পরীক্ষার ফল নিয়ে সন্তানকে যেসব কথা বলা ঠিক নয়
এসএসসি, এইচএসসি কিংবা ভর্তি পরীক্ষা, যে পরীক্ষাই হোক না কেন ফল প্রকাশের আগের কয়েক দিন এবং ফল প্রকাশের দিনটিতে অধিকাংশ শিক্ষার্থী মানসিক চাপের মধ্যে থাকে। সেই চাপ অনেক সময় পরিবারের ওপরও পড়ে।
এ সময় অভিভাবকের ছোট একটি মন্তব্য সন্তানের ভয় ও দুশ্চিন্তা কমাতে পারে। একইভাবে অসাবধানতাবশত বলা কোনো মন্তব্য তার আত্মবিশ্বাস কমাতে পারে।
চাইল্ড কেয়ার, ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এডুকেশন কনসালটেন্ট দীপু মাহমুদ বলেন, পরীক্ষার ফলের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, পরীক্ষার্থীর সঙ্গে ওইদিন পরিবারের সদস্যরা কেমন আচরণ করছেন সেটি।
‘টেনশন হচ্ছে?’
দীপু মাহমুদের ভাষ্য, ফলের অপেক্ষায় থাকা একজন শিক্ষার্থী উদ্বিগ্ন থাকবে, সেটিই স্বাভাবিক। তাই বারবার ‘টেনশন হচ্ছে?’ বা ‘ভয় লাগছে?’—এ ধরনের প্রশ্ন করলে সে আরও অস্বস্তি বোধ করতে পারে।
এর বদলে বলুন, ‘চলো আমরা একসঙ্গে নাশতা করি’ কিংবা ‘কিছু বলতে চাইলে আমাকে বলতে পারো’। এ ধরনের কথা সন্তানের অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ করে দেয়।
‘আমাদের প্রত্যাশা অনেক বড় না’
দীপু মাহমুদ বলেন, অনেক অভিভাবক মনে করেন, প্রত্যাশা কম দেখালে সন্তানের ওপর চাপ কমবে। কিন্তু এই কথায় অনেক শিক্ষার্থীর মনে হতে পারে, তার দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের হয়তো ঠিকঠাক মূল্যায়ন হচ্ছে না।
তাই তাকে বলুন, ‘আমরা জানি, তুমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছ। তাই ফল যেমনই হোক, আমরা সব সময় তোমার পাশে আছি।’
এই আশ্বাসই তার সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে।
‘জিপিএ–৫ পেলেই হবে’
বাংলাদেশে ভালো ফলকে ঘিরে যে সামাজিক চাপ রয়েছে, তা নতুন নয়। কিন্তু বারবার কাঙ্ক্ষিত ফলের কথা মনে করিয়ে দিলে সন্তানের উদ্বেগ আরও বাড়ে।
দীপু মাহমুদের পরামর্শ, প্রত্যাশার চাপ না বাড়িয়ে তাকে জানিয়ে দিন, ‘ফল যেমনই হোক, পরবর্তীতে কোথায় ভর্তি হবে তা একসঙ্গে বসে ঠিক করব।’
এতে সে বুঝতে পারবে, একটি ফলাফল তার ভবিষ্যতের একমাত্র নির্ধারক নয়।
‘গুড লাক’
তিনি বলেন, শুনতে একটু সহজ লাগলেও ফল প্রকাশের দিন ‘গুড লাক’ বলার কার্যত কোনো অর্থ নেই। কারণ পরীক্ষা অনেক আগেই শেষ হয়েছে। এখন ফল নির্ভর করছে তার প্রস্তুতি ও পরিশ্রমের ওপর।
তাই ভাগ্যের কথা না বলে বলুন, ‘তুমি তোমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছ। সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
‘আমি তো আগেই বলেছিলাম আরও পড়তে’
প্রত্যাশিত ফল না হলে অনেক অভিভাবক হতাশা থেকে এমন মন্তব্য করে বসেন। কিন্তু ওই মুহূর্তে এমন কথা সন্তানের মধ্যে অপরাধবোধের জন্ম দিতে পারে। তাই অতীতের ভুল মনে করিয়ে দেওয়ার চেয়ে ভবিষ্যতের পথ দেখানো অনেক বেশি জরুরি।
