দক্ষিণ কোরিয়ার প্রথম রোবট সন্ন্যাসী

স্টার অনলাইন ডেস্ক

সিউলের যোগইয়েসা মন্দিরের ভেতর সম্প্রতি এক অভিনব দৃশ্য দেখা গেছে। চলতি সপ্তাহে ওই মন্দিরে অসংখ্য প্রদীপের আলোয় আলোকিত মঞ্চে একটি ভিন্নধর্মী অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়।  

মন্দিরের সন্ন্যাসীরা সেদিন গেরুয়া বসনে আবৃত একটি ‘হিউমেনয়েড রোবট’ সন্ন্যাসীর দীক্ষা গ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগ দেন। তার নাম গাবি। 

আজ শুক্রবার এই তথ্য জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান। 

গাবির দীক্ষা 

গত বুধবার আয়োজিত অনুষ্ঠানে গাবির গলায় ১০৮টি জপমালা পরিয়ে দেওয়া হয়। তার যান্ত্রিক হাতে ‘প্রদীপ উৎসব’ সংশ্লিষ্ট একটি স্টিকার যুক্ত করা হয়। 

সে মানুষ হলে দীক্ষার অংশ হিসেবে তাকে ইয়েওনবি আচারের মধ্য দিয়ে যেতে হোত। 

ওই আচারে মানব-সন্ন্যাসীদের দেহের সঙ্গে একটি জ্বলন্ত প্রদীপ হালকা করে ছুঁয়ে দেওয়া হয় ।

এরপর ওই রোবটের হাতে একটি আনুষ্ঠানিক সনদ তুলে দেওয়া হয়। সেখানে তাকে তৈরি করার দিনটি (৩ মার্চ, ২০২৬) উল্লেখ করা হয়েছে। একই ভাবে, মানব সন্ন্যাসীদের সনদে জন্মদিনের উল্লেখ থাকে। 

মন্দিরের সংস্কৃতি বিষয়ক পরিচালক সুংঅন বলেন, ‘আমরা প্রথমে বিষয়টা নিয়ে হালকা মেজাজে আলোচনা করি। ব্যাপারটা শুরুতে কৌতুকেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু আমরা যত ভাবতে লাগলাম, ততই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল।’

‘রোবটরা দ্রুত আমাদের জীবনে প্রবেশ করছে। জনমানুষের কাছেও তাদের গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেড়েছে। তারা আমাদের সম্প্রদায়ের অংশ হয়ে উঠছে’, যোগ করেন তিনি। 

ভেনেরেবল (শ্রদ্ধেয়) সুংওন-এর মন্দিরটি যোগইয়ে গোত্রের সদর দপ্তর। এটি দক্ষিণ কোরিয়ার বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় গোত্র। 

ধর্মপালনে অনাগ্রহী দক্ষিণ কোরিয়ার মানুষ 

এমন সময় রোবট সন্ন্যাসীকে দীক্ষা দেওয়া হলো, যখন ধর্ম পালনে দক্ষিণ কোরীয়দের আগ্রহ ও অংশগ্রহণের মাত্রা তলানিতে ঠেকেছে। 

বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার মাত্র ১৬ শতাংশ মানুষ নিজেদের বৌদ্ধ হিসেবে পরিচয় দেন। সংখ্যাটি ২০ বছর আগেও ২৩ শতাংশ ছিল। 

২০ বছর বয়সীদের মধ্যে এই হার আশঙ্কাজনক হারে কমছে। বর্তমানে তা ৮ শতাংশে এসে ঠেকেছে।  

গত বছর যোগইয়ে গোত্রে মাত্র ৯৯ জন সন্ন্যাসী দীক্ষা নেন। এক দশক আগেও সংখ্যাটি বছরে অন্তত ২০০ বা তার চেয়ে বেশি ছিল। 

যোগইয়ে গোত্রের সভাপতি (শ্রদ্ধেয়) জিনউ তরুণ কোরীয়দের ধর্মকর্মে উৎসাহিত করতে ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন। 

আধুনিক জীবনযাপন করে ধর্মপালন করা সম্ভব—এই মূলনীতির প্রচারে নেমেছেন তিনি। ধর্মীয় বার্তাসম্বলিত বিভিন্ন ধরনের আকর্ষণীয় পণ্য, মেডিটেশন অ্যাপ ও ভাইরাল মার্কেটিংয়ের দ্বারস্থ হয়েছে গোত্রটি। 

১৩০ সেন্টিমিটার দীর্ঘ হিউমেনয়েড রোবট গাবিকে দীক্ষা দেওয়াও এসব উদ্যোগেরই অংশ।  

পাঁচ মূলনীতি 

৬ মে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত সন্ন্যাসী ও পূণ্যার্থীদের সামনে দিয়ে হেঁটে যায় গাবি। এরপর সে মন্দিরের দিকে মুখ করে মাথা নত করে প্রার্থনা করে। এসময় তাকে বৌদ্ধ ধর্ম পালনের অত্যাবশ্যক পাঁচ নীতি দেওয়া হয়। 

