সাময়িক বন্ধের দ্বারপ্রান্তে ইস্টার্ন রিফাইনারি
বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগারটি বর্তমানে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে ভুগছে। পথে সমস্যার কারণে তেলের চালানও আটকে আছে। এমন পরিস্থিতিতে শোধনাগারটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
একাধিক কর্মকর্তা জানান, গত ৩০ মার্চ পর্যন্ত ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে (ইআরএল) প্রায় ৩০ হাজার ৫০০ টন ব্যবহারযোগ্য অপরিশোধিত তেলের মজুত ছিল, যা দিয়ে মাত্র ছয় দিন কার্যক্রম সচল রাখা সম্ভব।
দ্য ডেইলি স্টারের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইআরএলের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘বর্তমান মজুত দিয়ে আগামী ৬ এপ্রিল পর্যন্ত স্বাভাবিক কার্যক্রম (যদি প্রতিদিন চার হাজার ৫০০ টন থ্রুপুটের পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চলে) চালানো সম্ভব। এরপর নতুন চালান আসার ওপর ভিত্তি করে কার্যক্রমে কিছুটা সমন্বয় করার প্রয়োজন হতে পারে।’
তেলের মজুত সাশ্রয় করতে থ্রুপুট কমিয়ে দৈনিক তিন হাজার ৭০০ টনে নামানো হয়েছে। অবশ্য এই কমানো থ্রুপুটে ঠিক কত দিন চলা সম্ভব হবে, তা এখনো পরিষ্কার করেননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
থ্রুপুট বলতে বোঝায়— শোধনাগারটি প্রতিদিন যে পরিমাণ অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করে। মজুত তেলের স্থায়িত্ব বাড়াতে এই থ্রুপুট কম-বেশি করে সমন্বয় করা যায়।
১৯৬৮ সাল থেকে ইআরএল বেশ ভালোভাবেই চলে আসছে। প্রতি তিন থেকে পাঁচ বছর অন্তর এর পর্যায়ক্রমিক রক্ষণাবেক্ষণ (টার্নঅ্যারাউন্ড) কাজ চলে। তবে অপরিশোধিত তেলের মজুত শেষ হওয়ার কারণে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া হবে একটি অত্যন্ত অস্বাভাবিক ঘটনা।
সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে মার্চ মাসে মোট দুই লাখ টন অপরিশোধিত তেল আসার কথা ছিল। কিন্তু সেই চালান দুটি পৌঁছাতে দেরি হওয়ার কারণেই বর্তমানে এই সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশ সাধারণত প্রতি মাসে অপরিশোধিত তেলের দুটি চালান আমদানি করে। তবে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ পরিস্থিতির উত্তেজনার কারণে তিনটি চালান আসতে দেরি হয়েছে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এর মধ্যে একটি জাহাজে তেল বোঝাই করা হয়েছে এবং সেটি এখন হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসার পথে রয়েছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত গতকাল জানিয়েছেন, জ্বালানিবাহী জাহাজসহ সব বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যদিও হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল এখনো বেশ কঠিন, তবে নিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতিতে সীমিত পর্যায়ে চলাচল শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কর্মকর্তাদের মতে, এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ের আগে পরবর্তী তেলের জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর সম্ভাবনা কম। ফলে ইআরএলের নিয়মিত সরবরাহ সূচিতে একটি সাময়িক বিরতি বা ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
ইআরএল বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন (মাসে প্রায় এক লাখ ২৫ হাজার টন) অপরিশোধিত তেল শোধন করে। এখান থেকে পেট্রোল, ন্যাফথা, ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের একটি অংশের উৎপাদন হয়।
দেশের পেট্রোলের চাহিদার বেশির ভাগই মেটানো হয় স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ‘কনডেনসেট’ থেকে, যা একটি সরকারি এবং তিনটি বেসরকারি শোধনাগারে প্রক্রিয়াজাত করা হয়।
এই শোধনাগারগুলো পেট্রোলের সঙ্গে ন্যাফথা মিশিয়ে অকটেনও তৈরি করে। এর মানে হলো, দেশের অকটেন চাহিদার প্রায় অর্ধেকই স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। তবে ইআরএলের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে ন্যাফথার যোগান ব্যাহত হতে পারে, যা পেট্রোল ও অকটেন তৈরির মিশ্রণ প্রক্রিয়াকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
অবশ্য পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে স্থানীয়ভাবে কনডেনসেট উৎপাদন স্বাভাবিক রয়েছে। অন্যদিকে, দেশের ডিজেলের চাহিদার সিংহভাগই আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইআরএলের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হলেও এপ্রিলে জ্বালানি সরবরাহে বড় কোনো বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা নেই। কারণ, তেলের আরও বেশ কিছু চালান বর্তমানে আসার প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
গতকাল মালয়েশিয়া থেকে ২৭ হাজার টনের একটি ডিজেলের চালান চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে। আগামী ৭ এপ্রিলের মধ্যে আরও ৩০ হাজার টন আসার কথা রয়েছে এবং এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে সমপরিমাণ আরও দুটি চালান পৌঁছাবে।
অকটেনের সম্ভাব্য চাহিদার চাপ সামাল দিতে ৭ এপ্রিলের মধ্যে ২৫ হাজার টনের একটি চালান আসার কথা রয়েছে। এরপর এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে পৌঁছাবে আরও একটি চালান।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, আমদানিকৃত এই পরিমাণ জ্বালানি আগামী দুই মাসের চাহিদা মেটাতে যথেষ্ট হবে। ফলে বর্তমানে বড় ধরনের কোনো ঘাটতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
