বান্দরবানে হাম উপসর্গে খুমী পাড়ায় ৭ শিশুর মৃত্যু

মংসিং হাই মারমা
মংসিং হাই মারমা

বান্দরবানের রুমা উপজেলার দুর্গম লেতং খুমীপাড়ায় হামের উপসর্গ নিয়ে গত ১৫ দিনে সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

বান্দরবান সদর হাসপাতাল থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে গতকাল ফ্রেএং খুমী (৪) নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়। দুদিন আগে রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পথে মারা যায় তার বড় ভাই প্রেটংএং খুমী (৭)।

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ দিনে লেতং খুমীপাড়ায় মারা যাওয়া সাত শিশু হলো ফ্রেলে এ খুমী (৯), খ্রেপা খুমী (১৩), শইফ্রা খুমী (১৩), খ্রেতেম এং খুমী (৬), পলি এং খুমী (৭), প্রেটংএং খুমী (৭) এবং ফ্রেএং খুমী (৪)। তারা সবাই রুমা সদর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ওই পাড়ার বাসিন্দা।

লেতং খুমীপাড়ার কারবারি (গ্রামপ্রধান) শৈলুং খুমী জানান, তিনি তার সন্তান ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে যৌথ পরিবারে বসবাস করেন। 

তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘মারা যাওয়া সাত শিশুর মধ্যে একজন আমার নিজের সন্তান। দুজন আমার ছেলের এবং দুজন মেয়ের সন্তান। আর বাকি শিশুরা আমার পাড়ারই নিকটাত্মীয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘দুজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে হাসপাতালে নেওয়ার পথে। অন্যরা অসুস্থ অবস্থায় পাড়াতেই মারা গেছে। এখন কারও শরীরে হামের লক্ষণ দেখা দিলেই আমরা কষ্ট করে হলেও তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি।’

শৈলুং খুমী জানান, লেতং পাড়ায় ২৮টির মতো খুমী পরিবার বসবাস করে। বগালেক থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে এই পাড়ায় পৌঁছাতে পাহাড়ি পথ ধরে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় হাঁটতে হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা অংসাই খুমী জানান, লেতং পাড়া অত্যন্ত দুর্গম। সেখানে ২৮টি খুমী পরিবার বসবাস করে। 

বান্দরবান
ছবি: স্টার

হাসপাতালে রোগীর চাপ

গতকাল সোমবার রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, হামের উপসর্গ থাকা শিশুদের জন্য আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। 

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত ৬ জুন থেকে গতকাল পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে প্রায় ১০০ শিশু চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে ২২ জনকে বান্দরবান সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে ১৩ শিশু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি রয়েছে। বাকিরা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।

যাদের অবস্থা সংকটাপন্ন, তাদেরকে বান্দরবান সদর হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। তবে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একমাত্র অ্যাম্বুলেন্সটি অচল থাকায় সদর হাসপাতালে যেতে প্রায় ৫ হাজার টাকায় গাড়ি ভাড়া করতে হচ্ছে।

বান্দরবান সদর হাসপাতালে বর্তমানে ২৫ জন শিশু চিকিৎসাধীন। হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. মো. তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, চার বছর বয়সী ফ্রেএং খুমীর অক্সিজেনের মাত্রা ওঠানামা করছিল। হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা না থাকায় তাকে চট্টগ্রামে পাঠানো হয়। কিন্তু পৌঁছানোর পরপরই সে মারা যায়।

ইউনিসেফের টিকাদানকর্মী উথোয়াই সিং মারমা জানান, লেতং খুমীপাড়ার প্রায় প্রতিটি ঘরেই শিশুরা হামে আক্রান্ত। অনেক পরিবার আধুনিক চিকিৎসার বদলে ভেষজ চিকিৎসার ওপর নির্ভর করছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা সেখানে ৩০ থেকে ৩৫টি শিশুকে টিকা দিয়েছি। তিনজনকে হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, এদের মধ্যে একজন পথে মারা যায়।’

রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আব্দুল্লাহ আল হাসান বলেন, ‘দুর্গম পাহাড়ি এলাকার অনেক পরিবার নিয়মিত টিকা নেয় না। বাইরে পড়াশোনা করা শিশুদের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে।’

তিনি জানান, এসব এলাকায় ইতিমধ্যে এক সপ্তাহব্যাপী বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। যেসব এলাকায় টিকাদানের হার কম, সেখানে উপজেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে বিশেষ টিকা অভিযান চালানো হবে।

রুমা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লিজা আক্তার বিথী বলেন, খবর পাওয়ার পর স্বাস্থ্য বিভাগকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দুর্গম এলাকার সব শিশুর টিকাদান ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে প্রশাসন সহযোগিতা করবে।