দেশজুড়ে লোডশেডিংয়ের সবচেয়ে বড় ধাক্কা ময়মনসিংহে
বিদ্যুৎ সংকটে দেশের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল ময়মনসিংহ। সম্প্রতি দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও এই অঞ্চলে লোডশেডিংয়ের চাপ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।
প্রায় দুই মাস পর ১৫ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাস সরবরাহ বাড়লেও ওইদিন দেশের মোট লোডশেডিংয়ের ৪৪ শতাংশই হয়েছে ময়মনসিংহ বিদ্যুৎ অঞ্চলে।
সর্বোচ্চ চাহিদার সময় রাত ৯টায় ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, জামালপুর ও শেরপুর—ছয় জেলা নিয়ে গঠিত অঞ্চলটিতে ১ হাজার ৬৪০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ঘাটতি ছিল ৪৫৫ মেগাওয়াট। সে সময় সারা দেশে লোডশেডিং ছিল ১ হাজার ৩২ মেগাওয়াট।
চলতি বছরের মে মাস থেকে জুলাই পর্যন্ত সর্বোচ্চ চাহিদার সময় সারা দেশে যত লোডশেডিং হয়েছে, তার ৩৭ শতাংশই হয়েছে এই অঞ্চলে। যেখানে ঢাকায় হয়েছে ১৫ শতাংশ, তৃতীয় অবস্থানে ছিল খুলনা—১২ শতাংশ।
এলএনজি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন শুরু হয় ২১ জুলাই। নথি অনুসারে, এর আগে মে মাসে দেশে সর্বোচ্চ চাহিদার সময় লোডশেডিংয়ের প্রায় ৫৬ শতাংশই ময়মনসিংহে হয়েছে।
জাতীয় বিদ্যুৎ চাহিদার মাত্র ৯ শতাংশ ময়মনসিংহে থাকলেও লোডশেডিংয়ের ৩৭ শতাংশের বোঝা এই অঞ্চলকে বইতে হচ্ছে। সস্তা গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় সংকট তীব্র হয়েছে, ফলে ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।
২০২৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত মে-জুলাইয়ের তথ্য অনুসারে, বিদ্যুৎ বিভ্রাটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোর তালিকায় ময়মনসিংহ ধারাবাহিকভাবে শীর্ষে বা এর কাছাকাছি ছিল।
২০২৩ সালের মে-জুলাইয়ে দৈনিক সর্বোচ্চ চাহিদার সময় নথিভুক্ত মোট লোডশেডিংয়ের ১৮ শতাংশ হয়েছে ময়মনসিংহে, যা দেশের নয়টি বিদ্যুৎ অঞ্চলের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২৪ সালের একই সময়ে দেশের মোট লোডশেডিংয়ের ৩২ শতাংশ হয়েছে এই অঞ্চলে এবং সব অঞ্চলের মধ্যে এটি ছিল সর্বোচ্চ।
একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল গত বছর। মে-জুলাইয়ে জাতীয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে লোডশেডিংয়ের ৪৪ শতাংশ হয়েছে রংপুরে, আর ময়মনসিংহ ছিল দ্বিতীয় অবস্থানে—২০ শতাংশ ছিল লোডশেডিং।
গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের উৎপাদন তার সক্ষমতার বিপরীতে মাত্র ১৩ শতাংশে নেমে এসেছে। চাহিদা পূরণে ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে ময়মনসিংহ অঞ্চলে ইউনিট প্রতি ব্যয় বেড়েছে।
মূল কারণ
ময়মনসিংহ অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ ঘাটতির মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে এলাকাভিত্তিক বিদ্যুতের সীমিত উৎপাদন সক্ষমতা এবং বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমে যাওয়া।
ময়মনসিংহে রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্ল্যান্ট লোড ফ্যাক্টর (পিএলএফ) ২০২০ অর্থবছরেও ছিল ৭০ শতাংশ। ২০২৫ অর্থবছরে সেটি কমে মাত্র ১৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, দুটি ফার্নেস অয়েলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবহার অনেক বেশি ছিল। ২০২৫ অর্থবছরে ইউনাইটেড ময়মনসিংহের পিএলএফ ছিল ৪২ শতাংশ ও ইউনাইটেড জামালপুরের ৪৫ শতাংশ।
পিএলএফ হলো বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে ব্যবহৃত কর্মদক্ষতা সূচক। নির্দিষ্ট সময়ে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র তার সক্ষমতার বিপরীতে কী পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে, তা পরিমাপ করতে এই সূচক ব্যবহার করা হয়।
ছয় বছর আগে চিত্রটি ছিল প্রায় বিপরীত। ২০২০ অর্থবছরে আরপিসিএলের পিএলএফ ছিল ৭০ শতাংশ, যেখানে ইউনাইটেড ময়মনসিংহের পিএলএফ ছিল ২৯ শতাংশ ও ইউনাইটেড জামালপুরের ৪৩ শতাংশ।
প্রসঙ্গত, আরপিসিএল ধারাবাহিকভাবে কম খরচের বিদ্যুৎ উৎস ছিল।
আরপিসিএল ২০২০ অর্থবছরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ গড়ে ৩ টাকা ৪১ পয়সা ব্যয়ে উৎপাদন করেছে। বিপরীতে ইউনাইটেড ময়মনসিংহে প্রতি ইউনিটের ব্যয় ছিল ১১ টাকা ৯৬ পয়সা এবং ইউনাইটেড জামালপুরে ১২ টাকা ২৮ পয়সা।
