গল্প

কচ্ছপ উড়তে চেয়েছিল

dipu mahmud
দীপু মাহমুদ

এক যে ছিল এক কচ্ছপ। বয়স বেশি নয়। মাত্র একশ বছর। তার নাম টুকুন। সে থাকে সমুদ্রের ধারে সবুজ পাহাড়ের গর্তে।

সকালে সূর্য উঠলে টুকুন পাহাড়ের গর্ত থেকে বের হয়ে আসে। খোলসের ভেতর থেকে মাথা বের করে চারপাশ দেখে। তার ভালো লাগে আকাশ দেখতে। আর ভালো লাগে মাথার ওপর দিয়ে ডানা মেলে পাখি উড়ে যাওয়া দেখতে। টুকুনের মনে হয় পাখিরা কী সুন্দর মুক্ত আকাশে উড়ে বেড়ায়! আর সে থাকে মাটিতে। একটুও উড়তে পারে না। এটাই টুকুনের সবচেয়ে বড় দুঃখ।

প্রতিদিন সকালে টুকুন গর্ত থেকে বের হয়ে আসে। খোলস থেকে মাথা বের করে লম্বা গলা বাড়িয়ে দেয়। আকাশের দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে। ডানা মেলে উড়ে যাওয়া পাখি দেখে। আর ভাবে, ‘আহা! আমিও যদি পাখির মতো অমনভাবে উড়তে পারতাম!’

টুকুন একদিন বুদ্ধি করল। ছোট্ট এক পাখিকে ডেকে বলল, ‘ছোট্ট পাখি, বন্ধু আমার, তুমি আমাকে উড়তে শেখাবে?’
পাখি বলল, ‘অবশ্যই শেখাব। তবে ওড়ার জন্য তোমার ডানা লাগবে। আগে ডানা বানাও।’

টুকুন মেহগনি গাছের দুটো বড় পাতা নিয়ে এলো। পাতা দুটো শক্ত করে নিজের পিঠের দুই পাশে আটকে দিলো। তারপর একটা উঁচু পাথরের ওপর গিয়ে উঠল। 

পাখি বলল, ‘এবার লাফ দাও!’

টুকুন লাফ দিলো। ধপাস! পাথরের ওপর থেকে খাড়া গিয়ে পড়ল নিচের ঝোপজঙ্গলের ভেতর। খানিক দম নিয়ে টুকুন ঝোপের ভেতর থেকে মাথা বের করল। ছোট্ট পাখির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বেশ উড়লাম!’

ছোট্ট পাখি বলল, ‘তুমি উড়তে পারোনি। তুমি পড়ে গেছ।’

টুকুন কিছুক্ষণ ভেবে বলল, ‘তাহলে আবার চেষ্টা করি!’

পরদিন টুকুন নিজের পিঠে আরও বড় দুটো শাল পাতা আটকাল। সেদিন আরও উঁচু জায়গায় উঠল। সেখান থেকে লাফ দিল। ফটাস!

এবার গিয়ে পড়ল একটা কাঁকড়ার মাথার ওপর। কাঁকড়া রেগে গিয়ে বলল, ‘অ্যা! আকাশ থেকে কচ্ছপ পড়ে নাকি!’

টুকুন বলল, ‘আমি আকাশ থেকে পড়িনি। আমি আকাশে উড়তে গিয়ে নিচে নেমে এসেছি।’

কাঁকড়া বলল, ‘তা হলে আবার যাও। আকাশে গিয়ে ওড়ো।’

টুকুন আবার উঠল। কিন্তু এবার সে লাফ দেওয়ার আগেই জোর বাতাস হলো। বাতাসে তার পাতার ডানা দুটো ফুলে উঠল। বাতাসে টুকুন আচমকা শুঁউউউউউ করে একটুখানি ওপরে ওঠে! অমনি বিস্ময়ে টুকুনের চোখ গোল হয়ে গেল। সে ভাবল, ‘তাহলে আমি উড়ছি!’

তখন পাখি চিৎকার করে বলল, ‘শোনো, তুমি উড়ছ না! বাতাস তোমাকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে!’

টুকুন আনন্দ নিয়ে বলল, ‘উড়ছি তো!’

বাতাসের ধাক্কা পেয়ে টুকুন একটু সামনে গেল। তারপর আরও একটু। তারপর—ঝপাং! সোজা গিয়ে পড়ল সমুদ্রের পানিতে। পড়েই ডুবে গেল।

একটু পরে টুকুন পানির ওপর ভেসে উঠল। ছোট্ট পাখি এসে বলল, ‘কেমন লাগল উড়তে?’

টুকুন তখনই কিছু বলল না। চুপ করে থাকল। পানিতে সাঁতার কেটে খানিকবাদে গম্ভীর গলায় বলল, ‘ওড়ার ব্যাপারটা খারাপ নয়। তবে আমার মনে হয় আমি সাঁতার কাটতেই বেশি ভালোবাসি।’

পাখি বলল, ‘তাহলে তুমি উড়তে চাও না?’

টুকুন হাসল। বলল, ‘উড়তে চাই। তবে প্রতিদিন নয়। মাঝে মাঝে উড়ব, আর বাকি সময় সাঁতার কাটব।’

সেদিন থেকে টুকুন আর নিজের কচ্ছপ হওয়া নিয়ে দুঃখ করল না। কচ্ছপ হয়েছে বলে সে উড়তে পারে না ভেবে কষ্ট পেল না। টুকুন বুঝতে পেরেছে, সবাইকে সবকিছু করতে হয় না। নিজের যে কাজটা ভালো লাগে, সেটাও দারুণ ব্যাপার। সেটা ভালোভাবে করলে তাতেই অনেক আনন্দ।

আর পাখিটা! সে টুকুনের কাছে সাঁতার কাটা শিখতে সমুদ্রে নামল। একবার নয়, কয়েক বার। তবে সেখানে সমস্যা হয়েছে। পাখি সাঁতার কাটতে জানে না। তাই প্রতিবার পানিতে নামার আগে সে বলে, ‘টুকুন, এবার তুমি আমাকে আরও ভালোভাবে সাঁতার শেখাও।’

টুকুন হেসে বলল, ‘অবশ্যই। আগে তোমার ডানা দুটো খুলে ফেলো! ডানা নাড়ালে তুমি সাঁতার কাটতে গিয়ে উড়ে যাবে।’
পাখি বলল, ‘ডানা লাগিয়ে উড়তে গিয়ে তোমার কী দশা হয়েছে দেখেছি। ডানা খুলতে চাই না। আমি পাখি হয়েই থাকতে চাই!’

টুকুন বলল, ‘আর আমি থাকতে চাই কচ্ছপ হয়ে।’

তখন দুজন একসাথে হেসে উঠল। তারা কেউই অন্য কিছু হতে চায় না। তারা নিজেদের মতো হয়েই থাকবে। শুধু মাঝে মাঝে একটু একটু করে নতুন কিছু শিখবে।

সমুদ্রের ঢেউ হেসে বলল, ‘যে বন্ধু তোমাকে নিজের মতো থাকতে দেয়, সেই আসল বন্ধু।’

টুকুন তখন হেঁটে হেঁটে তার গর্তের দিকে যেতে থাকে। আর ছোট্ট পাখি তার সাথে উড়তে থাকে।