মালগুড়ি ডেজ: কল্পনার শহরের সেই বাঁশির সুর এখনো কানে বাজে

নাদিয়া রহমান
নাদিয়া রহমান

শৈশবের কিছু বিকেল কখনো পুরোনো হয় না। টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে ওঠা ছোট্ট এক শহর, বাঁশির সুর, আর একের পর এক সাধারণ মানুষের নিত্যদিনকার জীবনের গল্প—এই তিনটি জিনিস আজও আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় ‘মালগুড়ি ডেজ’র কাছে। কী এই মালগুড়ি ডেজ?

২০০২ সালের কথা। মালগুড়ি ডেজ একটি সিরিজ, যা তখন আমরা সনি টিভির পর্দায় দেখতাম। আজকের দিনের যে সিরিজগুলো আমরা নেটফ্লিক্সে দেখি, তখন বিভিন্ন সিরিজ আমরা দেখতাম এই চ্যানেলগুলোয়। মালগুড়ি একটি শহরের নাম। এটি আসলে কোনো বাস্তব শহর নয়। লেখক আর কে নারায়ণের কল্পনায় তৈরি এক জনপদ। ১৯৩০-এর দশক থেকে শুরু করে তার অসংখ্য উপন্যাস ও ছোটগল্পের পটভূমি এই ছোট্ট শহর। অথচ সেই কল্পনার শহরই এত বাস্তব যে মনে হয়, আমাদের পাশের কোনো মফস্বল শহরেই হয়তো বাস করে সোয়ামী, রাজাম, মণি, কিংবা সেই ডাকপিয়ন, জ্যোতিষী, শিক্ষকসহ নানা চরিত্রেরা।

আর কে নারায়ণ ছিলেন ভারতের ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক। তিনি এমন এক সময়ে লিখেছেন, যখন ভারত ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে। কিন্তু তার লেখায় রাজনৈতিক স্লোগান বা উচ্চকণ্ঠ প্রতিবাদের চেয়ে বেশি জায়গা পেয়েছে সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের জীবন। খুব সহজ ভাষায় জীবনকে তুলে ধরা, সূক্ষ্ম রসবোধ আর মানবিকতা ছিল তার লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য। আর কে নারায়ণ দেখিয়েছেন, বড় গল্প বলতে সব সময় বড় ঘটনার প্রয়োজন নেই। সাধারণ মানুষের জীবন নিয়েও সাহিত্য হয়ে উঠতে পারে।

‘মালগুড়ি ডেজ’ মূলত তার ছোটগল্প সংকলন। পরে এই গল্পগুলো নিয়ে নির্মিত হয় একই নামের টেলিভিশন ধারাবাহিক, যা পরিচালনা করেন শংকর নাগ। আশির দশকের শেষভাগে সম্প্রচারিত সেই সিরিজ ভারতীয় টেলিভিশনের ইতিহাসে এক মাইলফলক হয়ে আছে। আজও ইউটিউবে বা বিভিন্ন মাধ্যমে সেই পর্বগুলো দেখলে মনে হয়, সময় যেন থেমে গেছে।

গল্পগুলোর পটভূমি ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ভারতের সময়। কিন্তু সেখানে ঔপনিবেশিক শাসনকে বড় রাজনৈতিক ভাষ্যে নয়, বরং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ভেতর দিয়ে দেখা যায়। স্কুলের নিয়ম, প্রশাসনিক কাঠামো, সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস কিংবা ইংরেজি শিক্ষার প্রভাব।

আসলে, ইতিহাস এখানে পাঠ্যবইয়ের মতো তথ্য হয়ে ওঠেনি, বরঞ্চ মানুষের জীবনযাপনের অংশ হয়ে উঠেছে। ফলে আমরা বুঝতে পারি, ঔপনিবেশিক শাসন শুধু রাজনীতি নয়, মানুষের চিন্তা, শিক্ষা ও সম্পর্কের ওপরও কত গভীর ছাপ ফেলছিল সেই সময়টায়।

