বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মুনাফায় ভাটা, রেকর্ড প্রবৃদ্ধি রবির

আহসান হাবিব
আহসান হাবিব

উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ক্রমাগত কমতে থাকা বাজার চাহিদার চাপে পড়ে ২০২৫ সালেও দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ বহুজাতিক কোম্পানি (এমএনসি) লোকসানের বৃত্ত থেকে বের হতে পারেনি।

দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক মন্দা কাটিয়ে মুনাফা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালালেও প্রতিকূল অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে গত বছরটি তাদের জন্য ছিল অস্তিত্ব রক্ষার এক কঠিন চ্যালেঞ্জ।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ১৩টি বহুজাতিক কোম্পানির মধ্যে ১১টি তাদের হিসাববর্ষ ডিসেম্বর অনুযায়ী নির্ধারণ করে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ১০টি কোম্পানি তাদের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

প্রকাশিত তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে তিনটি কোম্পানির মুনাফা কিছুটা বাড়লেও তা আগের বছরের তুলনায় কম। চারটি কোম্পানি গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন মুনাফা করেছে। আর দুটি কোম্পানি তাদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ লোকসানে পড়েছে।

এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও একমাত্র রবি আজিয়াটা রেকর্ড মুনাফা করতে পেরেছে।

কোম্পানিগুলোর শেয়ারে শত কোটি টাকা বিনিয়োগ এবং দীর্ঘ সময় ধরে এদের পারফরম্যান্স পর্যবেক্ষণ করছে ভিআইপিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানটির সিইও শহিদুল ইসলাম বলেন, এই পরিস্থিতির মূল কারণ ছিল দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক দুর্বলতা।

তিনি জানান, মূল্যস্ফীতির কারণে কাঁচামালের দাম বেড়েছে। কিন্তু কোম্পানিগুলো সেই বাড়তি খরচ ক্রেতাদের ওপর চাপাতে পারেনি। কারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় বাজারে চাহিদাও কমেছে।

আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছর অধিকাংশ কোম্পানির বিক্রির প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। গ্রামীণফোন, বাটা শু, হাইডেলবার্গ সিমেন্ট ও লিন্ডে বিডির মতো বড় চারটি কোম্পানির বিক্রি সরাসরি কমে গেছে।

ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর মুনাফা ২০২৫ সালে ৬৭ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৫৮৪ কোটি টাকা। ২০২৩ সালে তাদের মুনাফা ছিল ১ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা এবং ২০২৪ সালে ছিল ১ হাজার ৭৫০ কোটি ৬৮ লক্ষ টাকা।

কোম্পানিটি জানায়, ২০২৫ সাল ছিল আর্থ-সামাজিক ও ভূরাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও মানুষের কমে যাওয়া ক্রয়ক্ষমতা ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও কাঁচামালের বাড়তি খরচ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে। তাদের প্রধান দুটি সেগমেন্টে বিক্রিও প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে।

অন্যদিকে, আরএকে সিরামিকস গত বছর ৩৯ কোটি টাকা লোকসান করেছে, যা তাদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। অথচ ২০২১ সালে কোম্পানিটি ৯০ কোটি টাকা মুনাফা করেছিল।

সিঙ্গার বাংলাদেশও বড় ধাক্কা খেয়েছে। তারা ২২৪ কোটি টাকা লোকসান করেছে, যা তাদের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

হাইডেলবার্গ সিমেন্টের মুনাফা ২০২১ সালের সর্বোচ্চ ৪৭ কোটি টাকা থেকে অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে।

দেশের সবচেয়ে বড় টেলিকম অপারেটর গ্রামীণফোনের মুনাফা আগের বছরের তুলনায় ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। কোম্পানিটি এই পতনের জন্য অর্থনৈতিক দুর্বলতা ও ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুথ্থান পরবর্তী রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাকে দায়ী করেছে।

গ্রামীণফোন জানায়, দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ব্যবসা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়েছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাধা দিয়েছে। এতে মানুষের আয় কমেছে এবং বাজারে চাহিদা আরও কমে গেছে।

ইউনিলিভার কনজ্যুমার কেয়ার ও লাফার্জহোলসিম মুনাফায় থাকলেও ২০২৩ সালের তুলনায় তাদের মুনাফা যথাক্রমে ১৮ শতাংশ ও ১৪ শতাংশ কমেছে।

লিন্ডে বিডির মুনাফা কমে ৩৪ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। তবে ২০২৪ সালে এককালীন সম্পদ বিক্রির কারণে তাদের মুনাফা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে ৬৪২ কোটি টাকা হয়েছিল।

সব মিলিয়ে এই কঠিন সময়ে ব্যতিক্রম হিসেবে রবি আজিয়াটা ৩৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে ৯৩৭ কোটি টাকা মুনাফা করেছে।

মারিকো ও বার্জার পেইন্টসের হিসাববর্ষ মার্চে শেষ হওয়ায় এই বিশ্লেষণে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে শহিদুল ইসলাম বলেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সামনে আরও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কয়েক মাস আগে পরিস্থিতির উন্নতির আশা দেখা গেলেও ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে।

তিনি আরও বলেন, এখন সবকিছু নির্ভর করছে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি ও তেলের দামের ওপর। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ও তেলের দাম বাড়লে সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে, যা সরাসরি কোম্পানিগুলোর পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলবে।