এলএনজি কিনতে খরচ বেড়ে ৩ গুণ, প্রতি এমএমবিটিইউ ৩০ ডলার
জ্বালানি চাহিদা মেটাতে সরকার ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর আগের দরের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি দামে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানি করছে। স্পট মার্কেটে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) এলএনজির জন্য ব্যয় হবে প্রায় ৩০ ডলার।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক ভিটল এশিয়ার কাছ থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৯ দশমিক ৭৯৫ ডলারে একটি এবং যুক্তরাজ্যের টোটাল এনার্জিস গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডের কাছ থেকে ২৮ দশমিক ৯৫ ডলারে আরেকটি এলএনজি কার্গো কেনার অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।
একটি সাধারণ কার্গোতে প্রায় ৩ দশমিক ৩৬ মিলিয়ন এমএমবিটিইউ এলএনজি থাকে। প্রতি ডলারের বিনিময় হার প্রায় ১২৩ টাকা ধরে টোটাল এনার্জিসের কার্গোটির দাম পড়বে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা এবং ভিটলের কার্গোটির দাম প্রায় ১ হাজার ২৩০ কোটি টাকা। দুটি কার্গোই অক্টোবরে আসার কথা রয়েছে।
এর আগে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত শুরুর আগে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ছিল ১০-১২ ডলার।
গত ৪-৫ সেপ্টেম্বর সরবরাহের জন্য বিপি সিঙ্গাপুরের একটি কার্গো প্রতি এমএমবিটিইউ ২১ দশমিক ৭৭৮ ডলারে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। এরপর সেপ্টেম্বরের জন্য পসকো ইন্টারন্যাশনাল ও টোটাল এনার্জিসের কার্গো যথাক্রমে ২৪ দশমিক ৬২৫ ও ২৪ দশমিক ২৫ ডলারে অনুমোদন করা হয়।
পরবর্তীতে জরুরি ভিত্তিতে ভিটলের কাছ থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৬ দশমিক ৬৭ ডলার এবং আরামকো ট্রেডিংয়ের কাছ থেকে ২৭ দশমিক ৫৪ ডলারে এলএনজি কেনা হয়।
চলতি মাসের শুরুতে বিপি সিঙ্গাপুরের একটি কার্গোর ক্ষেত্রে দর ২৮ ডলার ছাড়িয়ে যায়। সর্বশেষ ভিটলের কার্গো কেনায় দাম ৩০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সরবরাহ ব্যাহত এবং বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এলএনজি সরবরাহকারী দেশ কাতার থেকে দীর্ঘ দিন থেকে এলএনজি না আসায় ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে এলএনজির দাম বেড়ে গেছে।
তারপরও চুক্তি অনুসারে চাহিদা মতো গ্যাস না পাওয়ায় পেট্রোবাংলাকে অস্থিতিশীল স্পট মার্কেটের ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে এলএনজিতে ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তা ইতোমধ্যে ব্যাপকভাবে বেড়েছে। পেট্রোবাংলার হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই সংঘাতের কারণে ভর্তুকির বোঝা ১০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা বেড়েছে।
তবে মূল্যবৃদ্ধি একমাত্র সমস্যা নয়। সময় মতো এলএনজি কার্গো নিশ্চিত করতেও হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ।
রোববারের একই সভায় সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) আরও চারটি এলএনজি কার্গো কেনার অনুমোদন দেয় সরকার। সেগুলোর দাম উল্লেখযোগ্য হারে কম।
এর মধ্যে দুটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক দারাব ইনকরপোরেশনের কাছ থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ ১৭ ডলারে এবং দুটি মাইন্ড মিঙ্গল এলএলসির কাছ থেকে ১৯ ডলারে কেনা হবে। সরাসরি ক্রয়ের আগের ধাপে গুরুতর সরবরাহ সমস্যা থাকা সত্ত্বেও তুলনামূলক কম দামে এসব কার্গো কেনা হচ্ছে।
আগস্টে সরকার দরপত্র ছাড়াই দুই দফায় ২২টি এলএনজি কার্গো কেনার অনুমোদন দেয়। পরের দফায় সাতটি কোম্পানির কাছ থেকে দুটি করে মোট ১৪টি কার্গো অনুমোদন করা হয়। এর আগে জরুরি সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে আরও আটটি কার্গো অনুমোদন করা হয়েছিল।
এলএনজি আমদানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে আসার কথা ছিল—এমন অন্তত আটটি কার্গো সময় মতো পৌঁছায়নি।
ফলে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম যখন দ্রুত বাড়ছিল, ঠিক তখনই পেট্রোবাংলাকে আবার জরুরি ভিত্তিতে স্পট মার্কেট থেকে দরপত্রের মাধ্যমে এলএনজি কিনতে হয়।
সরবরাহ বিঘ্নতায় ১৯ আগস্ট এক্সিলারেট এনার্জির এফএসআরইউ (ভাসমান টার্মিনাল) বন্ধ হয়ে যায়, কারণ স্টোরেজে আর কোনো গ্যাস অবশিষ্ট ছিল না। যদিও টার্মিনালটি কারিগরিভাবে পুনরায় কার্যক্রম শুরুর জন্য প্রস্তুত ছিল। পরবর্তী কার্গো ২৩ আগস্টের পরে আসার কথা ছিল।
পেট্রোবাংলা ও রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের কর্মকর্তারা বলেন, কারিগরি ত্রুটি মেরামতের পর টার্মিনালগুলো পুনরায় চালু হলেও এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়নি। এর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল ডিপিএমের কার্গোগুলো সময় মতো আসেনি।
সরবরাহের জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ও কম দামে এলএনজি নিশ্চিত করা যাবে—এই যুক্তিতে সরকার সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি বেছে নেয়।
সর্বশেষ অনুমোদনগুলোতেও যুক্তরাষ্ট্রের তুলনামূলক কম পরিচিত কয়েকটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। দারাব ইনকরপোরেশন বা মাইন্ড মিঙ্গল এলএলসি—কোনোটিরই বাংলাদেশে এলএনজি কার্গো সরবরাহের প্রকাশ্য নথিভুক্ত রেকর্ড নেই।
এলএনজি সরবরাহে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তাদের প্রতিষ্ঠিত কোনো রেকর্ড দ্য ডেইলি স্টার স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, কম দর প্রস্তাব করা হলেই যে প্রয়োজনের সময় গ্যাস পৌঁছাবে, এমনটা নয়।
এদিকে, সেপ্টেম্বরের এলএনজি চাহিদা অনুসারে ইতোমধ্যে সরবরাহ নিশ্চিত হওয়ায় পেট্রোবাংলা আশা করছে, আজ থেকে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
কোম্পানিটির সরবরাহ পরিকল্পনা অনুযায়ী, মোট গ্যাস সরবরাহ প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে (এমএমসিএফডি) উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ২১ জুলাইয়ের আগে সরবরাহ যে পর্যায়ে ছিল, এটি তার কাছাকাছি। ওই দিন একটি এলএনজি টার্মিনালে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় মোট গ্যাস সরবরাহ ২ হাজার ১০০ এমএমসিএফডির নিচে নেমে এসেছিল।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগস্টের মাঝামাঝি থেকে গ্যাস সরবরাহ বেড়ে প্রায় ২ হাজার ৩০০ এমএমসিএফডিতে উঠেছে এবং তা আরও ২০০-২৫০ এমএমসিএফডি বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।