সংকটের আগের অবস্থায় ফিরেছে গ্যাস সরবরাহ
দেশের গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি অবশেষে সংকটপূর্ব অবস্থায় ফিরেছে। প্রায় দুই মাস পর মহেশখালীর দুটি ভাসমান টার্মিনাল (এফএসআরইউ) থেকে এলএনজি সরবরাহ প্রায় স্বাভাবিক মাত্রায় পৌঁছেছে।
পেট্রোবাংলার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গতকাল মঙ্গলবার দুপুর নাগাদ দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ দাঁড়িয়েছে দৈনিক ২৬১ কোটি ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। এর মধ্যে দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে এসেছে ৯৯ কোটি ঘনফুট এবং দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে সরবরাহ করা হয়েছে ১৬২ কোটি ঘনফুট গ্যাস।
গত ২১ জুলাই একটি ভাসমান টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ার আগে বাংলাদেশ দৈনিক প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট এলএনজি পাচ্ছিল। তখন দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল ২৬০ থেকে ২৬৫ কোটি ঘনফুটের মধ্যে।
এলএনজি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় গ্যাস সংকটে বিভিন্ন শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়। কমে যায় বিদ্যুৎ উৎপাদন। গ্যাসের চাপ নিয়ে ভোগান্তি পোহাতে হয় আবাসিক গ্রাহকদের।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জানান, গত কয়েক সপ্তাহে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো দৈনিক ৮৭০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পেলেও এখন তা বেড়ে প্রায় ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুট হয়েছে। বরাদ্দ বাড়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে বলে জানান তিনি।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) হিসাব থেকেও বিদ্যুতের উৎপাদন বৃদ্ধির তথ্য পাওয়া গেছে। সংকটের সময় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায়ই ৫ হাজার মেগাওয়াটের নিচে বা এর কাছাকাছি ছিল। সোমবার এই কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ৫ হাজার মেগাওয়াটের নিচে নেমে যায়। তবে গতকাল তা বেড়ে ৫ হাজার ৪৭৪ মেগাওয়াটে পৌঁছায়।
এর ঠিক এক দিন আগেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্যবসায়ী নেতাদের আশ্বস্ত করেছিলেন যে, এলএনজি সরবরাহ বাড়ার ফলে মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে বিদ্যুৎ ও গ্যাস পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
গ্যাসের চাপ নিয়ে টানা কয়েক সপ্তাহের ভোগান্তির পর শিল্পের জন্য সরবরাহ বৃদ্ধি কিছুটা স্বস্তি আনবে। তবে কারখানার মালিকেরা বাস্তবে কতটা স্বস্তি পাবেন, তা নির্ভর করছে সঞ্চালন ও বিতরণ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বাড়তি গ্যাস কীভাবে বণ্টিত হচ্ছে তার ওপর।
গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির একটি ভাসমান টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে কার্যক্রম ব্যাহত হলে গ্যাস সংকট শুরু হয়।
আগস্ট মাসে দেশে গ্যাসের গড় সরবরাহ কমে দাঁড়ায় দৈনিক ২২৩ দশমিক ৫ কোটি ঘনফুটে। এই পরিমাণ ২০২০ সালের এপ্রিল মাসের সরবরাহ মাত্রার সমান, যখন কোভিড-১৯ লকডাউনের কারণে শিল্পকারখানা, অফিস-আদালতসহ অর্থনীতির প্রায় সব খাত বন্ধ ছিল।
সংকটকালে নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুরসহ অন্যান্য প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে কারখানার মালিকেরা গ্যাসের তীব্র সংকটের কথা জানান। বাধ্য হয়ে অনেক কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দেয়, ইউনিট বন্ধ রাখে অথবা বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝোঁকে।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হলেও এর মানে এই নয় যে দেশের দীর্ঘদিনের গ্যাসঘাটতি পুরোপুরি মিটে গেছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৮৬ কোটি ঘনফুট। সরবরাহ সংকটপূর্ব অবস্থায় ফিরে যাওয়ার পরও দেশে এখনো ১২৫ কোটি ঘনফুট বা মোট চাহিদার প্রায় ৩২ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে।
দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমে এখন প্রায় ১৬০ কোটি ঘনফুটে এসে ঠেকেছে। ফলে সরবরাহ ২৬০ কোটি ঘনফুটের কাছাকাছি রাখতে বাংলাদেশকে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর ক্রমশ বেশি নির্ভরশীল হতে হচ্ছে। মহেশখালীর দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে দৈনিক সর্বোচ্চ ১০০ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করা সম্ভব।
এদিকে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বাংলাদেশকে জরুরি ভিত্তিতে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। যুদ্ধের আগে খোলাবাজারে এলএনজির দাম প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) ১০ থেকে ১২ ডলারের মধ্যে থাকলেও, এখন তা বেড়ে প্রায় ৩০ ডলারে পৌঁছেছে।