৪০০ বছর পর লন্ডনে পাওয়া গেল শেক্সপিয়ারের বাড়ি

স্টার অনলাইন ডেস্ক

মধ্য লন্ডনের এক পুরোনো মহল্লা ব্ল্যাকফ্রায়ারস। ১৩১৭ সালের নথিপত্রে এই মহল্লার নাম আছে। এই প্রাচীন জনবসতি গড়ে উঠেছিল টেমস নদীর তীরে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান বাহিনীর ব্যাপক বোমা বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এলাকাটি। ভিক্টোরীয় ও জর্জিয় স্থাপত্যশৈলীর বাড়িঘরের জন্য খ্যাতি ছিল ব্ল্যাকফ্রায়ারসের। 

জনপ্রিয় টেলিভিশন ধারাবাহিক ‘শার্লক হোমস’ ও ‘ডেভিড কপারফিল্ড’-এর শুটিং সেট হিসেবে ব্ল্যাকফ্রায়ারসের দৃষ্টিনন্দন বসত-বাড়িগুলো ব্যবহার করা হতো।

এই ব্ল্যাকফ্রায়ারসের পুবে ‘দ্য টেম্পল’ হিসেবে পরিচিত লন্ডনের আদালত ভবন; আর দক্ষিণ-পশ্চিমে বিখ্যাত সেন্ট পল’স ক্যাথিড্রাল। ব্ল্যাকফ্রায়ারস থেকে আধ ঘণ্টার হাঁটা পথে বিখ্যাত ব্রিটিশ মিউজিয়াম।

ব্ল্যাকফ্রায়ারস ব্রিজের মাধ্যমে টেমসের উত্তর-দক্ষিণ তীর যুক্ত হয়েছে। ১৮৬৯ সালে সেতুটি উদ্বোধন করেছিলেন রানি ভিক্টোরিয়া। এই সেতু থেকে লন্ডনের সুপরিচিত টাওয়ার ব্রিজের হাঁটা দূরত্ব প্রায় আধা ঘণ্টার। ১৮৯৪ সালে বিশ্বখ্যাত সেই সেতুটির কাজ শেষ হয়।

ব্ল্যাকফ্রায়ার্স ব্রিজ। ফাইল ছবি: সংগৃহীত
ব্ল্যাকফ্রায়ার্স ব্রিজ। ফাইল ছবি: সংগৃহীত

ব্ল্যাকফ্রায়ারস রেল স্টেশন থেকে শেক্সপিয়ার-খ্যাত গ্লোব থিয়েটারে হেঁটে যেতে সময় লাগে প্রায় ১৫ মিনিট।

আসলে ইংরেজি সাহিত্যের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়ারকে নিয়ে নতুন তথ্য জানাতেই এত কথার অবতারণা।

গত ১৬ এপ্রিল বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়—অবশেষে খুঁজে পাওয়া গেল লন্ডনে শেক্সপিয়ারের ‘হারিয়ে যাওয়া’ বাড়ি। গত প্রায় ৪০০ বছর ধরে সেই বাড়িটির অস্তিত্ব ছিল ‘রহস্যে ঘেরা’।

আচমকা এক পুরোনো মানচিত্র ও বাড়ির পরিকল্পনা শেক্সপিয়ার গবেষক ও অধ্যাপক লুসি মুনরোর হাতে পড়ায় এই দীর্ঘ রহস্যের অবসান ঘটে। এখন শুধু বাড়ির অবস্থান সম্পর্কিত তথ্য নয়, মিলে গেছে এর আয়তন-নকশাও।

শেক্সপিয়ারের বইয়ের সম্ভার। ছবি: সংগৃহীত

এবার সুনিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় এই গবেষক।

আগে যা ধারণা করা হয়েছিল তার চেয়ে বেশি সময় শেক্সপিয়ার লন্ডনে থেকেছিলেন বলেও মত পাওয়া যাচ্ছে এই গবেষকের পক্ষ থেকে।

