‘গ্যাসের লাইনেই সময় চলে যায়, গাড়ি চালাবো কখন’

শাহীন মোল্লা
শাহীন মোল্লা

রাজধানীর মিরপুর-২ নম্বর সেকশন এলাকার একটি সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের জন্য দাঁড়িয়েছিলেন অটোরিকশাচালক হামিদুল ইসলাম। সকাল ১০টার দিকে তিনি গ্যাস পেয়েছেন।

এই অপেক্ষার দৃশ্য এখন শহরজুড়ে। ‘গ্যাস পেতে কমপক্ষে দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। কোনো কোনো দিন আরও বেশি। প্রতিদিনের এই ভোগান্তিতে আর ধৈর্য থাকে না,’ বলছিলেন হামিদ।

আজ বুধবার সকালে দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে তার কথা হয়।

তিনি বলেন, ‘গ্যাসের লাইনেই সময় চলে যায়, গাড়ি চালাবো কখন!’

এই অটোরিকশাচালক আরও জানান, জ্বালানি, গাড়ির ভাড়া (জমার খরচ), ছোটখাটো মেরামত ব্যয় বাদ দিয়েও তিনি ৮০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারতেন। গ্যাস সংকট দেখা দেওয়ার পর থেকে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকার বেশি তার পকেটে আসে না।

‘পাম্পের ভোগান্তি তো আছেই। এখন পথেও ভোগান্তি। গ্যাসের লাইনে সময় নষ্ট হয়, সে কারণে যাত্রীদের কাছে বেশি ভাড়া চাইতে হয়। ২০০ টাকার ভাড়া ২০-৩০ বেশি নিতেই হচ্ছে। তাছাড়া তো আমার সংসার চলবে না। যাত্রীরা বেশি টাকা দিতে চায় না,’ বলেন হামিদ।

গত দুই মাস যাবৎ প্রতিদিন ২০০-৩০০ টাকা কম আয় করছেন আরেক অটোরিকশাচালক আব্দুল হান্নান। তিনি ডেইলি স্টারকে বলেন, অটোরিকশাচালক সবার একই পরিস্থিতি।

হান্নান বলেন, ‘গত রাত ১টার দিকে যখন পাম্পে গেছি, তখন আমার সামনে ৫০-৬০টি সিএনজি-অটোরিকশা আর প্রাইভেটকার। রাত ৩টার দিকে গ্যাস পাইছি।’

রাজধানীর কাজীপাড়ায় ভাড়া বাসায় তিনি সপরিবারে থাকেন। ‘সব খরচ বেড়ে গেছে। মাসের শুরুতেই বড় খরচ হয় বাসাভাড়ার টাকা দিতে। এদিকে প্রতিদিন আমার আয় কমছে,’ যোগ করেন তিনি।

হান্নান আরও বলেন, আগে একবার গ্যাস নিলেই সারা দিন চলতো। এখন পাম্পে পর্যাপ্ত প্রেশার না থাকায় দুই-তিনবার লাইনে দাঁড়াতে হয়।

ঢাকার খিলগাঁওয়ের একজন বেসরকারি কর্মজীবীর বাসার গাড়ি চালান মানিক। তিনি প্রতিদিন গ্যাসের লাইনে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ‘গত শুক্রবার রাত ৮টায় কমলাপুরের একটি পাম্পে লাইন দাঁড়িয়েছিলাম। অবশেষে গ্যাস নিয়ে ফিরেছি ভোররাত সাড়ে ৩টায়।’

‘তবে এটুকুই স্বস্তির, প্রায় ২ সপ্তাহ পর সেদিন ট্যাংকভর্তি গ্যাস পেয়েছিলাম,’ যোগ করেন তিনি।

জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানান, যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেট এনার্জির মালিকানাধীন ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি মেরামত না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এবং প্রকৌশলীদের মাধ্যমে এটি সচল করার অপেক্ষা করা ছাড়া আর তেমন কিছু করার নেই।

ক্ষতিগ্রস্ত এফএসআরইউ মেরামতে নিয়োজিত প্রকৌশলীদের কথা উল্লেখ করে টুকু বলেন, ‘দিন গোনা ছাড়া আর কিছুই করতে পারছি না।’

নারায়ণগঞ্জের ৩৩টি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে ৩০টিই যানবাহনে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। এদিকে নিয়মিত গ্যাস সরবরাহের দাবিতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অবরোধ-বিক্ষোভ করছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকেরা।

গ্যাস সংকটে নরসিংদীর ছোট-বড় শতাধিক টেক্সটাইল কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে।

শিল্পমালিকরা জানান, গত প্রায় এক মাস কারখানাগুলো মাত্র ১০ শতাংশের মতো উৎপাদন ধরে রাখতে পেরেছিল। কিন্তু গত দুই দিনে জেলার শতাধিক কারখানায় পুরোপুরি উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে।

কারখানা গুলোর মধ্যে রয়েছে—চিশতিয়া সাইজিং মিল, ইয়ামিন সাইজিং মিল, মোমিন সাইজিং মিল, হোসাইন ডাইং অ্যান্ড ক্যালেন্ডারিং মিল, আবেদ টেক্সটাইল মিলস, শিল্পী ডাইং, নদী-বাংলা সাইজিং মিল, ভূঁইয়া টেক্সটাইল অ্যান্ড ক্যালেন্ডার মিলস, আনোয়ার প্রিনটেক্স, রংধনু সাইজিং মিল, এন আহমেদ ডাইং ও নাসির ডাইং।

এছাড়া, মাধবদীতে আমানত শাহ গ্রুপ ও পাকিজা গ্রুপের কয়েকটি কারখানাও বন্ধ হয়ে গেছে। গ্যাস সংকটে বন্ধ রয়েছে এমএমকে ডাইং, মুক্তাদিন ডাইং, মাধবদী ডাইং, মুক্তা ডাইং ও সখিনা ডাইংসহ আরও কয়েকটি কারখানা।

নরসিংদী জেলা সিএনজি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং এমএমকে সিএনজি ফিলিং স্টেশনের মালিক আবদুল মোমেন মোল্লা বলেন, সাধারণত সিএনজি স্টেশনগুলোতে ১২ থেকে ১৫ পিএসআই চাপে গ্যাস সরবরাহ করা হয়।

‘সম্প্রতি কোনো কোনো দিন গ্যাসের চাপ ০ থেকে ২ পিএসআইয়ে নেমে আসছে,’ যোগ করেন তিনি।

পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি খারাপ ছিল গত বৃহস্পতিবার। ওই দিন বিকেল ৫টার দিকে সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের গ্যাস ফুরিয়ে যায়। সাগরে আবহাওয়া খারাপ থাকায় সোমবার থেকে অপেক্ষায় থাকা একটি এলএনজি ট্যাংকার ভাসমান টার্মিনালে (এফএসআরইউ) ভিড়তে পারেনি। এ কারণে ওই টার্মিনাল থেকে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ প্রায় ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে যায়।

পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, স্বাভাবিক সময়ে দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো।

এই সংকটের কারণে বড় বড় শিল্প এলাকাগুলোতে স্থবিরতা নেমে এসেছে। অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান তাদের কারখানা বন্ধ রেখেছে। সিএনজিচালিত গাড়ি চলাচল ও রান্নার কাজে চরম ভোগান্তি হচ্ছে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন অনেক কমে গেছে।