কুয়াকাটায় ক্ষতচিহ্নসহ ৬ ফুট লম্বা মৃত ডলফিন উদ্ধার

নিজস্ব সংবাদদাতা, পটুয়াখালী

পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের পূর্ব পাশে চর গঙ্গামতি এলাকায় জোয়ারের পানির সঙ্গে ভেসে আসা প্রায় ৬ ফুট লম্বা একটি মৃত বোতলনোজ ডলফিন উদ্ধার করা হয়েছে।

মহিপুর রেঞ্জের বন কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান দ্য ডেইলি স্টারকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

আজ শনিবার সকাল ১০টার দিকে স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠন উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের সদস্য আব্দুল জলিল ডলফিনটির মরদেহ দেখতে পান। পরে তিনি ডলফিন রক্ষা কমিটি, বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ফেডারেশন (বিবিসিএফ) ও বন বিভাগের সদস্যদের বিষয়টি জানান।

খবর পেয়ে এসব সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের সদস্যরা ডলফিনটির মরদেহ উদ্ধার করেন। সেসময় দেখা যায়, দীর্ঘ সময় পানিতে থাকার কারণে ডলফিনটির শরীরের অধিকাংশ চামড়া উঠে গেছে। শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্ষতচিহ্ন রয়েছে। এছাড়া লেজে দড়ি বাঁধা অবস্থায় পাওয়া যায়।

উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল হোসেন রাজু ডেইলি স্টারকে বলেন, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে ডলফিনটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। জীবিত কিংবা মৃত ডলফিন, কচ্ছপ, রাজকাঁকড়া বা অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী উদ্ধারের সময় প্রায়ই তাদের মুখ বা লেজে জালের টুকরো কিংবা দড়ি বাঁধা অবস্থায় পাওয়া যায়। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
তিনি আরও বলেন, ‘দীর্ঘ সময় পানিতে থাকার কারণে মৃত সামুদ্রিক প্রাণীর দেহে দ্রুত পচন ধরে। জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনায় ডলফিনটির মরদেহ নির্ধারিত স্থানে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে।’

বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ফেডারেশনের (বিবিসিএফ) সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক কেএম বাচ্চু জানান, বর্ষা মৌসুমে বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় কুয়াকাটা এলাকায় প্রায়ই বিভিন্ন প্রজাতির মৃত সামুদ্রিক প্রাণী ভেসে আসে। গত কয়েক বছরে শুশুক, ইরাবতী ডলফিন, বোতলনোজ ডলফিন, স্পিনার ডলফিন, তিমি ও কচ্ছপসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণীর মরদেহ পাওয়া গেছে।

তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে ডলফিন ও কচ্ছপের মৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগজনক। পানিদূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য, জলবায়ু পরিবর্তন ও মাছ ধরার জালে আটকা পড়াকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ধারণা করা হলেও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ণয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন।’

কুয়াকাটা ডলফিন রক্ষা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ১৫টি, ২০২৪ সালে ১০টি, ২০২৫ সালে ১৭টি এবং ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত ১৬টি মৃত ডলফিন কুয়াকাটা উপকূলে ভেসে এসেছে। এছাড়া চলতি বছর প্রায় ৬০ ফুট লম্বা চারটি তিমির মরদেহও ভেসে এসেছে।

কমিটির সদস্যরা জানান, গত তিন বছরে তারা প্রায় ৪ থেকে ৫টি অসুস্থ ডলফিন জীবিত উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর সাগরে অবমুক্ত করেছেন। এছাড়া কুয়াকাটা উপকূলে অসংখ্য মৃত কচ্ছপ ও রাজকাঁকড়াও পাওয়া গেছে।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ, অ্যাকুয়াকালচার অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ট্রলার ও জেলেদের জালে আটকা পড়ে দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকার কারণে অনেক সময় ডলফিন ও কচ্ছপ শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যায়। এছাড়া নৌযানের আঘাত, শিল্পবর্জ্য, তেল এবং রাসায়নিক দূষণও সামুদ্রিক প্রাণীর মৃত্যুর অন্যতম কারণ।’

সামুদ্রিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ, জেলেদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং গবেষণাভিত্তিক কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি বলেও জানান তিনি।

মহিপুর রেঞ্জের বন কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান জানান, উপকূলীয় এলাকায় মাঝেমধ্যে এ ধরনের ঘটনা ঘটে। মৃত ডলফিন বা কচ্ছপের খবর পেলে বন বিভাগ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে।