বাংলা না জানায় চিকিৎসা নিয়ে বিপাকে হাম আক্রান্ত মা ও ১০ মাসের ছেলে
হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে পাশাপাশি দুটি শয্যায় শুয়ে আছেন মা ও তার ১০ মাস বয়সী শিশু। দুজনের শরীরেই হামের লালচে দাগ, সঙ্গে জ্বর ও দুর্বলতা। মাঝেমধ্যে কেঁদে উঠছে শিশুটি। নিজের জ্বর, ব্যথা ও ক্লান্তি ভুলে সন্তানের কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন মা। নিজের অসুস্থতার চেয়েও সন্তানের কষ্টই যেন তার কাছে বড়।
আজ রোববার সকালে বান্দরবান সদর হাসপাতালের হাম আক্রান্ত রোগীদের জন্য নির্ধারিত আইসোলেশন ওয়ার্ডে এমন দৃশ্য দেখা যায়।
মা লেংরুং ম্রো (২২) ও ছেলে মাংচুং ম্রো হামে আক্রান্ত হয়ে গত ২৬ জুলাই থেকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাদের বাড়ি বান্দরবানের রুমা উপজেলার গ্যালেংগ্যা ইউনিয়নের দুর্গম চিনিপাড়ায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সন্তান জন্মের মাত্র তিন মাস পর লেংরুংকে তালাক দিয়ে চলে যান স্বামী পায়াং ম্রো। এরপর থেকে একাই ছেলেকে বড় করে তোলার দায়িত্ব কাঁধে নেন তিনি। দারিদ্র্য, ভাঙা সংসার আর দুর্গম পাহাড়ি জীবনের কঠিন বাস্তবতার মধ্যেই চলছিল তার জীবনসংগ্রাম।
এরই মধ্যে রুমার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় হামের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ে। অন্য অনেক পরিবারের মতো লেংরুংও শুরুতে আধুনিক চিকিৎসার বদলে স্থানীয় প্রচলিত বিশ্বাসের ওপর ভরসা করেন। পাহাড়ি লতাপাতা ও কবিরাজি চিকিৎসার মাধ্যমে মা-ছেলের চিকিৎসা চলতে থাকে। কিন্তু তাতে তাদের অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি।
একপর্যায়ে শিশু মাংচুংয়ের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে লেংরুংয়ের বড় বোনের স্বামী গত ২৬ জুলাই তাদের বান্দরবান সদর হাসপাতালে নিয়ে আসেন। এরপর থেকে মা-ছেলে দুজনই হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
তবে অসুস্থতার পাশাপাশি লেংরুংকে প্রতিনিয়ত আরেকটি বড় সমস্যারও মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সেটি হলো—ভাষাগত বাধা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, লেংরুং বাংলায় কথা বলতে পারেন না। চিকিৎসক বা নার্সরা কিছু জানতে চাইলে তিনি অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকেন। ভাষাগত সীমাবদ্ধতায় নিজের কষ্ট, সন্তানের অবস্থা কিংবা প্রয়োজনের কথাও ঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারেন না।
হাসপাতালে সবসময় লেংরুংয়ের সঙ্গে থাকেন ছোট ভাই মাঙইন। চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলা, ওষুধ বুঝে নেওয়া ও প্রয়োজনীয় সব কাজে তিনিই সহযোগিতা করেন।
মাঙইন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমার দিদি বাংলা ভাষা জানেন না। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিতে পারেন না। তাই আমি তাকে একা রেখে কোথাও যেতে পারি না।’
তিনি বলেন, ‘গত ২৮ জুলাই একই পাড়ার আরেক মা হামে আক্রান্ত হয়ে এই হাসপাতালের পাশের শয্যায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। মৃত্যুর আগে তিনি তার দুই সন্তানকে রেখে যান। ঘটনাটি নিজের চোখে দেখার পর লেংরুং আরও ভেঙে পড়েন।’
‘নিজেও জ্বরে কাতর লেংরুংয়ের পুরো মনোযোগ সন্তানের দিকে। শিশুটি একটু কেঁদে উঠলেই দুর্বল শরীর নিয়েই সেবা করতে এগিয়ে যান তিনি। নিজের কষ্টের চেয়ে সন্তানের সুস্থতাই যেন তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ’, বলেন মাঙইন।
বান্দরবান সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. তৌহিদুল আনোয়ার ডেইলি স্টারকে বলেন, দুর্গম এলাকা থেকে হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ম্রো, খুমি, খিয়াং, মারমাসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অনেক রোগী ও তাদের স্বজন বাংলা ভাষা জানেন না। ফলে রোগীর সমস্যা বোঝা, রোগের রেকর্ড জানা ও চিকিৎসা ব্যাখ্যা করাও অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা চিকিৎসাসেবার বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, সম্প্রতি সিভিল সার্জন কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত জরুরি সভায় হাসপাতালের পেছনে নির্মাণাধীন ২৫০ শয্যার ভবনটি অস্থায়ীভাবে ব্যবহার করে হাম রোগীদের জন্য পৃথক সেবাকেন্দ্র চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে সেটি এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।
তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, একটি জেলা হাসপাতালে আইসিইউ, সিসিইউসহ আধুনিক চিকিৎসা সুবিধা থাকা অত্যন্ত জরুরি। কারণ দুর্গম পাহাড়ি এলাকার দরিদ্র রোগীদের জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাওয়া যেমন কঠিন, তেমনি অনেক রোগী পথেই মৃত্যুঝুঁকিতে পড়েন।
রুমা উপজেলার ২ নম্বর সদর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অংসিংনু মারমা ডেইলি স্টারকে বলেন, রুমা উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় হামের উপসর্গে ইতোমধ্যে অন্তত নয়জন শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এখনো বহু পরিবার চিকিৎসাসেবা, টিকাদান, পুষ্টিকর খাদ্য এবং স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাবে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান এবং সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে না পারাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
তিনি বলেন, লেংরুং ম্রোর গল্প শুধু একজন মায়ের বেদনার গল্প নয়। এটি পার্বত্য অঞ্চলের প্রত্যন্ত জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা বঞ্চনা, ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা, দারিদ্র্য এবং রাষ্ট্রীয় সেবার সীমিত প্রাপ্যতার নির্মম বাস্তবতাও তুলে ধরে।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২ আগস্ট পর্যন্ত জেলায় হামে আক্রান্ত চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা ৪৪ জন। এর মধ্যে রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৬ জন চিকিৎসাধীন। তাদের মধ্যে ৮ জনই শিশু।
এছাড়া থানচি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৭ জন ও বান্দরবান সদর হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে ২১ জন চিকিৎসাধীন। সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীনদের মধ্যে ১৫ জনই শিশু।