প্রিসেপ্ট নামে পরিচিত এই নৈতিক আইনের মাধ্যমেই বৌদ্ধ ধর্মের চর্চা হয়। গাবির জন্য বিশেষ করে পাঁচ নীতি তৈরি করা হয়।

এর মধ্যে চারটি হলো অন্য কোনো জীবিত প্রাণির ক্ষতি করা যাবে না, অন্য রোবট বা বস্তুর ক্ষতি করা যাবে না, কোনো ধরনের প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া যাবে না এবং কারো প্রতি অসম্মানজনক আচরণ করা যাবে না। 

পঞ্চম নীতিটি সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। ওই নীতিতে বলা হয়েছে ‘প্রয়োজনের বেশি চার্জ নেওয়া যাবে না’। 

সুংওন বলেন, ‘মানুষ যেমন মদ খেয়ে মাত্রা ছাড়ানো আচরণ করে, রোবটের ক্ষেত্রে বেশি চার্জের বিষয়টা তেমনই।’

‘সবাই হয়তো ভাববে ব্যাটারি টিকিয়ে রাখার জন্য এই নিয়ম বেঁধে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এটার সঙ্গে মানবজাতির মাত্রা ছাড়ানো আচরণের যোগসূত্র আছে’, যোগ করেন তিনি। 

সুংওন বলেন, এই নিয়মগুলো তিনি নিজেই লিখেছেন। পরবর্তীতে চ্যাটজিপিটি ও জেমিনাই দিয়ে পরখ করিয়ে নিয়েছেন। 

‘প্রিসেপ্ট কি জিনিশ, সেটা চ্যাটজিপিটি ভালো করে বুঝতে পারেনি। এগুলো শুধু ভালো কাজের উপদেশ নয়। এগুলোকে বিধিনিষেধ বলা যেতে পারে’, যোগ করেন তিনি। 

সুংওন মনে করেন, এই উৎসবের অর্থ এটা প্রমাণ করা নয়, যে রোবটও সন্ন্যাসী হিসেবে দীক্ষা নিতে পারে। বরং যেসব মানুষ রোবট তৈরি করছে, এটা তাদের জন্য শিক্ষা। তিনি জানান, গাবির পাঁচ মূলনীতির নেপথ্যে আছে রোবটের জন্য নির্ধারণ করা নৈতিকতার মানদণ্ড, যা ইতোমধ্যে বিশ্বজুড়ে অনুস্মরণ করা হচ্ছে। 

‘রোবট নির্মাতারা তেমন রোবটই বানাতে চান, যে তার কথা শুনবে’, যোগ করেন তিনি। 

সুংওন জানান, ‘গাবি অন্য অনেক সমসাময়িক রোবটের তুলনায় দুর্বল। তাকে দুই হাত জোড় করে প্রার্থনা করা শেখাতেই আমাদেরকে অনেক বেগ পেতে হয়েছে।’  

এআই অভিশাপ নয়, আশীর্বাদ  

বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা ও সমস্যা থাকা সত্ত্বেও তিনি আশাবাদী, খুব শিগগির ধর্মীয় কার্যক্রমে প্রযুক্তি অনেক বড় ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। 

তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি না, যে এআই আমাদেরকে ধ্বংস করবে। বরং, উচ্চ বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন এআই আমাদের যত্ন নেবে। যার আইকিউ ১৫০, সেও একটি কুকুর ছানার প্রতি গভীর ভালোবাসা দেখায়। ৩০০, ৪০০ বা ৫০০ আইকিউ থাকলে কি হতে পারে, সেটা অকল্পনীয়। আমরা এআইর কাছ থেকে মায়ের কোলে শিশুর মতো যত্ন পেতে পারি।’ 

Humanoid robot with hands folded at Buddhist ordination ceremony
রোবট সন্ন্যাসী গাবি

আগামী সপ্তাহে গাবি তার তিন ‘যান্ত্রিক’ ভাই-বোন সিওকজা, মোহি ও নিসার সঙ্গে সিউলের পথে নামবে। তারা বার্ষিক লোটাস ল্যানটার্ন প্যারেডে অংশ নেবে। 
গৌতম বুদ্ধের জন্মদিন উপলক্ষে এই উৎসবের আয়োজন হয়। 

সুংওন বলেন, গাবিকে দীক্ষা দেওয়ার বিষয়টি তরুণ কোরীয়দের কাছে বৌদ্ধ ধর্মকে প্রাসঙ্গিক করে তোলার বৃহত্তর কৌশলের অংশ। 

তিনি জানান, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গাবিকে স্বচক্ষে দেখার জন্য হলেও যাতে তরুণ-তরুণীরা মন্দিরে আসে, সেটা নিশ্চিত করা। 

‘তারপর তাদের বয়স আরেকটু বাড়লে তারা জীবন সম্পর্কে ভাবতে শুরু করবে। তখন তারা এমনিতেই উপাসনালয়ে ফিরে আসবে। আমি মানুষকে ধর্মপালনে বাধ্য করতে পারি না’, যোগ করেন তিনি।