পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র কি আয়ু বাড়াতে পারে? গবেষণায় যা জানা গেল

স্টার অনলাইন ডেস্ক

পৃথিবীকে ঘিরে আছে এক অদৃশ্য শক্তি। এর নাম চৌম্বকক্ষেত্র। পৃথিবীর চারপাশে সব সময়ই এর উপস্থিতি রয়েছে।

নতুন এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা জানতে চেয়েছেন, এই অদৃশ্য চৌম্বকক্ষেত্র জীবের শরীরে কোনো প্রভাব ফেলে কি না। গবেষণাটি করা হয়েছে এক ধরনের ছোট মাছি বা ফ্রুট ফ্লাইয়ের ওপর।

গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র থেকে প্রায় পুরোপুরি দূরে রাখলে বিশেষ ধরনের কিছু মাছি প্রায় ২০ শতাংশ বেশি সময় বেঁচে থাকে।

তবে এর মানে এই নয় যে ঘরের ভেতরে গেলেই চৌম্বকক্ষেত্র থেকে দূরে থাকা যায়। কারণ এই চৌম্বকক্ষেত্র ঘরবাড়ির ভেতর দিয়েও যায়। এমনকি মানুষের শরীরের ভেতর দিয়েও এর প্রভাব পৌঁছায়।

যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব নটিংহামের একদল বিজ্ঞানী এই গবেষণাটি করেছেন। গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন প্রফেসর লিসা চাকরাবার্তি ও গবেষক জ্যাকব রিড।

গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ‘এজিং’ সাময়িকীতে।

Stepping up climate action through transparency

কীভাবে গবেষণা

বিজ্ঞানীরা কিছু ফ্রুট ফ্লাইকে একটি বিশেষ বক্সের মধ্যে রাখেন। বক্সটি তৈরি করা হয়েছিল নিকেল ও লোহা দিয়ে। এটি পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের প্রায় সবটাই আটকে রাখতে পারে।

এরপর বক্সের ভেতরের মাছিগুলোর সঙ্গে বাইরে থাকা মাছিগুলোর তুলনা করা হয়।

গবেষণায় দুই ধরনের মাছি ছিল। এক ধরনের মাছি ছিল সুস্থ। অন্য ধরনের মাছির শরীরে পিআইএনকে১ নামের একটি জিনে সমস্যা ছিল।
এই জিনে সমস্যা থাকলে মাছির শরীরের মাইটোকন্ড্রিয়া ঠিকভাবে কাজ করে না। মাইটোকন্ড্রিয়াকে কোষের ছোট্ট শক্তির কারখানা বলা যায়। এটি কোষকে কাজ করার জন্য শক্তি জোগায়।

গবেষণার ফল ছিল বেশ চমকপ্রদ। পিআইএনকে১ জিনে সমস্যা থাকা মাছিগুলোকে চৌম্বকক্ষেত্র থেকে দূরে রাখলে তারা প্রায় ২০ শতাংশ বেশি সময় বেঁচে থাকে। তবে তাদের হাঁটা ও ওঠার ক্ষমতা কিছুটা কমে যায়।

অন্যদিকে, সুস্থ মাছিগুলো চৌম্বকক্ষেত্র থেকে দূরে থাকলে ভালোভাবে উঠতে পারত। কিন্তু তাদের আয়ু বাড়েনি।

চৌম্বকক্ষেত্র কি তাহলে বার্ধক্যকে প্রভাবিত করে

গবেষণার ফল এমন একটি সম্ভাবনার কথা বলছে। তবে এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না যে, পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র মানুষের বয়স বাড়ার গতিও বদলে দেয়।

গবেষকেরা মনে করছেন, চৌম্বকক্ষেত্রের প্রভাব হয়তো জীবের মাইটোকন্ড্রিয়ার অবস্থার ওপর নির্ভর করে। তবে এর পেছনে ঠিক কী ঘটে, তা এখনো জানা যায়নি।

আর গবেষণাটি যেহেতু মাছির ওপর করা হয়েছে, তাই মানুষের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটবে কি না, তা জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

Globe on black background showing the inside layers that are orange and yellow

পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র কেন গুরুত্বপূর্ণ

পৃথিবীর অনেক ভেতরে রয়েছে গলিত লোহা। এই লোহার চলাচলের কারণে পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি হয়।

এই চৌম্বকক্ষেত্র পৃথিবীকে সূর্য থেকে আসা কিছু ক্ষতিকর কণা ও বিকিরণ থেকে রক্ষা করে। তাই পৃথিবীতে প্রাণের বসবাসের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

কিছু প্রাণী পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র বুঝতে পারে। পরিযায়ী পাখিরা যেমন দূর দেশে যাওয়ার সময় পথ চিনতে এটি কাজে লাগায়। তবে চৌম্বকক্ষেত্র জীবের শরীরের ভেতরের কাজকর্মে কী ধরনের প্রভাব ফেলে, সে বিষয়ে বিজ্ঞানীরা এখনো খুব বেশি জানেন না।

মহাকাশে গেলে কী হবে

এই গবেষণা ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। চাঁদ বা মঙ্গলে দীর্ঘ সময় কাটাতে হলে পৃথিবীর সুরক্ষামূলক চৌম্বকক্ষেত্রের বাইরে থাকতে হবে। তখন মানুষের শরীর এমন একটি পরিবেশে থাকবে, যা পৃথিবীর পরিবেশের চেয়ে আলাদা। তাই পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র জীবের শরীরে কীভাবে কাজ করে, তা জানা ভবিষ্যতে মহাকাশ ভ্রমণের ক্ষেত্রেও কাজে লাগতে পারে।