ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ হলে দেশে জ্বালানি সরবরাহে কী প্রভাব পড়বে
আগামী সপ্তাহে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের নতুন চালান না এলে সাময়িকভাবে বন্ধ থাকতে পারে দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির কার্যক্রম।
এমন কিছু যে ঘটতে পারে, সেই আশঙ্কা উড়িয়ে দিতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এমন পরিস্থিতিতে দেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি ব্যবস্থাপনার আশঙ্কা তৈরি হলেও বিভিন্ন ধরনের জ্বালানির ওপর তাৎক্ষণিক প্রভাব খুব একটা পড়বে না।
কারণ, বাংলাদেশের সরবরাহ ব্যবস্থা মূলত পরিশোধিত তেল আমদানি ও কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাতকরণের ওপর নির্ভরশীল।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে যদি আমদানি সময়মতো পৌঁছায় এবং চাহিদা বেশি না বাড়ে, তাহলে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ন্ত্রিত থাকতে পারে।
তবে মধ্য মেয়াদে তা আমদানির ওপর চাপ বাড়াবে এবং এই সংকট দীর্ঘমেয়াদি হলে আমদানি, শোধন ও মজুত ব্যবস্থাপনার মধ্যে কাঠামোগত দুর্বলতা দেখা দিতে পারে।
জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারাও জনসাধারণকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তারা বলছেন, গত বছরের এপ্রিলে প্রতিদিনের চাহিদার যে রেকর্ড ছিল, ডিপো থেকে ফিলিং স্টেশনগুলোতে চলতি মাসেও সেই পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত থাকবে।
কেন স্বল্পমেয়াদে প্রভাব সীমিত হতে পারে
বাংলাদেশ মূলত আমদানি করা পরিশোধিত জ্বালানি ও দেশীয়ভাবে প্রক্রিয়াজাত কনডেনসেটের ওপর নির্ভর করে; কেবলমাত্র অপরিশোধিত তেলের শোধনের ওপর নয়।
ইস্টার্ন রিফাইনারি দেশের মোট জ্বালানি সরবরাহের ৫ ভাগের ১ ভাগ এবং ডিজেল সরবরাহের মাত্র ৬ ভাগের ১ ভাগ সরবরাহ করে। অর্থাৎ বেশিরভাগ ডিজেলের চাহিদা এমনিতেই আমদানি করে মেটাতে হয়। ফলে যদি আমদানি ঠিক থাকে, তাহলে দেশের বাজারে তেমন একটা প্রভাব পড়বে না।
তবে এটি নির্ভর করছে ন্যূনতম মজুত ঠিক রাখতে পারার ওপর। একইসঙ্গে যেকোনো শিডিউল বিলম্ব সরবরাহের মজুত দ্রুত সংকুচিত করতে পারে।
কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান আমদানি সূচি ও মজুতের ভিত্তিতে যদি গত বছরের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যবস্থাপনা ঠিক থাকে, তাহলে চলতি এপ্রিল মাসে কোনো সমস্যা নেই।
তারা পরবর্তী মাসগুলো নিয়ে কাজ করছেন।
সরবরাহ বনাম মজুত: প্রকৃত সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, ডিজেল দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার ৬৩ শতাংশ। দেশের পরিবহন খাত, সেচপাম্প ও বৈদ্যুতিক জেনারেটরে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় ডিজেল।
বাংলাদেশে প্রতি মাসে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ থেকে ৩ লাখ ৭০ হাজার টন ডিজেলের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে মাসে আসে প্রায় ৬০ হাজার টন। ডিজেলের বড় অংশই আমদানি করে বিপিসি।
তথ্য বলছে, এপ্রিল মাসের জন্য কয়েকটি চালানের মাধ্যমে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার টন ডিজেল নিশ্চিত করা হয়েছে। আরও প্রায় ৬০ হাজার টনের আমদানির সূচি চূড়ান্তের পথে। দেশের ডিপোগুলোতে মজুত আছে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টন।
ফলে মোট প্রাপ্য সরবরাহ প্রায় ৩ লাখ টন, যা মাসিক চাহিদার প্রায় ৮৬ শতাংশ।
জ্বালানি তেলের মজুত সরকারকে একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে সবসময় নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। ফলে আমদানি সূচি অনুযায়ী, যেসব চালান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি, গ্রাহক পর্যায়ে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সেগুলো নিয়মিত আনতে হবে।
এর জন্য সরকার যেখানেই তেল পাওয়ার সম্ভাবনা দেখছে, সেখানেই চেষ্টা করছে। এসব চেষ্টার অংশ হিসেবে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি দুই দফায় সাড়ে ৫ লাখ টন ডিজেল আমদানির অনুমতি দিয়েছে। একইসঙ্গে রাশিয়া থেকে ৬ লাখ টনের পরিশোধিত তেল আমদানি করতে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত চেয়ে আবেদন করেছে।
