ক্রুড সংকটে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন ব্যাহত
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার কারণে অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) আমদানি ব্যাহত হওয়ায় দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের উৎপাদন সীমিত হয়ে গেছে।
জরুরিভিত্তিতে ক্রুড অয়েল সরবরাহ না হলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে শোধনাগারটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তবে দেশে পর্যাপ্ত মজুদ থাকায় এবং আমদানিকৃত পরিশোধিত জ্বালানি পাইপলাইনে থাকায় বড় কোন শংকা নেই বলে জানান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ মোর্শেদ হোসাইন আজাদ।
ইস্টার্ন রিফাইনারির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, ব্যবহারযোগ্য অপরিশোধিত তেলের মজুদ প্রায় শেষ হয়ে আসায় বর্তমানে ট্যাংকের তলানিতে জমে থাকা ‘ডেডস্টক’ বা অবশিষ্টাংশ দিয়ে রিফাইনারিটি সচল রাখা হয়েছে।
সাধারণত তলানিতে জমে থাকা এ তেল উৎপাদন সচল রাখার স্বার্থে জমা রাখতে হয়। তবে জরুরি অবস্থায় সীমিত আকারে এটি ব্যবহার করা যায়।
চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত এ শোধনাগারে মূলত সৌদি আরবের ‘অ্যারাবিয়ান লাইট' ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘মুরবান’ ক্রুড শোধন করে ডিজেল, পেট্রোল, জেট ফুয়েল ও অকটেনসহ ১২ ধরনের জ্বালানি পণ্য তৈরি করে।
কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে নির্ধারিত জাহাজগুলো আসতে দেরি হওয়ায় এই সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে।
বিপিসির অধীনে পরিচালিত এই শোধনাগারের ধারণক্ষমতা প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার টন। উৎপাদন ধরে রাখতে কর্তৃপক্ষ ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং’ জমা থাকা তেল এনেও ব্যবহারের চেষ্টা করছে।
বিপিসি মহাব্যবস্থাপক মুর্শেদ হোসাইন আজ মঙ্গলবার দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'রিফাইনারি এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, তবে উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।'
তিনি আরও বলেন, 'আমাদের হাতে এখনো প্রায় ২৫ হাজার টন তেল মজুদ আছে। এই তেল দিয়ে আরও এক সপ্তাহের বেশি কার্যক্রম চালানো সম্ভব।'
মুহাম্মদ মোর্শেদ হোসাইন আজাদ জানান, ইস্টার্ন রিফাইনারির ৫টি ইউনিটের মধ্যে ৩টি বর্তমানে চালু আছে। গত ২ দিনে এই ইউনিটগুলো পরিশোধন হয়ে প্রতিদিন ১০০-১২০ টন পেট্রল ও ডিজেল পাওয়া গেছে।
জ্বালানি তেলের বাজারের বিষয়ে আশ্বস্ত করে মোর্শেদ হোসাইন বলেন, 'আজ রাতে ৬০ হাজার টন ডিজেল নিয়ে দুটি জাহাজ জেটিতে ভিড়বে এবং ১৮ এপ্রিল আরও সমপরিমাণ জ্বালানি আসার কথা। ফলে সরবরাহ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।'
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ও যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী ডেইলি স্টারকে জানান, সীমিত উৎপাদন ও 'ডেডস্টক' ব্যবহার করে শোধনাগারটি সচল রাখার চেষ্টা চলছে।
তিনি জানান, আগামী ২ মে ১ লাখ টন ক্রুড অয়েলের একটি বড় চালান বাংলাদেশে পৌঁছাবে, যা ২২ এপ্রিল হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করবে।
তিনি বলেন, 'আমাদের জ্বালানি চাহিদার সিংহভাগই আমদানিকৃত পরিশোধিত তেল দিয়ে মেটানো হয়। তাই ক্রুড অয়েলের মজুদ কম থাকলেও তাৎক্ষণিক জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা নেই।'
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে, যার ৯৫ শতাংশই আমদানিনির্ভর। এর মধ্যে মাত্র ১৫ লাখ টন ক্রুড অয়েল হিসেবে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে শোধনের জন্য আনা হয়। আর বাকি ৫০-৫২ লাখ টন ডিজেল, ফার্নেস অয়েল ও অকটেন হিসেবে সরাসরি পরিশোধিত অবস্থায় আমদানি করা হয়।
দেশের একমাত্র এই তেল শোধনাগারে সাধারণত দৈনিক সাড়ে ৪ হাজার টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে। কিন্তু সংকটের কারণে তা বর্তমানে কমিয়ে আনা হয়েছে।
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় গত দুই মাস ধরে বাংলাদেশে ক্রুড অয়েলের বড় কোনো চালান আসেনি।

