পরীক্ষার আগের রাতে যা করবেন, যা করবেন না
আগামীকাল থেকে শুরু হচ্ছে এইচএসসি পরীক্ষা। অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষার আগে দীর্ঘ রাত পর্যন্ত বই নিয়ে বসে থাকে, কেউ আবার দুশ্চিন্তায় ঠিকমতো ঘুমাতেই পারে না।
অথচ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরীক্ষার আগের রাতে সঠিক পরিকল্পনা, মানসিক প্রশান্তি এবং পর্যাপ্ত ঘুম ভালো ফল করার অন্যতম চাবিকাঠি।
সবকিছু একসঙ্গে নয়, পরিকল্পনা করে পড়া
শেরেবাংলা নগর আদর্শ কলেজের শিক্ষক পারভেজ আহসান বলেন, পরীক্ষার আগের রাতে ঠিক করে নিতে হবে, কোন কোন বিষয় আরেকবার দেখে নিতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, সূত্র, সংজ্ঞা, তারিখ কিংবা যেসব অংশে একটু দুর্বলতা আছে, সেগুলোকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। সময় ভাগ করে পড়তে হবে। একটানা অনেকক্ষণ না পড়ে মাঝেমধ্যে পাঁচ-দশ মিনিটের বিরতি নিতে হবে। এতে মনোযোগও বাড়বে, ক্লান্তিও কম হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আগে দেখা
পারভেজ আহসান বলেন, এখন পুরো বই শেষ করার চেষ্টা না করে পরীক্ষায় বেশি গুরুত্ব পাওয়া বিষয়গুলোর দিকে নজর দিতে হবে। সিলেবাস দেখে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো বেছে নিতে হবে। যেগুলো ভালোভাবে পড়া হয়নি, সেগুলোতে আরেকটু নজর দেওয়া ভালো। তবে একেবারে নতুন কোনো অধ্যায় শুরু করা ঠিক হবে না। এতে আত্মবিশ্বাস কমে যেতে পারে।
ছোট নোটই হতে পারে সবচেয়ে বড় সহায়
এ সময় বড় বড় অধ্যায় পড়ার চেয়ে নিজের তৈরি ছোট নোট, গুরুত্বপূর্ণ সূত্র, সারসংক্ষেপ বা সংক্ষিপ্ত তালিকা দেখে নেওয়াই বেশি কার্যকর।
পারভেজ আহসান বলেন, অনেকেই ছোট ছোট কার্ডে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য লিখে রাখে। শেষ মুহূর্তে এগুলো একবার চোখ বুলিয়ে নিলে অনেক তথ্য সহজেই মনে পড়ে যায়।
মনে রাখার সহজ কৌশল ব্যবহার
শিশুবিশেষজ্ঞ সুমাইয়া মিম বলেন, কিছু তথ্য মনে রাখতে ছোট ছোট কৌশল কাজে লাগানো যায়। যেমন একটি শব্দের প্রথম অক্ষর দিয়ে নতুন শব্দ তৈরি করা, ছোট ছড়া বানানো, কোনো ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে মনে রাখা বা ছোট একটি ছবি এঁকে বিষয়টি মনে রাখা। এসব পদ্ধতি কঠিন তথ্যও সহজে মনে রাখতে সাহায্য করে।
মাইন্ড ম্যাপ তৈরি করা
সুমাইয়া মিম বলেন, কোনো বড় অধ্যায় দ্রুত মনে করতে চাইলে একটি কাগজের মাঝখানে মূল বিষয়টি লিখতে হবে। তারপর চারপাশে শাখার মতো করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো সাজিয়ে নিতে হবে। এতে পুরো অধ্যায়ের একটি পরিষ্কার ছবি চোখের সামনে চলে আসবে। পরীক্ষার আগে দ্রুত পুনরাবৃত্তির জন্য এটি খুব কার্যকর একটি পদ্ধতি।
বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করা, তবে বেশি নয়
বন্ধুর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করা ভালো। এতে অনেক অজানা বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায়। তবে কে কত পড়েছে, কার প্রস্তুতি কত ভালো এসব নিয়ে তুলনা করা ঠিক হবে না। এতে অকারণ মানসিক চাপ বাড়ে।
