ডিসলেক্সিয়া: শিশু লিখতে গিয়ে অক্ষর উল্টে ফেলে, বানানে ভুল করে, গুলিয়ে ফেলে ডান-বাম

ইশতিয়াক আহমেদ

একটি শিশুর চোখে পৃথিবীকে দেখার চেষ্টা করুন। সে গল্প শুনতে ভালোবাসে, কল্পনার জগতে উড়ে বেড়ায়, প্রশ্ন করে, নতুন কিছু শিখতে চায়। কিন্তু বই খুললেই অক্ষরগুলো যেন এলোমেলো হয়ে যায়। একই শব্দ বারবার পড়েও বুঝতে পারে না। লিখতে গিয়ে অক্ষর উল্টে ফেলে, বানানে ভুল করে, ডান-বাম গুলিয়ে ফেলে। শিক্ষক ভাবেন, সে মনোযোগী নয়। সহপাঠীরা বলে, সে দ্রুত পড়তে পারে না। পরিবারের অনেকে ধরে নেন, শিশুটি অলস।

ভারতীয় চলচ্চিত্র তারে জামিন পার-এর সেই ছোট্ট ছেলে ঈশানের কথা অনেকেরই মনে আছে। ডিসলেক্সিয়ার কারণে তাকে সবাই ভুল বুঝেছিল। কিন্তু একজন শিক্ষক তার সমস্যাটি বুঝতে পারার পরই বদলে যায় তার জীবন। বাস্তব জীবনে বাংলাদেশের অসংখ্য শিশুর ভাগ্যে সেই শিক্ষক বা সেই বোঝাপড়ার মানুষটি জোটে না। তারা নীরবে এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে লড়াই করে, যা তাদের প্রয়োজন ও সক্ষমতাকে বুঝে উঠতে পারেনি।

Dyslexia - Not always a superpower…
এখনও অনেক অভিভাবকই শব্দটির সঙ্গে পরিচিত নন ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে ডিসলেক্সিয়া নিয়ে গবেষণা ও তথ্য দুটোই খুব সীমিত। প্রায় এক দশক আগে প্রকাশিত ‘Prevalence of Dyslexia in Primary School in Dhaka: Its Effects on Children’s Academic and Social Life’ শীর্ষক এক গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকার চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নয় দশমিক শূন্য দুই শতাংশ ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত। এরপর অনেক বছর কেটে গেলেও জাতীয় পর্যায়ে এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো নতুন পরিসংখ্যান তৈরি হয়নি।

সাম্প্রতিক গবেষণার মধ্যে ২০২৪ সালে গবেষক মো. শাহজালাল বাদশা পরিচালিত ‘Mainstreaming Slow-Pace Learners Through Mobile Assisted Language Learning: A Case of Bengali Primary Level Students with Dyslexia’ গবেষণাটি উল্লেখযোগ্য। এতে বাংলা ভাষাভাষী প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর সহায়তার সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করা হয়েছে।

তবে এই গবেষণা একটি বড় বাস্তবতাকে সামনে এনেছে, আর তা হলো ডিসলেক্সিয়া সম্পর্কে সচেতনতার অভাব। এখনও অনেক অভিভাবকই শব্দটির সঙ্গে পরিচিত নন। ফলে কোনো শিশু পড়ালেখায় পিছিয়ে পড়লে তাকে ‘অলস’, ‘অমনোযোগী’ কিংবা ‘দুর্বল ছাত্র’ বলে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু তার শেখার সমস্যা শনাক্তের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এমনকি শিশু উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা একটি প্রতিষ্ঠানের একজন প্রতিনিধি স্বীকার করেছেন, তিনি ডিসলেক্সিয়া সম্পর্কে জানতেন না।

ডিসলেক্সিয়া আসলে কী?

‘ডিসলেক্সিয়া’ শব্দটি এসেছে গ্রিক ভাষার ডিস (dys) অর্থাৎ অসুবিধা এবং লেক্সিস (lexis) অর্থাৎ শব্দ থেকে। এটি একটি স্নায়ুবিকাশজনিত (নিউরোবায়োলজিক্যাল) শেখার সমস্যা, যা মূলত পড়া ও বানান শেখার সক্ষমতায় প্রভাব ফেলে।

তবে সব ধরনের পড়ার সমস্যাই ডিসলেক্সিয়া নয়। ডিসলেক্সিয়া থাকা অনেক শিশু গল্প শুনে সহজেই বুঝতে পারে, ভাষা বোঝার ক্ষমতাও ভালো থাকে। কিন্তু নিজে বই পড়ে শব্দ চিনতে, অক্ষর বিশ্লেষণ করতে কিংবা বানান করতে গিয়ে তারা বড় ধরনের সমস্যায় পড়ে।

What Is Dyslexia? Signs, Symptoms & Strengths Explained | Reading Horizons
এটি একটি স্নায়ুবিকাশজনিত (নিউরোবায়োলজিক্যাল) শেখার সমস্যা, যা মূলত পড়া ও বানান শেখার সক্ষমতায় প্রভাব ফেলে। ছবি: সংগৃহীত

