া নিয়ন্ত্রণকে কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতির জ্বালানি জোগানো গ্যাস ও তেলের বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে ইরানের প্রশাসন।
যে যুক্তরাষ্ট্র একসময় নিজেকে বৈশ্বিক শৃঙ্খলার রক্ষাকর্তা হিসেবে গর্ব করত, ৯/১১-এর ২৫ বছর পর এখন সেই দেশটিই সেই শৃঙ্খলার সবচেয়ে বড় বিঘ্নকারী।



