নেতানিয়াহুকে হারাতে একজোট হলেন দুই সাবেক প্রধানমন্ত্রী
আগামী অক্টোবর মাসে ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বিরোধী দলগুলো বেশ কয়েকবার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জোট সরকার ভাঙার চেষ্টা চালালেও তা ব্যর্থ হয়েছে। আগাম নির্বাচনের উদ্যোগও আলোর মুখ দেখেনি।
এবার দেশটির সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী একজোট হয়ে নেতানিয়াহুকে হটানোর উদ্যোগ নিয়েছেন।
আজ রোববার বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে এই তথ্য জানা গেছে।
ইসরায়েলি বিরোধী দলীয় নেতা ইয়াইর লাপিদ আজ জানান, তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট-এর সঙ্গে জোটবদ্ধ হতে চলেছেন। উদ্দেশ্য, নেতানিয়াহুকে পরাজিত করা।
লাপিদ নিজেও দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, অক্টোবরের পার্লামেন্ট নির্বাচনে উভয় নেতা যৌথভাবে প্রার্থীর তালিকা উপস্থাপন করবেন।
এ বিষয়ে পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে।
দুই নেতা এক হলেন যেভাবে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে লাপিদ বলেন, তারা দুইজন মিলে আজ ‘ইসরায়েলি রাষ্ট্র সংস্কার উদ্যোগের প্রথম ধাপ নিয়ে ঘোষণা দিচ্ছেন। দুই দল “ইয়েশ আতিদ” ও “বেনেট ২০২৬” একীভূত হয়ে একটি একক দল হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের নেতৃত্বে নির্বাচনে অংশ নেবে।’
‘এই একীভূতকরণের মাধ্যমে ইসরায়েলের জন্য জরুরি হয়ে পড়া সংস্কার উদ্যোগের প্রতি আমরা সবাই নজর দিতে পারবো’, যোগ করেন তিনি।
২০২৩ সালে গাজায় নির্বিচার হামলা শুরুর পর থেকেই নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে সোচ্চার ওই দুই নেতা।
তবে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র বাহিনী হামাসের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার বিষয়টিতে কোনো আপত্তি নেই তাদের।
দুই নেতার মত, সঠিকভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করতে পারেননি নেতানিয়াহু।
যার ফলে বিশ্ববাসীর কাছে একজন ব্যর্থ নেতা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন তিনি।
সর্বশেষ ইরানের বিরুদ্ধে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মতি দেওয়ার বিষয়টিকে ‘রাজনৈতিক বিপর্যয়’ আখ্যা দেন লাপিদ।
কে এই নাফতালি বেনেট
কট্টর ডানপন্থি রাজনীতিবিদ বেনেট দীর্ঘদিন ধরে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের পক্ষে তার সমর্থনের কথা বলে যাচ্ছেন।
জনমত জরিপে জানা গেছে, অক্টোবরের ভোটে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা হিসেবে এগিয়ে আছেন বেনেট।
মার্কিন অভিবাসীদের সন্তান বেনেট (৫৪) রাজনীতিতে আসার আগে হাই-টেক প্রতিষ্ঠানে উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন।
তিনি ২০০৫ সালে তার স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান ‘সাইওটা’ ১৪৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে বিক্রি করে দেন।
পাশাপাশি, তিনি ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে কমান্ডার হিসেবে কাজ করেছেন তিনি।
সব মিলিয়ে, দেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে একজন আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছেন। দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলতে থাকা গাজার যুদ্ধ থেকে তরুণ প্রজন্ম মুক্তি চায়—আর সেই মুক্তি বেনেটের হাত দিয়ে আসতে পারে। এমনটাই ভাবছেন তরুণ-তরুণীরা।
এক কালে নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ ছিলেন তিনি। অনেকে বলেন, তাদের মধ্যে গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবেও কিছুদিন কাজ করেন বেনেট।
কিন্তু কালের আবর্তে ‘গুরুর’ চরম বিরোধী ও কট্টর সমালোচক হিসেবে নিজের ভাবমূর্তি গড়ে তোলেন তিনি।
২০২১ সালে বহুদলীয় জোট সরকারের নেতৃত্ব দেওয়ার আগে তিনি বেশ কয়েকটি ডানপন্থি দলের নেতৃত্ব দেন।
কে এই ইয়াইর লাপিদ
তার নতুন রাজনৈতিক মিত্র লাপিদ (৬২) প্রয়াত সাংবাদিক ও মন্ত্রী টমি লাপিদ ও প্রখ্যাত লেখক শুলামিত লাপিদের সন্তান।
২০১২ সালে নিজ দল ইয়েশ আতিদ গঠন করে রাজনীতির অঙ্গনে প্রবেশ করেন লাপিদ। অল্প সময়ের মধ্যে দলটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নেয়।
রাজনীতিতে আসার আগে তিনি টেলিভিশন সাংবাদিক হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন।
স্বল্পকালীন প্রধানমন্ত্রীত্বের স্বাদ পেলেও রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের বেশিরভাগ সময় তিনি কাটিয়েছেন বিরোধী দলের নেতা হিসেবে।
২০২১ সালের জুনে মধ্যপন্থি নেতা লাপিদ জোট সরকারের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
২০২২ সালের জুনে জোট সরকারে ভাঙন দেখা দেয়। অবশেষে বছরের শেষের দিকে অল্প কিছুদিন অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর নেতানিয়াহুর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন লাপিদ।
অক্টোবরের নির্বাচন ও নেতানিয়াহুর ভাবমূর্তি
অক্টোবরের নির্বাচনে নিজ দল ‘লিকুদ পার্টির’ নেতৃত্ব দেবেন নেতানিয়াহু।
৭৬ বছর বয়সী এই নেতা ইসরায়েলে সবচেয়ে বেশিদিন ধরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কাজ করার অনন্য রেকর্ড গড়েছেন। বিভিন্ন মেয়াদে মোট ১৮ বছরেরও বেশি সময় তিনি এই দায়িত্ব পালন করেছেন।
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ‘প্রধানমন্ত্রী ধরে রাখার জন্য’ যুদ্ধে জড়ানোর গুরুতর অভিযোগ আছে। পাশাপাশি, তার বিরুদ্ধে ইসরায়েলি আদালতে দুর্নীতির মামলাও চলমান।
বিশ্বজুড়ে নিন্দিত এই নেতা নিজ দেশেও বড় আকারে জনপ্রিয়তা হারিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক আদালতে ‘গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত’ নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে জারি হয়েছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। নিউইয়র্কের জনপ্রিয় মেয়র জোহরান মামদানি বলেছেন, তার অঙ্গরাজ্যে এলেই গ্রেপ্তার হবেন নেতানিয়াহু।
ইসরায়েলের সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র নেতানিয়াহুকে বিদায় করতে পারবেন কী না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
