বন্যায় টিকে থাকা নেপালের সেই ‘সবুজ বাড়ি’

স্টার অনলাইন ডেস্ক

চারপাশের সবকিছু তখন বন্যার স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। কিন্তু সবুজ রঙের একটি বাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল অক্ষত।

কেউ কেউ এই বাড়ির নাম দিয়েছেন ‘অলৌকিক বাড়ি’। আবার কেউ এটিকে বলছেন ‘ভাইরাল বাড়ি’।

আর গুগল ম্যাপে বাড়িটি চিহ্নিত হয়েছে ‘বন্যা-প্রতিরোধী’ আকর্ষণ হিসেবে।

গত ২৬ আগস্ট ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার স্রোত নেপাল-তিব্বত সীমান্তের প্রায় সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ধ্বংসের সেই স্রোত ঘূর্ণির মতো ঘিরে ফেলে নুয়াকোটের ধুঙ্গে বাজারে ত্রিশূলী নদী তীরের সবুজ রঙের বাড়িটিকে।

প্রায় এক সপ্তাহ পর দেখা যায়, চারপাশে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে একা দাঁড়িয়ে আছে সবুজ বাড়িটি।

সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে বাড়িটির টিকে যাওয়া এখন বিরল এক বেঁচে থাকার গল্প হয়ে উঠেছে।

বন্যার পানি কমে আসার পর অনেকেই ভিড় করেছেন সবুজ বাড়িটি দেখতে। বিস্ময় নিয়ে সেলফি তুলছেন কেউ কেউ।

বাড়িটির মালিক ৬৭ বছর বয়সী ছত্র বাহাদুর পিয়াকুরেল।

সেই দিনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে তিনি নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ‘প্রথমে আমরা বুঝতে পারছিলাম না কী ঘটতে যাচ্ছে। বেঁচে থাকব—এমনটা মনে হয়নি। কিছুক্ষণ পর বুঝলাম, আসলে আর কিছুই করার নেই।’

পিয়াকুরেল জানান, এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চারপাশের ধ্বংসযজ্ঞ দেখেছেন তারা। প্রথমে বারান্দা থেকে, পরে পানির স্রোত আরও উঁচু ও ভয়ংকর হয়ে উঠলে বাড়ির ছাদে উঠে পরিস্থিতি দেখেন।

পরে পানি কিছুটা কমলে প্রতিবেশীরা তাদের উদ্ধার করতে আসেন। ধাতব পাইপ ব্যবহার করে অস্থায়ী সিঁড়ি বানিয়ে তাদের ওই বাড়ি থেকে বের করা হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই দিনের ভিডিওতে দেখা যায়, সবুজ বাড়ির তৃতীয় তলার বারান্দা থেকে অসহায়ভাবে নিচের দিকে তাকিয়ে আছেন পরিবারের সদস্যরা। বাড়ির দেয়ালে আছড়ে পড়ছে উত্তাল পানির ঢেউ।

 

পানির রং ঘোলা হলেও ত্রিশূলী নদী এখন অনেকটাই শান্ত। সবুজ বাড়িটির প্রথম দুই তলার বেশিরভাগ অংশই ধ্বংস হয়ে গেছে, শুধু স্তম্ভগুলো দাঁড়িয়ে আছে। তৃতীয় তলায় পড়ে আছে কাদামাখা সব জিনিসপত্র। তবে বাড়ির ছাদটি প্রায় অক্ষত। সেখানে রয়েছে—পানির ট্যাংক, সৌর বিদ্যুতে চলে এমন পানির হিটার এবং ছোট একটি মন্দির।

বাড়িটি দেখতে আসা ৪৫ বছর বয়সী বিষ্ণু মণি রিমাল বলেন, ‘এমন পরিস্থিতিতে মানুষ বেঁচে থাকবে এটা কে বিশ্বাস করবে? আমি ভেবেছিলাম, তারা কেউ আর বেঁচে নেই।’

পিয়াকুরেল জানান, ১৯৯৫ সালে বাড়িটি নির্মাণ করেন তারা। এরপর ধীরে ধীরে আরও তলা নির্মাণ করা হয়। নিচতলায় মুদি দোকান চালাতেন তিনি।

বাড়িটি কেন টিকে গেল, তার একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন পিয়াকুরেল। তিনি বলেন, ‘বাড়িটির স্তম্ভগুলো পাথরের অনেক গভীরে গেঁথে দেওয়া হয়েছিল।’

ছবি: রয়টার্স

তবে নানা মতও শোনা যাচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, বাড়িটির সামনে নদীর স্রোতের পথে বেরিয়ে থাকা একটি উঁচু ভূমির কারণে স্রোত সরাসরি বাড়িটিকে আঘাত করতে পারেনি।

বাড়িটির ভেতরে অনেক কিছুই নষ্ট হয়ে গেছে। নাগরিকত্বের সনদ, পাসপোর্ট ও জমির নিবন্ধনের কাগজপত্রসহ গুরুত্বপূর্ণ নথি হারিয়েছেন পিয়াকুরেল পরিবার।

তবে এই বৃদ্ধের মতে, সবচেয়ে বড় স্বস্তি ছিল বন্যার পরের দিনই পরিবারের সবাই আবার একসঙ্গে হতে পেরেছিলেন।

নেপালে ভয়াবহ এই দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র প্রতিদিনই আরও স্পষ্ট হচ্ছে।

নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, বুধবার পর্যন্ত নেপালে মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ২০০ ছাড়িয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও প্রায় ৪ হাজার মানুষ।

শুধু নুয়াকোট জেলাতেই ১ হাজার ২০০টির বেশি বাড়ি পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। আরও ১ হাজারের বেশি বাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।