এক মায়ের দীর্ঘ পথচলা

ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত এক শিশুর মা নাজিসা (ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে) মেয়ের শৈশবের কথা মনে করতে গিয়ে বলেন, জন্মের সময় তার ওজন কম ছিল। চিকিৎসকের পরামর্শে নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল তাকে।

শিশুটি বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায়, ছড়া বলতে পারে, পড়তেও পারে; কিন্তু লিখতে গেলে সমস্যা হয়। ডান-বাম আলাদা করতে পারে না। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে নিশ্চিত হওয়া যায়, তার মেয়ের মৃদু মাত্রার ডিসলেক্সিয়া আছে।

প্রথমে মেয়েকে একটি বিশেষায়িত বিদ্যালয়ে ভর্তি করেছিলেন তারা। কিন্তু সেখানে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।

তার ভাষায়, ‘ও আগের চেয়ে আরও ভয় পেতে শুরু করেছিল। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে তিন মাসের মাথায় তাকে মূলধারার একটি স্কুলে ভর্তি করাই। এরপর থেকেই ধীরে ধীরে সবকিছু বদলাতে শুরু করে।’

এই পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখেন একজন শিক্ষক। তিনি ধৈর্য ধরে শিশুটিকে লিখতে শেখান, যেটা পরিবারও আগে করতে পারেনি।

এখন শিশুটি দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। একদিন স্কুলে যেতে না পারলেও মন খারাপ করে। নিজের ক্লাসের মেধাবী শিক্ষার্থীদের একজন সে। গণিতে কিছুটা দুর্বল হলেও সৃজনশীল বিষয়ে অসাধারণ। সাহিত্য পড়তে তার ভীষণ ভালো লাগে।

তবুও সংগ্রাম শেষ হয়নি। সহপাঠীদের অনেকেই সাহায্য করলেও কেউ কেউ তাকে ‘স্লো’ বা ‘ধীরগতির শিক্ষার্থী’ বলে কটাক্ষ করে। এখনও স্যান্ডেল পরা কিংবা জামাকাপড় গুছিয়ে পরার মতো দৈনন্দিন কাজেও কিছুটা অসুবিধা হয়।

Educating Dyslexic Students Starts With Educating Teachers About Dyslexia  (Opinion)
এটি একটি শেখার অসুবিধা, যার কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। তবে সঠিক দিকনির্দেশনা, প্রশিক্ষণ ও যত্ন পেলে শিশুরা এই চ্যালেঞ্জ অনেকটাই অতিক্রম করতে পারে। ছবি: সংগৃহীত

এই লড়াই শুধু মানসিক নয়, আর্থিকও।

প্রতি মাসে চিকিৎসা, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তার খরচ বহন করতে গিয়ে পরিবারটিকে লড়াই করতে হয়েছে। তবে আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতায় তারা সেই কঠিন সময় পার করেছেন।

তিনি বলেন, মেয়ের জন্য বাসার সামনে ছোট একটি খেলার জায়গাও তৈরি করেছিলেন। কিন্তু আশপাশের নির্মাণকাজ, শব্দদূষণ ও দূষিত পরিবেশের কারণে সেটিও কাজে আসেনি।

বিশেষায়িত বিদ্যালয়ের বাস্তবতা

কিডি রকস লিমিটেড স্পেশাল স্কুলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাবরিনা আক্তার বলছেন, অনেক অভিভাবকই বুঝতে পারেন না তাদের সন্তানের বিশেষ বিদ্যালয় প্রয়োজন, নাকি শুধু থেরাপিই যথেষ্ট।

তার মতে, সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হলো, সময় গেলে শিশুটি নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যাবে।

কিন্তু নিউরোডেভেলপমেন্টাল সমস্যাগুলো নিজে থেকে সেরে যায় না। প্রয়োজন হয় দ্রুত শনাক্ত করা ও সঠিক সহায়তার।

তিনি জানান, বর্তমানে সচেতনতা কিছুটা বাড়লেও চিকিৎসক পরিবারের অনেক সদস্যও প্রথমদিকে সন্তানের সমস্যাটি মেনে নিতে চান না।

প্রায় আট বছর ধরে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানটি এখনও নানা সমস্যার মুখোমুখি। শিশুরা অতিরিক্ত শব্দ করবে এই আশঙ্কায় অনেক বাড়ির মালিক স্কুল ভাড়া দিতে চান না। দক্ষ থেরাপিস্টেরও তীব্র সংকট রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটি অটিজম পার্টনারশিপ সিঙ্গাপুরের পাঠ্যক্রম অনুসরণ করে। প্রতিবছর এখান থেকে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে মূলধারার বিদ্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়। চলতি বছরই সাতজন শিক্ষার্থী সফলভাবে মূলধারার স্কুলে গেছে।