প্রয়োজন হলে শুধু কঠিন বিষয়গুলো নিয়ে কয়েক মিনিট আলোচনা করেই পড়ায় ফিরতে হবে বলে জানান তিনি।
নিজেকে সাহস দেওয়া
পরীক্ষার আগের রাতে ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু ভয়কে প্রশ্রয় না দিয়ে বলতে হবে, ‘আমি যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়েছি। আমি অতিরিক্ত চিন্তা করব না।’
এ ধরনের ইতিবাচক চিন্তা আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করে।
একটু হাঁটা, হালকা ব্যয়াম
একটানা বইয়ের সামনে বসে থাকা উচিৎ নয়। কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করা, বারান্দায় গিয়ে খোলা বাতাসে দাঁড়ানো বা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একটু গল্প করা ভালো। হালকা শরীরচর্চা বা স্ট্রেচিংও মনকে সতেজ রাখতে সাহায্য করে।
পুষ্টিকর খাবার খাওয়া
সুমাইয়া মিমের ভাষ্য, ভালোভাবে পড়তে ও পরীক্ষার দিন সতেজ থাকতে শরীরেরও যত্ন নিতে হবে। রাতের খাবারে ভাত, রুটি, ডাল, মাছ, ডিম, সবজি বা ফল রাখা যেতে পারে। অতিরিক্ত তেল-ঝাল, ফাস্ট ফুড বা কোমল পানীয় এড়িয়ে চলাই ভালো। পর্যাপ্ত পানি পান করতে। শরীরে পানির ঘাটতি হলে মনোযোগ কমে যেতে পারে।
প্রয়োজনীয় জিনিস গুছিয়ে রাখা
ঘুমানোর আগে ব্যাগে প্রয়োজনীয় সবকিছু গুছিয়ে রাখুন।ন প্রবেশপত্র, রেজিস্ট্রেশন কার্ড, কয়েকটি ভালো কলম, পেন্সিল, রাবার, স্কেল, ক্যালকুলেটর (যদি প্রয়োজন হয়) এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য জিনিস ঠিক আছে কি না দেখে নিতে হবে। তাহলে সকালে তাড়াহুড়া বা অস্থিরতা থাকবে না।
মোবাইল ফোন থেকে দূরে থাকা
ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করা ঠিক হবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটানো বা ভিডিও দেখলে ঘুমের ক্ষতি হতে পারে। বরং ঘুমানোর অন্তত আধা ঘণ্টা আগে মোবাইল সরিয়ে রাখতে হবে।
দুশ্চিন্তা কমাতে শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম
সুমাইয়া মিম বলেন, যদি খুব উদ্বেগ লাগে, তাহলে কয়েক মিনিট ধীরে ধীরে গভীর শ্বাস নিতে হবে এবং ছাড়তে হবে। চোখ বন্ধ করে শান্তভাবে বসে থাকা যেতে পারে। এতে মন অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে আসে। চাইলে কয়েক মিনিট নীরবে বসে থাকা যেতে পারে।
ভালো ঘুমই সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি
পরীক্ষার আগের রাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো পর্যাপ্ত ঘুম। অন্তত সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করতে হবে। ঘুমের সময় মস্তিষ্ক সারাদিনে শেখা তথ্যগুলো আরও ভালোভাবে গুছিয়ে নেয়। তাই রাত জেগে পড়ার চেয়ে সময়মতো ঘুমানো অনেক বেশি উপকারী।
অ্যালার্ম দিয়ে রাখা
ঘুমানোর আগে অ্যালার্ম দিয়ে রাখতে হবে। সম্ভব হলে পরিবারের কাউকে বলে রাখাতে আরও ভালো, যেন সময়মতো ডেকে দিতে পারে। সকালে তাড়াহুড়া না করে একটু আগেই বের হওয়ার পরিকল্পনা থাকা ভালো।
মনে রাখবেন রাখতে হবে ভয় নয়, আত্মবিশ্বাস নিয়ে পরীক্ষার হলে যাওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর পরীক্ষার হলে প্রশ্নপত্র ভালোভাবে পড়তে হবে, তারপর সময় ভাগ করে উত্তর লিখতে হবে।