যেভাবে মিললো শেক্সপিয়ারের বাড়ি

এ কথা অনেক দিন থেকেই গবেষকদের জানা ছিল যে—উইলিয়াম শেক্সপিয়ার মধ্য লন্ডনে, টেমসের উত্তরপারে সেন্ট পল’স ক্যাথেড্রালের কাছে বাড়ি কিনেছিলেন।


কিন্তু, এ নিয়ে ধোঁয়াশা ছিল। সেই ধোঁয়াশা এখনো অনেকটা কেটে গেলেও, পুরোপুরি কেটেছে বলা যাচ্ছে না।

বিবিসির প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, লন্ডনের কিংস কলেজের শেক্সপিয়ার ও প্রাক-আধুনিক সাহিত্যের অধ্যাপক লুসি মুনরো ভিন্ন একটি বিষয় নিয়ে কাজ করতে গিয়ে এই অসাধারণ কাজটি করে ফেলেছেন।

তিনি লন্ডন আর্কাইভস ও ন্যাশনাল আর্কাইভস থেকে যেসব নথি পেয়েছেন তা ব্ল্যাকফ্রায়ারসে শেক্সপিয়ারের বাড়ি সম্পর্কে ৪ শতকের রহস্যময়তার অবসান ঘটায়।

লুসি মুনরোর ভাষ্য: ‘ভিন্ন একটা গবেষণা কাজে ব্যস্ত ছিলাম। বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না যে শেক্সপিয়ারের ব্ল্যাকফ্রায়ারসের বাড়ির পরিকল্পনা ও নকশা হাতে পেয়ে যাবো।’

যে বছর লন্ডন পুড়েছিল তার দুই বছর পর ব্ল্যাকফ্রায়ারস এলাকার একটি অংশের মানচিত্র এই অধ্যাপকের হাতে পড়ে। ১৬৬৮ সালের সেই মানচিত্রে শেক্সপিয়ারের বাড়ির অবস্থান ও আয়তন উল্লেখ করা আছে।

অধ্যাপক মুনরো আরও জানান, শেক্সপিয়ারের বাড়িটি ব্ল্যাকফ্রায়ারস থিয়েটারের কাছেই ছিল। গ্লোব থিয়েটারের পাশাপাশি ব্ল্যাকফ্রায়ারস থিয়েটারেও শেক্সপিয়ার কাজ করেছিলেন।

শেক্সপিয়ারের নাতনি সেই বাড়ি বিক্রিটি করে দেন। সেই নথিও মিলেছে।

ধারণা করা হতো—নাটকের কাজ থেকে অবসর নেওয়ার অল্প দিন আগে শেক্সপিয়ার সেই বাড়িটি কিনেছিলেন। এরপর তিনি তার জন্মস্থান ওয়ারউইকশায়ার শহরের স্ট্র্যাটফোর্ড-আপঅন-অ্যাভনে ফিরে যান।

সেই শহরেই তিনি বেড়ে উঠেছিলেন।

তবে অধ্যাপক মুনরোর নতুন আবিষ্কার এই বিশ্বাস জাগাচ্ছে যে শেক্সপিয়ার জীবনের শেষ বেলায় পূর্ববর্তী ধারণার চেয়ে বেশি সময় লন্ডনে কাটিয়েছিলেন।

গত ১৪ এপ্রিল অধ্যাপক মুনরো সংবাদমাধ্যম সিএনএন-কে বলেন, ‘অনেক অবাক হয়েছি।’

তিনি জানান, লন্ডন আর্কাইভসে স্থানীয় নাট্যমঞ্চ নিয়ে কাজ করার সময় বাড়ির পরিকল্পনার একটি অংশ হাতে আসে। সেই পরিকল্পনায় ব্ল্যাকফ্রায়ারস এলাকার ১৬৬৮ সালের মানচিত্র ছিল।

কেমন ছিল শেক্সপিয়ারের বাড়ি?