‘মালগুড়ি ডেজ’র চরিত্রগুলো

এই ধারাবাহিকের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এর চরিত্রগুলো। সোয়ামীনাথন বা শুধু সোয়ামী ছিল দুষ্টু, কৌতূহলী এক কিশোর। সে কখনো ভীত, কখনো সাহসী। স্কুলে যেতে তার অনীহা, বন্ধুদের সঙ্গে ছোটখাটো ঝগড়া, পরীক্ষার ভয়, আর বাবার বকুনি! এই চরিত্রটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ফটিক’ চরিত্রটির মতোন। যদিও সোয়ামীকে তার নিজ ঘর ছেড়ে যেতে হয়নি, যেমনটা ফটিকের সঙ্গে হয়েছিল। সোয়ামীর স্কুলে ছিল তার সমবয়সী বন্ধুরা। বন্ধু রাজামের আত্মবিশ্বাস, মণির সরলতা কিংবা স্কুলের কঠোর শিক্ষক, সবাই যেন আমাদের চেনা মানুষ। আবার ‘দ্য অ্যাস্ট্রোলজার’, ‘দ্য পোস্টম্যান’, ‘নাগ’ কিংবা ‘টকেটিভ ম্যান’-এর মতো চরিত্রগুলোও মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি মানুষের জীবনের আড়ালে লুকিয়ে থাকে একটি করে গল্প।

এই চরিত্রগুলো নির্মাণে লেখকের একটি বিষয় প্রতীয়মান হয়। তিনি দেখাতে চেয়েছেন, কোনো চরিত্রই পুরোপুরি নায়ক নয়, আবার পুরোপুরি খলনায়কও নয়। তাদের সুখ আছে, ব্যর্থতা আছে। এছাড়াও আছে ভুল এবং মানবমনের অনুশোচনা। একজন ডাকপিয়ন, একজন জ্যোতিষী কিংবা একজন ভিখিরি! এই মানবিক অসম্পূর্ণতাই তাদের এত জীবন্ত করে তুলেছে। তাই হয়তো এত বছর পরেও এই চরিত্রগুলো আমার মনে দাগ কেটে রেখেছে।

‘মালগুড়ি ডেজ’র সেই বাঁশির সুর

তবে শুধু গল্প বা অভিনয় নয়, ‘মালগুড়ি ডেজ’-এর শুরুর সেই বাঁশির সুরটি ছিল এক অন্যরকম অনুভূতি। সিরিজের শুরুর সেই বিখ্যাত বাঁশির সুর আজও অনেকের মনে নস্টালজিয়া জাগায়। কোনো জাঁকজমকপূর্ণ অর্কেস্ট্রা নয়, বরং সহজ-সরল সুরই যেন আমাদের আমন্ত্রণ জানাত মালগুড়ির অলিগলিতে। সেই সুর শুনলেই মনে হতো, পড়ার টেবিল ছেড়ে আবার ফিরে গেছি ছেলেবেলার বিকেলে। কিংবা কোনো রেলস্টেশনে ফেলে আসা পুরোনো দিনগুলো, যেখানে কত পথিক হেঁটে যায় যার যার নিজস্ব গন্তব্যে।

ধারাবাহিকটির দৃশ্যায়নও ছিল উল্লেখযোগ্য। গ্রামীণ ও ছোট শহরের পরিবেশ, লাল মাটির রাস্তা, পুরোনো স্কুলঘর, রেলস্টেশন, সব মিলিয়ে প্রতিটি ফ্রেমে ছিল এক ধরনের শান্ত সৌন্দর্য।

আজকের দিনে যখন অধিকাংশ বিনোদন দ্রুতগতির, তখন মালগুড়ি ডেজ আমাদের শেখায়, মানুষের জীবনের ছোট ছোট ঘটনাও অসাধারণ গল্প হয়ে উঠতে পারে। এই সিরিজটা বর্তমানে ইউটিউবে রয়েছে। এখনো কোনো এক গ্রীষ্মের দুপুরে ইউটিউবে বাজিয়ে দিই, ‘মালগুড়ি ডেজ’র সেই বাঁশির সুরটি!