২০২৫ সালে ম্যালেরিয়ায় মৃত্যু ১৬, আক্রান্ত ১০ হাজার: লক্ষ্য অর্জনে পিছিয়ে বাংলাদেশ
২০২৫ সালে দেশে ম্যালেরিয়ায় অন্তত ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা গত নয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। মৃত্যুর এই ঊর্ধ্বমুখী হার ২০২৭ সালের মধ্যে ম্যালেরিয়ায় মৃত্যু শূন্যে নামিয়ে আনার জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকে এখন কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
গত বছর দেশে মোট ১০ হাজার ১৬২ জন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। এই সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় কম হলেও ২০৩০ সালের মধ্যে রোগটি সম্পূর্ণ নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা বিবেচনা করলে বেশ উদ্বেগজনক।
আগামী ২৫ এপ্রিল বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস। এর আগেই গত শুক্রবার ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমানের মৃত্যু হয়েছে। ফলে এই ব্যাধিটি আবারও আলোচনার টেবিলে এসেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম তিন মাসে ৪৬০ জন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। আর মাহবুবুর রহমানই এ বছরে প্রথম ব্যক্তি যিনি এ রোগে প্রাণ হারালেন।
৫৮ বছর বয়সী মাহবুবুর রহমানের রক্তে প্লাটিলেটের পরিমাণ কমে গিয়েছেল। এ কারণে গত ১৩ এপ্রিল রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়েছিল। পরে মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মাহবুবুর রহমান ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, সম্প্রতি একটি আফ্রিকান দেশ সফরের সময় তিনি ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন। তার মৃত্যুর সঠিক কারণ ও পরিস্থিতি পর্যালোচনায় অধিদপ্তর একটি ‘ওরাল অটোপসি’ (মৌখিক ময়নাতদন্ত) করবে।
ম্যালেরিয়া একটি প্রাণঘাতী রোগ। এটি পরজীবীর মাধ্যমে ছড়ায় এবং সংক্রমিত স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশার কামড়ে মানুষ এতে আক্রান্ত হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত বছর দেশের ১৩টি জেলা থেকে ১০ হাজার ১৫৮ জন ম্যালেরিয়া রোগী শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় প্রতিবেদন অনুযায়ী আরও ৪ জনসহ মোট আক্রান্তের সংখ্যা ১০ হাজার ১৬২।
জেলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া গেছে বান্দরবানে, ৫ হাজার ২৩ জন। এরপর যথাক্রমে রাঙামাটিতে ৩ হাজার ৬১৪ জন, কক্সবাজারে ৮৪৫ জন ও খাগড়াছড়িতে ৫৩৪ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এর অর্থাৎ, দেশের মোট আক্রান্তের ৯৮ দশমিক ৫৬ শতাংশই (১০ হাজার ১৬ জন) এই চার জেলার।
গত বছর যে ১৬ জন মারা গেছেন, তাদের মধ্যে ১১ জন চট্টগ্রামের হাসপাতালে, দুজন কক্সবাজারে এবং খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে একজন করে মারা গেছেন। এছাড়া ঢাকার কেন্দ্রীয় তালিকায় একজনের মৃত্যুর রেকর্ড রয়েছে।
২০১৬ সালে ম্যালেরিয়ায় ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এরপর থেকে ২০২৫ সালের এই ১৬ জনের মৃত্যুই সর্বোচ্চ। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এই সংখ্যাটি ৬ থেকে ১৪-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা জানান, গত বছর মৃতদের মধ্যে ছয়জন ছিলেন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা, যা মোট মৃত্যুহার বাড়ার অন্যতম কারণ।
এ বছর জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে পাঁচ জেলা থেকে ৪৬০ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে বান্দরবানে ২১৪, রাঙামাটিতে ১৭৯, কক্সবাজারে ৪৯, খাগড়াছড়িতে ১৩ ও চট্টগ্রামে ৫ জন।
তবে কর্মকর্তারা জানান, সাধারণত মে থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত ম্যালেরিয়ার মূল মৌসুমে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) হালিমুর রশিদ অবশ্য আশাবাদী। তিনি বলেন, তারা ম্যালেরিয়া নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সঠিক পথেই আছেন।
২০২২ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২০২৪-২০৩০ মেয়াদের জন্য একটি জাতীয় কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়ন করে। এর লক্ষ্য ছিল ২০২৭ সালের মধ্যে দেশে ম্যালেরিয়ায় মৃত্যু শূন্যে নামানো এবং ২০৩০ সালের মধ্যে দেশ থেকে ম্যালেরিয়া সম্পূর্ণ নির্মূল করা।
তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এম এ ফয়েজ মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই দুটি লক্ষ্য অর্জনই অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। তিনি বলেন, কক্সবাজারের ক্যাম্পের প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার অনেকেই পাহাড়ি এলাকায় গিয়ে আক্রান্ত হচ্ছেন। সচেতনতার অভাবে তারা চিকিৎসা নিতে দেরি করছেন, যা টেকনাফ ও উখিয়ায় সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা চারটি জেলাই প্রতিবেশী দেশের সীমান্তবর্তী। ফলে সীমানার ওপারে রোগটি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে এ দেশে নির্মূল করা কঠিন।
বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণভাবে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের তহবিল সংকুচিত হয়ে আসছে।
ডা. ফয়েজ আরও বলেন, আমরা ধরে নিয়েছি ৫১টি জেলা ম্যালেরিয়ামুক্ত, কিন্তু নির্মূলের ঘোষণা দেওয়ার আগে আমাদের বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে এটি নিশ্চিত করতে হবে।