হবিগঞ্জে খোয়াই নদীর বাঁধের ২ স্থানে ভাঙন, পানিবন্দি ৩১ হাজার

মিন্টু দেশোয়ারা
মিন্টু দেশোয়ারা

টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হবিগঞ্জের নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। এর মধ্যে খোয়াই নদীর বাঁধের দুটি স্থান ভেঙে কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। হবিগঞ্জ সদর, বাহুবল ও বানিয়াচং উপজেলায় প্রায় ৩১ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। তাদের মধ্যে সদর উপজেলার এক হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছেন।

বৃহস্পতিবার রাতে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালিগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে পানি লোকালয়ে ঢুকতে শুরু করে। অল্প সময়ের মধ্যে বাঁধের শতাধিক ফুট অংশ ভেঙে যায়। পরে স্থানীয় বাসিন্দারা গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেন।

এ ছাড়া, বানিয়াচং উপজেলার রাধাপুর এলাকায় খোয়াই নদীর বাঁধের আরেকটি স্থান ভেঙে গেছে। নদীর পানি বাড়তে থাকায় নদীতীরবর্তী ও হাওরাঞ্চলের মানুষের মধ্যে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

 ছবি: স্টার

লস্করপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. সাহেব আলী বলেন, ‘আধা ঘণ্টার মধ্যেই বাঁধের অন্তত ১০০ ফুটের বেশি অংশ ভেঙে যায়। এতে লস্করপুর ইউনিয়নের নোয়াবাদ, চরহামুয়া, আদ্যপাশা, বনগাঁও কালিগঞ্জ, সুঘর ও কটিয়াদি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। গবাদিপশু নিয়ে অনেক মানুষ নদীর বাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাত ১০টার পর থেকে আমার ওয়ার্ডের বহু পরিবারের বসতবাড়ি তলিয়ে গেছে। অনেক বাড়িতে কোমরসমান পানি জমেছে।’

কালিগঞ্জ গ্রামের কৃষক আব্দুল করিম (৪৫) বলেন, ‘বৃহস্পতিবার রাতে হঠাৎ বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকতে শুরু করে। ঘুমের মধ্যেই বুঝতে পারি, পানি বাড়ছে। কোনোমতে গরু-ছাগল ও ঘরের জরুরি জিনিসপত্র নিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিরাপদ স্থানে সরে আসি।’

দ্রুত বাঁধ মেরামতের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারগুলোর জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণ ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।

একই এলাকার বাসিন্দা রহিমা বেগম (৩৮) জানান, পানি বাড়তে দেখে রাতেই সন্তানদের নিয়ে কাছের এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেন তিনি।

রহিমা বলেন, ‘প্রতিবছরই এই সময়ে বাঁধ ভাঙার ভয়ে থাকি, কিন্তু স্থায়ী কোনো সমাধান দেখি না। রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় বাজারে যাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। আমরা শুধু সাময়িক ত্রাণ চাই না, বাঁধগুলো স্থায়ীভাবে মজবুত করার দাবি জানাই।’

 ছবি: স্টার

হবিগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল্লাহ্-আবু-জাহের জানান, সদর উপজেলার ৩০টি গ্রামের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। তাদের মধ্যে এক হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছেন।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জানান, সদর উপজেলার বাইরে বাহুবলে ১২৫টি এবং বানিয়াচংয়ে ১২০টি পরিবার পানিবন্দি রয়েছে। এসব পরিবারের সদস্যসংখ্যা প্রায় এক হাজার।

তিনি বলেন, ‘জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় পাঁচ লাখ টাকা, ১০০ টন চাল ও এক হাজার ৮২০ প্যাকেট শুকনো খাবার মজুত রয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন উপজেলায় এক হাজার ৬২০ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।’

হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সায়েদুর রহমান বলেন, ‘এখন পর্যন্ত খোয়াই নদীর বাঁধের দুটি স্থান ভেঙেছে। আরও কয়েকটি স্থানে ভাঙনের আশঙ্কা রয়েছে। তবে নতুন করে ভারী বৃষ্টি না হলে নদ-নদীর পানি কমতে পারে।’

তিনি জানান, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় বস্তায় মাটি ভরে বাঁধ মেরামতের কাজ চলছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, উজান ও দেশের অভ্যন্তরে টানা ভারী বৃষ্টির কারণে হবিগঞ্জের নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। কালনী-কুশিয়ারা নদীর আজমিরীগঞ্জ পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ৭৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কুশিয়ারা নদীর মারকুলি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ১৮ সেন্টিমিটার এবং সুতাং নদীর সুতাং ব্রিজ পয়েন্টে ৬৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিনটি পয়েন্টেই পানি বাড়ছে।

 ছবি: স্টার

মেঘনা নদীর মদনা পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার আট সেন্টিমিটার নিচে থাকলেও তা বাড়ছে।

এদিকে বন্যার পানি বাড়ায় হবিগঞ্জ-মিরপুর সড়কের বিভিন্ন অংশ তলিয়ে গেছে। এতে যানবাহন চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পানি আরও বাড়লে সড়কটিতে যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে হবিগঞ্জ সদরের সঙ্গে মিরপুর ও আশপাশের এলাকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. জি এম সরফরাজ বলেন, ‘স্থানীয়ভাবে মাইকিং করে প্লাবিত এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্র ও নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। শিশু, নারী, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ৮৩টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তুতিও রয়েছে।’

পানি বাড়তে থাকায় জেলায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত ভাঙন ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা এবং নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।