ফ্লাইদুবাইয়ের উড়োজাহাজে কো-পাইলটের হামলা নিয়ে ৫ প্রশ্ন
ইসরায়েলগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি ফ্লাইটে কো-পাইলটের হামলার ঘটনায় উড়োজাহাজের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন উঠেছে।
গত বুধবার দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর ফ্লাইট এফজেড১০৭৩ হঠাৎ দ্রুত নিচে নামতে শুরু করে। পরে সৌদি আরবে জরুরি অবতরণ করে বিমানটি।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কো-পাইলট হামাম আল-হাম্মামি ককপিটে ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারের ওপর হামলা করেন। হামলার একপর্যায়ে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যাপ্টেন ককপিটের দরজা খুলতে সক্ষম হন। এরপর কয়েকজন যাত্রী কো-পাইলটকে নিয়ন্ত্রণে নেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রসিকিউটর জেনারেল বলেছেন, ককপিটের ক্র্যাশ অ্যাক্স দিয়ে হামলাটি চালানো হয়েছিল।
ঘটনার উদ্দেশ্য কী ছিল, তা জানতে তদন্ত চলছে। এর মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও উড়োজাহাজ চলাচল নিয়ে আগ্রহীদের মধ্যে অন্তত পাঁচটি প্রশ্ন উঠেছে বলে প্রতিবেদনে জানিয়েছে আল জাজিরা।
নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও আল-হাম্মামি কীভাবে ফ্লাইদুবাইয়ে কো-পাইলট হলেন?
আল-হাম্মামি ওমানের নাগরিক বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। শুক্রবার দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, তার মতাদর্শগত অবস্থান নিয়ে উদ্বেগের কারণে ওমানের কর্তৃপক্ষ এর আগে তাকে দেশটিতে উড়োজাহাজ চালানোর অনুমতি দেয়নি।
শনিবার সিএনএনও এক আঞ্চলিক কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানায়, একই ধরনের উদ্বেগের কারণে তাকে ফ্লাইট প্রশিক্ষণ থেকেও সরিয়ে অন্য দায়িত্বে দেওয়া হয়েছিল। আরও দুই সূত্রের বরাতে সিএনএন জানায়, গত বছর ওমানের জাতীয় উড়োজাহাজ সংস্থার একটি চাকরিও তার মতাদর্শ নিয়ে উদ্বেগের কারণে বাতিল করা হয়।
তাহলে এসব নিরাপত্তা উদ্বেগের পরও কীভাবে তিনি ফ্লাইদুবাইয়ের এই ফ্লাইটে কো-পাইলট হিসেবে দায়িত্ব পেলেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
একজন কলমিস্ত্রি কীভাবে আকাশে থাকা বিমান সামলালেন?
হামলার সময় ক্যাপ্টেন মাচ্ছার ককপিটের দরজা খুলতে সক্ষম হলে যাত্রীরা কো-পাইলটকে কাবু করেন। তাদের একজন ছিলেন ইয়ানিভ হায়ুন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাকে একজন প্লাম্বার (কলমিস্ত্রি) হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
নেতানিয়াহুর সঙ্গে এক ভিডিওতে হায়ুন বলেন, অন্য একজন পাইলট নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আগ পর্যন্ত কীভাবে বিমানটি সামলাতে হবে, সে সম্পর্কে তার ধারণা ছিল। কারণ, তিনি ‘এয়ার ক্র্যাশ ইনভেস্টিগেশন’ নামে একটি অনুষ্ঠান নিয়মিত দেখেন।
হায়ুন বলেন, ওই অনুষ্ঠানে বিমান নিয়ন্ত্রণের যে কৌশল দেখেছিলেন, সেটিই তিনি অনুসরণ করেন। তিনি বিমানের নিয়ন্ত্রণ ধরে সেটিকে টেনে ওপরে তোলার চেষ্টা করেছিলেন।
এ ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছে, একজন প্লাম্বার কীভাবে মাঝআকাশে একটি যাত্রীবাহী বিমানের নিয়ন্ত্রণ সামলাতে পারলেন।
৫ হাজার ১৮০ মিটার নিচে নেমেও কীভাবে বড় ধরনের আহতের খবর নেই?
ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, উড্ডয়নের প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর বিমানটি দুই মিনিটেরও কম সময়ে প্রায় ৫ হাজার ১৮০ মিটার বা ১৭ হাজার ফুট নিচে নেমে যায়।
এতে যাত্রীদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক তৈরি হলেও প্রকাশ্যে আসা তথ্য অনুযায়ী, ঘটনায় কেউ আহত হননি।
তবে একজন ফ্লাইট প্রশিক্ষক সিমুলেটরে ফ্লাইদুবাইয়ের বিমানটি যেভাবে নিচের দিকে নেমে যাচ্ছিল, সেই পরিস্থিতি আবার তৈরি করে পরীক্ষা করেন। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, এভাবে বিমান নিচে নেমে গেলে সেটি তার সর্বোচ্চ কাঠামোগত গতিসীমা অতিক্রম করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, বিমানটিকে আবার ওপরে তোলার সময় ভেতরে ঋণাত্মক জি-ফোর্স তৈরি হতে পারে। এর ফলে বিমানের ভেতরে অনিরাপদভাবে রাখা জিনিসপত্র ছিটকে পড়ার কথা।
ওমানের নাগরিক কো-পাইলট ইসরায়েলগামী ফ্লাইটে কীভাবে উঠলেন?
ইসরায়েল ও ওমানের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। নেতানিয়াহু বলেছেন, কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই এমন দেশের নাগরিক পাইলটদের ইসরায়েলগামী ফ্লাইটে কাজ করার বিষয়ে বিদেশি বিমান সংস্থাগুলোর সঙ্গে দীর্ঘদিনের ব্যবস্থা রয়েছে।
শনিবার ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ জানায়, ফ্লাইটটির ক্রু ও যাত্রীদের তালিকা আগে থেকেই সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে ছিল। ওই তালিকায় ওমানের নাগরিক আল-হাম্মামির নামও ছিল।
হারেৎজের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদেশি ফ্লাইটের ক্রুদের পর্যবেক্ষণ ও যাচাই করার দায়িত্বে থাকা ইসরায়েলি সংস্থাগুলোর মধ্যে দেশটির পরিবহন ও সড়ক নিরাপত্তা বিভাগ এবং গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদও রয়েছে।
নেতানিয়াহু বলেছেন, কোনো একটি ‘ফাঁক’ ব্যবহার করেই ওমানের এই পাইলট ফ্লাইটটিতে যুক্ত হতে পেরেছিলেন বলে মনে হচ্ছে। এখন ইসরায়েল তার নিরাপত্তা যাচাই আরও জোরদার করবে।
হামলার আগে কো-পাইলটের নামাজ পড়ার বিষয়টি কেন প্রশ্ন তুলেছে?
দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলার সময় ক্যাপ্টেন মাচ্ছার জানান, হামলার আগে আল-হাম্মামি নামাজ পড়ার কথা বলেছিলেন। এর চার-পাঁচ মিনিট পরই পেছন থেকে তার মাথায় ‘বড় আঘাত’ করা হয়।
ফ্লাইটটি বুধবার সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৫ মিনিটে উড্ডয়ন করে এবং হামলাটি ঘটে প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর। ওই দিন আমিরাতে ভোরের নামাজের সময় ছিল সকাল ৪টা ৫১ মিনিট।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, আল-হাম্মামি যে অন্য কোনো ব্যক্তিগত প্রার্থনা করছিলেন, সেই সম্ভাবনাও উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে তার নামাজ পড়ার দাবি থেকেই হামলার উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
এদিকে আল-হাম্মামির সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার সম্পর্ক নিয়েও তদন্ত চলছে। অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া জয়েন্ট কাউন্টার টেরোরিজম টিম বিষয়টি তদন্ত করছে বলে দেশটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
রয়টার্সের বরাতে আল জাজিরা জানায়, আল-হাম্মামি মেলবোর্নের আরএমআইটি ইউনিভার্সিটিতে প্রায় এক দশক আগে পড়াশোনা করেছিলেন বলে জানিয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।
আল জাজিরার আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত এখনো হামলার উদ্দেশ্য প্রকাশ করেনি বা আল-হাম্মামি একাই কাজ করেছিলেন কি না, তা জানায়নি। তবে আমিরাতের প্রসিকিউটর জেনারেল হামাদ সাইফ আল-শামসি ঘটনাটিকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের চেষ্টা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