আতঙ্কজনিত ক্রয় কৃত্রিম চাপ তৈরি করছে
কর্তৃপক্ষ বলছে, আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি কেনা ও গ্রাহক বা ডিলার পর্যায়ে মজুত করার কারণে পেট্রোল পাম্পগুলোতে বিক্রি ইতোমধ্যে স্বাভাবিক মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।
সরকারি তথ্য বলছে, সাধারণত বছরের ব্যবধানে জ্বালানির চাহিদা ৩ থেকে ৪ শতাংশ বাড়ে। কিন্তু, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা করার পর থেকে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় গত মাসের শুরুর দিকে কিছু পাম্পে বিক্রি স্বাভাবিকের চেয়ে চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। একইসঙ্গে অসাধু ব্যবসায়ীদের মজুতদারির প্রবণতাও বাড়ে।
বাধ্য হয়ে সরকার বাড়তি চাহিদার লাগাম টেনে ধরতে ডিপোগুলো থেকে আগের বছরের সমান চাহিদায় কিংবা একটু বাড়তি হারে পেট্রল পাম্পগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ করে। আর গ্রাহকের বাড়তি ভিড়ের কারণে পাম্পগুলোর এই সরবরাহ খুব দ্রুত শেষ হতে থাকে। এর ফলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, পাম্পগুলো চাহিদা মতো সরবরাহ পাচ্ছে না।
তবে কর্মকর্তারা বলছেন, এটি আসলে সরবরাহের ঘাটতি নয়, বরং বিতরণজনিত ব্যবস্থাপনার চাপ।
পেট্রোল ও অকটেন: আপাতত সুরক্ষিত
ইস্টার্ন রিফাইনারির বাইরে গ্যাসের সঙ্গে উৎপাদিত উপজাত কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে খুব সামান্য ডিজেল পাওয়া যায়। কিন্তু এ থেকে দেশের পরিশোধন কারখানাগুলোতে যে পেট্রল ও অকটেন উৎপাদন করা হয়, তার মাধ্যমে দেশের পেট্রলের চাহিদার পুরোটা এবং অকটেনের চাহিদার ৪০ শতাংশ পূরণ হয়।
ফলে, দেশীয় কনডেনসেট উৎপাদন অব্যাহত থাকায় পেট্রলের কোনো সংকট নেই।
গত ১ এপ্রিল দেশে ২৫ হাজার টন অকটেন নিয়ে একটি জাহাজ এসেছে। আরও একটি সমপরিমাণের জাহাজ আসার কথা রয়েছে। মাসিক অকটেনের চাহিদা ৩৫ হাজার টন হিসাবে এই অকটেন দিয়ে দেড় মাসের বেশি চাহিদা অনায়াসে মেটানো সম্ভব।
পেট্রলের চাহিদাও মাসে ৩০ হাজার টনের একটু বেশি। দেশের সিলেট গ্যাস ফিল্ডে অবস্থিত সরকারি কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেশন প্ল্যান্ট থেকে মাড়ে ১২ হাজার টন পেট্রল আসে। আর বাকিটুকু উৎপাদন করে দেশের কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।
এর মধ্যে একটি বড় প্ল্যান্ট থেকেই প্রায় ১৫ হাজার টন পেট্রল আসে। আরও তিনটি প্ল্যান্ট থেকে ৫০০ থেকে ১ হাজার টন করে পেট্রল আসে।
ফলে এই মুহূর্তে পেট্রল ও অকটেনের কোনো সংকট দেখছেন না কর্মকর্তারা।
রিফাইনারি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে কী হবে
ইস্টার্ন রিফাইনারি মাসে ২ লাখ টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে। ৬০ হাজার টন ডিজেল ছাড়াও ন্যাফতা, ফার্নেস তেল ও বিটুমিনসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদন করে দেশের জ্বালানির চাহিদা মেটায় এই রিফাইনারি।
এর মধ্যে ন্যাফতা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যেটা কনডেনসেটের সঙ্গে পরিমাণ মতো মিশিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে পেট্রল ও অকটেন উৎপাদন হয়।
ফলে দীর্ঘদিন যদি এই রিফাইনারি বন্ধ থাকে, তাতে ওই উৎপাদন প্রক্রিয়ায় প্রভাব পড়তে পারে এবং অকটেনের জন্য আমদানি নির্ভরতা বহুলাংশে বেড়ে যাবে।
তবে জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাময়িকভাবে সংকট হওয়ার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সূচি অনুযায়ী তিনটি অপরিশোধিত তেলের জাহাজ হরমুজ প্রণালী পার হতে পারেনি। এর মধ্যে একটি মার্চের শুরুতেই তেলবোঝাই হওয়ার পর আটকা পড়ে।
ইরানের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক চ্যানেলে জানানো হয়েছে, তারা বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের জাহাজ হরমুজ প্রণালী পার হতে দিবে। ফলে, তেলবোঝাই জাহাজটি আসা সাপেক্ষে ইস্টার্ন রিফাইনারি আবার উৎপাদনে আসতে পারে।
ওই জাহাজটি এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে আসার সম্ভাবনার কথা বলছেন কর্মকর্তারা। তাদের আশা, ইস্টার্ন রিফাইনারি অপরিশোধিত তেলের অভাবে বন্ধ হয়ে গেলেও তা হবে সাময়িক এবং এর ফলে কোনো বড় সংকট হবে না।