তবে ব্যয়ের বিষয়টি এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। স্কুলটির বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর পরিবার চিকিৎসক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কিংবা সামরিক বাহিনীর সদস্য। প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিচালিত হওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকের পক্ষেই এই সেবা গ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

Common Signs of Dyslexia
নিউরোডেভেলপমেন্টাল সমস্যাগুলো নিজে থেকে সেরে যায় না। প্রয়োজন হয় দ্রুত শনাক্ত করা ও সঠিক সহায়তার। ছবি: সংগৃহীত

সচেতনতার লড়াই

বাংলাদেশে ডিসলেক্সিয়া, ডিসগ্রাফিয়া ও ডিসক্যালকুলিয়াভিত্তিক প্রথম বিশেষায়িত বিদ্যালয় সুরাইয়া আফাজ ডিসলেক্সিয়াবিডি প্রতিষ্ঠা করেন মুহাম্মদ শামসুল হুদা।

একজন এসএসসি পরীক্ষার্থীর নয়টি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার ঘটনা তাকে এই উদ্যোগ নিতে উদ্বুদ্ধ করে। তিনি স্কুল কর্তৃপক্ষকে উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের অনুরোধ করলেও তা প্রত্যাখ্যাত হয়। বরং ওই শিক্ষার্থীকে মারধরেরও অভিযোগ রয়েছে।
সেই ঘটনার পর থেকেই শুরু হয় তার সচেতনতামূলক কার্যক্রম।

গত পাঁচ বছরে তিনি দেশের ৩৭টি বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন।

তিনি বলেন, শুরুতে অধিকাংশ শিক্ষকই ডিসলেক্সিয়া সম্পর্কে জানতেন না। দীর্ঘদিন ধরে বোঝানোর পর তারা বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে শুরু করেন।

মুহাম্মদ শামসুল হুদা ডিসলেক্সিয়াকে প্রতিবন্ধকতা বলতে রাজি নন।

তার মতে, এটি একটি শেখার অসুবিধা, যার কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। তবে সঠিক দিকনির্দেশনা, প্রশিক্ষণ ও যত্ন পেলে শিশুরা এই চ্যালেঞ্জ অনেকটাই অতিক্রম করতে পারে।

তিনি দাবি করেন, তার তত্ত্বাবধানে দুই শতাধিক শিশুর উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।

এখন তার প্রধান লক্ষ্য—ডিসলেক্সিয়াকে জাতীয় শিক্ষা নীতির অন্তর্ভুক্ত করা এবং প্রতিটি বিদ্যালয়ে প্রাথমিক পর্যায়ের স্ক্রিনিং ও শিক্ষক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

What is dyslexia? - Dyslexia Assessment and Tuition
শিশুবিকাশ ব্যবস্থার মধ্যেই ডিসলেক্সিয়া শনাক্তকরণকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা খাতে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করা জরুরি। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহজাবীন হক মনে করেন, বাংলাদেশে এখনও ডিসলেক্সিয়া নির্ণয়ের কোনো সুসংগঠিত ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

তার ভাষায়, প্রায় ১০ থেকে ১৫ বছর আগে কিছু স্ক্রিনিং হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য গবেষণা, জরিপ কিংবা নিয়মিত তথ্য সংগ্রহের কোনো ব্যবস্থা নেই।

তিনি মনে করেন, শিশুবিকাশ ব্যবস্থার মধ্যেই ডিসলেক্সিয়া শনাক্তকরণকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা খাতে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করা জরুরি।

যে ব্যবস্থার শেখা এখনও বাকি

বাংলাদেশে ডিসলেক্সিয়া এখনও অনেকটাই অদৃশ্য একটি বাস্তবতা। এটি শিক্ষা নীতিতে পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি, গবেষণায় রয়েছে বড় শূন্যতা, আর সচেতনতার অভাবে অসংখ্য শিশু প্রতিদিন ভুল বোঝাবুঝির শিকার হচ্ছে।

অভিভাবকেরা একা লড়ছেন মানসিক, সামাজিক ও আর্থিক চাপের সঙ্গে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে ওঠা কিছু প্রতিষ্ঠান সেই শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করছে, কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত।

ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত শিশুরা কম মেধাবী নয়, তারা অলসও নয়। তারা কেবল ভিন্নভাবে শেখে। তাদের প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে নম্বরের চেয়ে শিশুকে গুরুত্ব দেবে; ব্যর্থতার আগে তার সমস্যাকে বুঝবে; আর শাস্তির বদলে এগিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে।

বাংলাদেশের শিক্ষা ও শিশুবিকাশ ব্যবস্থা শিশুর প্রয়োজনীতা বুঝতে হবে। আর সেদিন সেটি সম্ভব হবে তখন আর কোনো শিশুকে কেবল অক্ষরের সঙ্গে লড়াই করার কারণে নিজের সামর্থ্য প্রমাণ করতে হবে না।