২০২৫ অর্থবছরে আরপিসিএলের ব্যবহার ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বেড়ে ১৯ টাকা ৫১ পয়সায় দাঁড়ায়। তারপরও বেশি জ্বালানি ব্যয়ের কারণে দুটি ফার্নেস অয়েলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ আরও ব্যয়বহুল ছিল। ইউনাইটেড ময়মনসিংহে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের ব্যয় ছিল ২৪ টাকা ৯৫ পয়সা এবং ইউনাইটেড জামালপুরে ২৪ টাকা ২ পয়সা।
আরপিসিএলের প্রতি ইউনিট ব্যয় বাড়ার একটি কারণ হলো কম ব্যবহার হওয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের অর্থনীতি। বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে গেলেও নির্দিষ্ট ব্যয়গুলো (ফিক্সড কস্ট) বহাল থাকে। ফলে কম ইউনিট বিদ্যুতের সঙ্গে ওই ব্যয় যোগ হয়।
একই সমস্যা জাতীয় পর্যায়েও দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশে প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে, কিন্তু পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না থাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন প্রায়ই সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট বা তার কমে সীমিত থাকে।
আরেকটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে সরকারের উদ্যোগ
জ্বালানির সরবরাহ সংকটের মধ্যেই ময়মনসিংহ অঞ্চলে আরও একটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করছে সরকার।
নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র ও এলাকার অন্যান্য স্থাপনায় গ্যাস সরবরাহে গাজীপুরের ধনুয়া থেকে একটি ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ পৃথক পাইপলাইনের পাশাপাশি ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জে আরও একটি ৩৬০ মেগাওয়াটের কম্বাইন্ড-সাইকেল গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে আরপিসিএল।
ধনুয়া-ময়মনসিংহ গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পের ওপর বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের ঘাটতির বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, নতুন প্রকল্পের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
আইএমইডির প্রতিবেদনে, প্রকল্পটি টেকসই করতে দেশীয় গ্যাসের প্রাপ্যতার ওপর নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হলে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে হাই-স্পিড ডিজেল রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ করা হলে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ময়মনসিংহের লোডশেডিং কমাতে সহায়ক হবে।
তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘একটি পৃথক গ্যাস পাইপলাইন স্থাপন করা হচ্ছে, কারণ বর্তমান ব্যবস্থায় বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছে না।’
এছাড়া সরকার ময়মনসিংহের বিদ্যুৎ সঞ্চালন সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।
পাওয়ার গ্রিড নেটওয়ার্ক শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের আওতায় পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ কালিয়াকৈরকে শম্ভুগঞ্জের সঙ্গে যুক্ত করে একটি উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন সঞ্চালন লাইন স্থাপন করছে। পাশাপাশি শম্ভুগঞ্জে একটি নতুন সাবস্টেশনও স্থাপন করা হচ্ছে।
স্থানীয়ভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন পর্যাপ্ত না হলে এর মাধ্যমে দেশের অন্যান্য এলাকা থেকে ময়মনসিংহে আরও বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
তবে সঞ্চালন সক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্পটি ধীরগতিতে এগোচ্ছে। গত বছরের জুনে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা ছিল। পরবর্তীতে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন করা হয়েছে। সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি ছিল ৭৪ শতাংশ।
জহুরুল জানান, সাবস্টেশনটি ইতোমধ্যে নির্মাণ করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সঞ্চালন লাইনগুলোর কাজ চলছে।
তিনি আরও বলেন, ‘সঞ্চালন লাইনটি সম্পন্ন হলে জাতীয় গ্রিড থেকে এ অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানো যাবে।’