১৫ দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হবে: জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী
আগামী ১৫ দিনের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হবে বলে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
আজ বুধবার জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুলের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী এ আশার কথা জানান।
তিনি বলেন, ‘আগস্টে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিয়ে যে দুর্ভোগের সৃষ্টি হয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে।’
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত আরও বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটে সৃষ্ট মানুষের দুর্ভোগ সম্পর্কে সরকার অবগত এবং এ পরিস্থিতির জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করছেন।
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমি দায়িত্ব নিয়ে এ কথা বলছি। নিছক কথার আড়ালে সত্যকে লুকাতে চাই না। বর্তমানে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটের কারণে বাংলাদেশের মানুষ কষ্টে আছে।
চলমান সংকটের জন্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের নীতিগত ভুলকে বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকটও যুক্ত হয়েছে বলেও জানান তিনি, যা জ্বালানি সরবরাহের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর বাংলাদেশের অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে সৃষ্ট সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াট। এসব কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস (এমএমসিএফডি) প্রয়োজন।
এ চাহিদার বিপরীতে দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) মিলিয়ে বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের বরাদ্দ বাড়ালে শিল্প ও আবাসিক খাতে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। এ কারণে বিদ্যুৎ, শিল্প ও আবাসিক—এই তিন খাতের মধ্যে সরকারকে ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের কয়েকটি ইউনিট বন্ধ থাকাও বিদ্যুৎ সংকটের কারণ বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৬১৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটির কারণে বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। আর মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের একই ক্ষমতার আরেকটি ইউনিট রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ রয়েছে।
এছাড়া ভারতের আদানি গ্রুপের কাছ থেকে চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ কম বিদ্যুৎ পাচ্ছে উল্লেখ করে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেন, চুক্তি অনুযায়ী ওই গ্রুপের কাছ থেকে বাংলাদেশের ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমানে দিনে প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যায় প্রায় ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।
একই সঙ্গে আমদানি করা এলএনজি ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) ত্রুটি দেখা দেওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে বলেও জানান তিনি। গত ২১ জুলাই সমস্যাটি দেখা দেয় এবং তা মেরামতে ২১ থেকে ২২ দিন সময় লাগে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনও ব্যাহত হয়।
তবে তিনি দাবি করেন, সংকটের প্রায় ৮৮ শতাংশ ইতোমধ্যে সমাধান করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী জানান, এখন সরকার পায়রা ও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিটগুলো দ্রুত চালু করার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষকে আগস্টে যে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে, তা যেন অন্তত সেপ্টেম্বর মাসে আর পোহাতে না হয়, সে জন্য আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি।’
আগামী গ্রীষ্মের কথা মাথায় রেখে বিদ্যুৎ সরবরাহ জোরদারে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনসহ দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। এসময় সরকারের নেওয়া ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন নীতি আগামী গ্রীষ্মে চলমান সময়ের মতো বিদ্যুৎ-সংক্রান্ত দুর্ভোগ থেকে মানুষকে রক্ষা করতে সহায়তা করবে বলেও আশা প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘বারবার দরপত্র আহ্বান করা হলেও এলএনজি সরবরাহ চাহিদা অনুযায়ী পাওয়া যায়নি। আমদানির উৎস বহুমুখী করা গেলে সংকটের সমাধান করা সম্ভব হতো। এখন আমরা সরবরাহের উৎস বহুমুখী করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি।”
তিনি দাবি করেন, জ্বালানি খাতে আগের সরকারগুলো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমানে এ খাতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে সম্পূরক প্রশ্নে জামায়াতের সংসদ সদস্য মাহফুজা হান্নান অস্বাভাবিক হারে বিদ্যুৎ বিল আসার বিষয়টি তুলে ধরেন।
তিনি প্রশ্ন করেন, ‘এই ভূতুড়ে বিল কোথা থেকে আসে? বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে বিল আসবে, কিন্তু বিলের পরিমাণে এমন অস্বাভাবিক ওঠানামা কেন?’
জবাবে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেন, দুই মাস আগে এ ধরনের অভিযোগের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি ছিল। তবে বর্তমানে অভিযোগের সংখ্যা কমে এসেছে।
বিদ্যুৎ বিলসংক্রান্ত অভিযোগ দ্রুত সমাধানের জন্য গ্রাহকসেবা কেন্দ্রগুলোতে পৃথক ডেস্ক, হটলাইন এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ফোকাল পয়েন্ট চালু করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
‘আমি বলব না বিদ্যুৎ বিলের ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা বা ত্রুটি নেই। অতীতে কিছু ভুল ছিল এবং এখনো কিছু ত্রুটি রয়েছে,’ বলেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হিসেবে সারা দেশে স্মার্ট প্রিপেইড মিটার স্থাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে সংসদ সদস্যদের উদ্বেগকে স্বাভাবিক উল্লেখ করে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, সংসদ সদস্যদের সঠিক তথ্য দেওয়ার পাশাপাশি এ খাতকে ঘিরে থাকা ভুল-বোঝাবুঝি দূর করার চেষ্টা করবে সরকার।