এরইমধ্যে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাতকরণও সচল রয়েছে, যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাড়তি সহায়তা করছে।
বর্তমান এই সংকট বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালির ওপর বাংলাদেশের অতিনির্ভরশীলতাকেই স্পষ্ট করে তুলেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইআরএল মূলত মধ্যপ্রাচ্যের নির্দিষ্ট কিছু ‘লাইট ক্রুড’ শোধনের উপযোগী করে তৈরি করা। ফলে হুট করে অন্য কোনো উৎস থেকে তেল সংগ্রহ করা কঠিন। তবে কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলছেন, বর্তমান সমস্যা কেবল জাহাজ পৌঁছাতে দেরি হওয়ার কারণে তৈরি হয়েছে, এর মানে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়।
গত কয়েক দিনে পেট্রোল ও অকটেনের সরবরাহে কিছুটা টান পড়লেও কর্মকর্তারা আশা করছেন খুব দ্রুতই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
গতকাল পর্যন্ত বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে নয় হাজার ৪০৭ টন অকটেন এবং ১২ হাজার ৮১০ টন পেট্রোল মজুত ছিল। ২০২৫ সালের মার্চ মাসের গড় চাহিদা অনুযায়ী এই মজুত দিয়ে আরও আট থেকে নয় দিন চলা সম্ভব।
বর্তমানে ডিজেলের মজুত এক লাখ ২৭ হাজার ৮১০ টন, যা দিয়ে প্রায় ১০ দিনের চাহিদা মেটানো যাবে। বিপিসির মতে, ফার্নেস অয়েল এবং জেট ফুয়েলের মজুত পুরো এপ্রিল মাসের জন্য পর্যাপ্ত।
এদিকে এপ্রিল মাসের জন্য জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত থাকলেও গতকালও ঢাকার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন বা জটলা দেখা গেছে।
জ্বালানি সংগ্রহের জন্য যানবাহন চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে দেখা গেছে, এমনকি অনেককে কয়েকবার পাম্পে ফিরে আসতে হয়েছে। ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে ভোর থেকেই গাড়ির লাইন রাস্তায় গিয়ে ঠেকে। এক পর্যায়ে ব্যক্তিগত গাড়ির এই জটলা মহাখালী রেলগেট পর্যন্ত দীর্ঘ হয়।
ডিপো থেকে তেলের লরি আসার আগে অনেক ফিলিং স্টেশনেই ব্যাপক ভিড় ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।
কর্মকর্তারা বলছেন, এই দীর্ঘ লাইন সামগ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার কোনো লক্ষণ নয়। বরং সরবরাহে কিছুটা কড়াকড়ি এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আগাম সতর্কতামূলক বা আতঙ্কে কেনাকাটা বেড়ে যাওয়ার কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বিপিসি কর্মকর্তাদের দাবি, অপরিশোধিত তেল এসে পৌঁছালেই ইআরএলের কার্যক্রম পুনরায় পুরোদমে শুরু করতে কোনো কারিগরি বাধা থাকবে না।
জ্বালানি বিভাগের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘ইআরএল বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে আমাদের উদ্বেগ থাকলেও আমরা বিকল্প ব্যবস্থা রেখেছি। আমরা সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি, কারণ আমরা এরইমধ্যে এপ্রিল মাসের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করেছি।’
সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে স্থানীয় উৎস থেকে দৈনিক প্রায় ৭২০ ব্যারেল অকটেন এবং তিন হাজার ৩১৮ ব্যারেল পেট্রোল সরবরাহ করা হচ্ছে।
তিনটি বেসরকারি শোধনাগার এই কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করলেও, ইআরএলের ‘ক্যাটালিটিক রিফর্মিং ইউনিট’ থেকে উৎপাদিত উচ্চ-মানের অকটেন তৈরির প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো তাদের কাছে নেই।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা যদি অব্যাহত থাকে এবং রিফাইনারির উন্নত মানের উৎপাদন বন্ধ থাকে, তবে বাজারে জ্বালানি তেলের পরিমাণ ও গুণগত মান—উভয় ক্ষেত্রেই সংকট দেখা দিতে পারে। স্থানীয় উৎপাদন কিছুটা ভারসাম্য রক্ষা করলেও রিফাইনারির বার্ষিক ১৫ লাখ টন উৎপাদনের ঘাটতি পূরণ করার সক্ষমতা এর নেই।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি মূলত একটিমাত্র এবং পুরনো একটি শোধনাগারের ওপর অতি-নির্ভরশীলতার ঝুঁকিকেই স্পষ্ট করে তুলেছে।
এ প্রসঙ্গে মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘ইআরএল মূলত অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড এবং মারবান ক্রুড ছাড়া অন্য কোনো তেল শোধন করতে পারে না, যা মূলত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আমদানি করা হয়।’
‘এর ফলে আমাদের হাতে বিকল্প কোনো অপরিশোধিত তেলের উৎস নেই, তবে আমরা বিকল্প পরিশোধিত তেলের উৎস নিয়ে কাজ করছি।’
ইআরএল ইউনিট-২ প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘ বিলম্ব দেশকে বাহ্যিক সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে প্রধান সরবরাহ রুটগুলোতে ভূ-রাজনৈতিক উত্তজনা তৈরি হলে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নাজুক অবস্থায় পড়ে।
অপরিশোধিত তেল আসার পর কাজ দ্রুত শুরু করা সম্ভব হলেও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে জাহাজ ভাড়া ও বিমা খরচ বেড়ে যাওয়ায় জাতীয় কোষাগারের ওপর বাড়তি চাপের সৃষ্টি হচ্ছে।
আগামী সপ্তাহে ইআরএলের কার্যক্রমে সম্ভাব্য পরিবর্তনের সময় ঘনিয়ে এলেও পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই রয়েছে। তবে সবকিছুই নির্ভর করছে যথাসময়ে তেলের জাহাজগুলো বন্দরে পৌঁছানোর ওপর।