কুকুর কেন লেজ নাড়ে?
ছোটবেলা থেকে আমরা ভেবে এসেছি, লেজ নাড়ছে মানেই কুকুর খুশি! কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, কুকুরের লেজ নাড়ার আচরণের পেছনে রয়েছে নানা ধরনের সংকেত, আবেগ ও সামাজিক যোগাযোগ।
তাদের ভাষ্য, গৃহপালিত কুকুর তাদের লেজ ব্যবহার করে মানুষের সঙ্গে ও অন্য কুকুরের সঙ্গে যোগাযোগ করে। বিজ্ঞানীরা লেজ নাড়ার কিছু অর্থ বুঝতে পেরেছেন, তবে এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর অজানা।
কেন কুকুর অন্য অনেক প্রাণীর তুলনায় বেশি লেজ নাড়ে, তারা কি ইচ্ছা করেই লেজ নাড়ে, নাকি এটি স্বাভাবিক একটি প্রতিক্রিয়া—এসব কারণ জানার চেষ্টা করছেন গবেষকেরা।
ইতালির তুরিন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণী আচরণ বিশেষজ্ঞ সিলভিয়া লিওনেট্টি বলেন, ‘কুকুরের লেজ নাড়া পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত প্রাণী আচরণগুলোর একটি। কিন্তু কুকুরের আচরণের অনেক কিছুই এখনো রহস্য।’
লিওনেট্টি ও তার সহকর্মীরা কুকুরের লেজ নাড়া নিয়ে আগের গবেষণাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, কোন বিষয়গুলো বিজ্ঞানীরা জানেন এবং কোন বিষয়গুলো এখনো পরিষ্কার নয়।
তাদের ধারণা, লেজ নাড়ার আচরণের পেছনে মানুষের সঙ্গে কুকুরের দীর্ঘ সম্পর্কের প্রভাব থাকতে পারে।
গবেষকরা বলছেন, হয়তো মানুষের ছন্দ বা তাল পছন্দ করার প্রবণতার সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। অথবা মানুষের পছন্দ অনুযায়ী কুকুরের বিবর্তনের সময় বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ, মানুষের প্রতি আনুগত্য ও লেজের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে লেজ নাড়ার অভ্যাসও বিকশিত হয়েছে।
তাদের এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বায়োলজি লেটারস সাময়িকীতে।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কুকুরের চিন্তাশক্তি নিয়ে গবেষণাকারী এমিলি ব্রে বলেন, ‘মানুষ মনে করে লেজ নাড়া মানেই কুকুর খুশি। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি অনেক বেশি জটিল।’
তিনি জানান, বিভিন্ন কারণে কুকুর লেজ নাড়তে পারে এবং এর ধরণে নানা কিছুর ইঙ্গিত থাকতে পারে। যেমন—ডান দিকে বেশি নাড়িয়ে কুকুর হয়তো বোঝাতে চায়, সে কোনো কিছুতে আগ্রহী বা কাছে যেতে চায়। আবার দূরে যেতে বোঝাতে বাম দিকে বেশি লেজ নাড়তে পারে। ভয়, অস্বস্তি বা আত্মসমর্পণ বোঝাতে নিচু করে, পায়ের কাছে নিয়ে লেজ নাড়তে পারে। অন্য কুকুরও এসব সংকেত বুঝতে পারে এবং সেই অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া জানায়।
সায়েন্স নিউজ এক্সপ্লোরের প্রতিবেদনে বলা হয়, যদিও বিজ্ঞানীরা লেজ নাড়ার কিছু অর্থ বুঝতে পেরেছেন, তবুও এখনো অনেক রহস্য অজানা।
এখন গবেষকদের কিছু প্রশ্ন হলো—কুকুর কি বুঝতে পারে যে তার লেজ নড়ছে? সে কি ইচ্ছে করে ডান বা বাম দিকে বেশি লেজ নাড়তে পারে? কেন নেকড়ে বা অন্যান্য কুকুরজাতীয় প্রাণীর তুলনায় বেশি লেজ নাড়ে?
এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো নিশ্চিতভাবে জানতে পারেননি তারা।
গবেষকদের একটি ধারণা হলো, কুকুরের লেজ নাড়ার সঙ্গে ছন্দ বা তালের সম্পর্ক থাকতে পারে। মানুষ সাধারণত ছন্দময় নড়াচড়া পছন্দ করে। তাই মানুষ হয়তো এমন কুকুরকে বেশি পছন্দ করেছে, যারা বেশি লেজ নাড়ে। দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের বাছাইয়ের কারণে কুকুরের মধ্যে এই বৈশিষ্ট্য আরও বেড়েছে বলে তাদের ধারণা।
আরেকটি ধারণাকে বলা হয় ‘ডমেস্টিকেশন সিনড্রোম’ বা গৃহপালনজনিত পরিবর্তন।
এই ধারণা অনুযায়ী, প্রাণীদের নির্দিষ্ট আচরণের জন্য বেছে নিলে সেই আচরণের সঙ্গে সম্পর্কিত অন্য বৈশিষ্ট্যও পরিবর্তিত হতে পারে। যেমন, মানুষ কুকুরকে বন্ধুত্বপূর্ণ ও বাধ্য আচরণের জন্য বেছে নিয়েছে। সেই প্রক্রিয়ায় লেজ নাড়ার প্রবণতাও বাড়তে পারে।
তবে সব গবেষকরা আবার এসব ধারণার সঙ্গে একমন নন। কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ভিক্টোরিয়ার বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী টম রেইমচেন এই ধারণাগুলো নিয়ে কিছুটা সন্দিহান।
তার মতে, গৃহপালিত কুকুর সত্যিই অন্য কুকুরজাতীয় প্রাণীর তুলনায় বেশি লেজ নাড়ে কিনা তা আরও গবেষণার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া দরকার।
বিশেষ করে বন্য প্রাণী, যেমন নেকড়ে বা অন্যান্য ক্যানিড প্রজাতির আচরণ আরও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
গবেষকদের মতে, কুকুরের লেজ নাড়ার রহস্য বুঝতে হলে শুধু লেজের নড়াচড়া দেখলেই হবে না। দেখতে হবে—কুকুরের মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে, তারা কীভাবে অনুভূতি প্রকাশ করে, লেজের গঠন ও নড়াচড়ার পেছনে কী ধরনের শারীরিক প্রক্রিয়া কাজ করে।
কুকুর ও মানুষের সম্পর্ক হাজার বছরের পুরোনো। তাই কুকুরের লেজ নাড়ার রহস্য উন্মোচন করা মানে শুধু একটি প্রাণীর আচরণ বোঝা নয়, বরং মানুষের সঙ্গে প্রাণীর সম্পর্কের বিবর্তনের গল্পও বুঝতে সহায়ক হবে।