শেক্সপিয়ার-বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক লুসি মুনরো সিএনএন-কে আরও বলেন, ‘বাড়িটা খুব বড় না। আবার খুব ছোটও না। সেখানে দুটি বাড়ি তৈরির মতো জায়গা আছে।’

তিনি জানান যে, তার হাতে বাড়ির পরিকল্পনা আসার পর তিনি শেক্সপিয়ারের বাড়ির অবস্থান ও নকশা নিয়ে কাজ শুরু করেন। তার মতে, বাড়িটি ইংরেজি এল বর্ণাকৃতির। এর সঙ্গে একটি গেট-হাউস যুক্ত ছিল।

এই অধ্যাপক আরও জানান যে, ১৬১৩ সালে শেক্সপিয়ার যখন বাড়িটি কিনেন তখন ব্ল্যাকফ্রায়ারস একটি অভিজাত এলাকা হিসেবে সমাদৃত ছিল। এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুই বদলে যায়।

‘অনেক অভিজাত ব্যক্তি সেই মহল্লায় থাকতেন। ব্যবসায়ীদের সংখ্যা ধীরে ধীরে বেড়ে যায়,’ বলেন লুসি মুনরো।

১৬১৬ সালে ৫২ বছর বয়সে মারা যাওয়ার আগে ও পরে শেক্সপিয়ারের জীবন সম্পর্কে নতুন নতুন তথ্য মিলেছে এই গবেষণার মাধ্যমে, জানান অধ্যাপক মুনরো।

সবার বিশ্বাস—গ্লোব থিয়েটার থেকে অবসর নেওয়ার পর শেক্সপিয়ার তার জন্মস্থানে ফিরে যান। নতুন এই আবিষ্কার সেই বিশ্বাসকে এখন প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

যে গ্লোব থিয়েটারে শেক্সপিয়ারের অধিকাংশ নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল ১৬১৩ সালের জুনে সেই প্রতিষ্ঠানটি পুড়ে যায়।

অধ্যাপক মুনরো আরও বলেন, ‘শেক্সপিয়ার অর্থনৈতিক লাভ-লোকসানের চিন্তা মাথায় রেখে সেই বাড়িটি কিনেছিলেন বলে মনে হয় না। তিনি লন্ডনের অন্যান্য এলাকাতেও বাড়ি কিনতে পারতেন। তিনি ব্ল্যাকফ্রায়ারসে বাড়ি কিনেছিলেন এই কারণে যে, সেখান থেকে ৫ মিনিটের হাঁটা পথে গ্লোব থিয়েটারে যাওয়া যেত।’

১৬১৩ সালে আগুনে পুড়ে যাওয়া আগ পর্যন্ত সেই গ্লোব থিয়েটারের সঙ্গে শেক্সপিয়ার যুক্ত ছিলেন বলেও মনে করেন অধ্যাপক মুনরো। তবে শেক্সপিয়ারকে নিয়ে আরও অনেক গবেষণার প্রয়োজন বলেও মত দেন তিনি।

‘অসাধারণ আবিষ্কার’

পুরোনা নাট্যমঞ্চ গ্লোবের স্থলাভিষিক্ত শেক্সপিয়ার্স গ্লোব-এর শিক্ষা পরিচালক উইল তোশ কিংস কলেজের অধ্যাপক লুসি মুনরোর এই আবিষ্কারকে ‘অসাধারণ’ আখ্যা দিয়েছেন।

সেই ঐতিহাসিক গ্লোব থিয়েটার পুড়ে যাওয়ার পর সেই জায়গায় নতুন করে এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা হয়েছে।

উইল তোশ সিএনএন-কে বলেন, ‘মুনরোর আবিষ্কার শেক্সপিয়ারকে লন্ডনের নাট্যকার হিসেবে নতুনভাবে ভাবার সুযোগ দিয়েছে। তার এই আবিষ্কার বুঝিয়ে দিয়েছে যে এই শহর আমাদের শ্রেষ্ঠ নাট্যকারের শহর ছিল। শেক্সপিয়ার এই শহরে কাজ করতেন। এই শহরে তার বাড়িও ছিল।’

ইংরেজি ভাষার শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক উইলিয়াম শেক্সপিয়ারকে নিয়ে অধ্যাপক লুসি মুনরোর এমন আবিষ্কার ‘রহস্য-ঘেরা’ এই মানুষটির জীবন-কর্ম সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী ছাত্র-শিক্ষক-গবেষকদের আরও আগ্রহী করে তুলবে বলেও আশা করছেন অনেকে।