বলতে পারেন, ‘ফলটা হয়তো প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি। কিন্তু সামনে আরও ভালো সুযোগ আসবে।’
‘এটাই শেষ নয়’
তিনি বলেন, এই বাক্যটি সান্ত্বনা দেওয়ার উদ্দেশ্যে বলা হয়। তবে অনেক শিক্ষার্থীর কাছে এটি তার কষ্টকে ছোট করে দেখানোর মতো মনে হতে পারে। কারণ ওই মুহূর্তে পরীক্ষার ফলই তার কাছে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।
বরং বলুন, ‘তোমার মন খারাপ হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু এটাই শেষ নয়, সামনে তোমার জন্য ভালো কিছু অপেক্ষা করছে।’
‘দেখো, অন্যদেরও খারাপ হয়েছে’
অন্যের সঙ্গে তুলনা করে সান্ত্বনা দেওয়া কখনোই কার্যকর উপায় হতে পারে না। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে কে কত নম্বর পেল, তা জানতে সময় লাগে না। ফলে এমন মন্তব্য উল্টো বিরক্তির কারণ হতে পারে।
দীপু মাহমুদের বলেন, তাই সন্তানের ফলকে অন্যের সঙ্গে না মিলিয়ে তার নিজের পরিশ্রম ও অনুভূতিকে গুরুত্ব দিন।
‘আমি শিক্ষককে ফোন করছি’
ফল আশানুরূপ না হলে বাবা-মা দ্রুত সমাধান করতে চান। কিন্তু সন্তানের মতামত না নিয়ে সিদ্ধান্ত নিলে সে নিজেকে অসহায় মনে করতে পারে।
তাই আগে জিজ্ঞেস করুন, ‘তুমি কী করতে চাও?’ কিংবা ‘আমি কীভাবে তোমাকে সাহায্য করতে পারি?’
এভাবে সিদ্ধান্তে নেওয়ার ব্যাপারে তাকে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিন।
ফল প্রকাশের পরও পাশে থাকুন
দীপু মাহমুদ বলেন, ফল প্রকাশের পর কয়েক দিন সন্তানের আচরণ খেয়াল করুন। সে স্বাভাবিকভাবে খাওয়া-দাওয়া করছে কি না, ঠিকমতো ঘুমাচ্ছে কি না, বন্ধুদের সঙ্গে মিশছে কি না—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। যদি দীর্ঘদিন ধরে হতাশা, নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া বা অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার লক্ষণ দেখা যায়, তবে প্রয়োজনে কাউন্সেলর বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিন।
মোট কথা, বাংলাদেশে পরীক্ষার ফলকে ঘিরে পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও সমাজের প্রত্যাশা অনেক বেশি। কিন্তু পরীক্ষার ফল কখনোই একজন সন্তানের যোগ্যতা, সম্ভাবনা কিংবা ভবিষ্যতের একমাত্র পরিচয় হতে পারে না। তাই ফল যেমনই হোক না কেন ওই সময়ে সন্তানের পাশে থাকুন।
এদিকে চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল ২৮ জুলাইয়ের পর প্রকাশ হতে পারে। গত ১৮ জুলাই আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামান দ্য ডেইলি স্টারকে এ তথ্য জানিয়েছিলেন।
তিনি বলেছিলেন, ‘বোর্ডগুলো আগামী ২৮ বা ২৯ জুলাইয়ের মধ্যে ফলাফল চূড়ান্ত করতে পারবে বলে আশা করছে। এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয় ফলাফল প্রকাশের তারিখ নির্ধারণ করবে।’



