মঞ্চনাটক

দশজন গেল দ্বীপে, ফিরল কত জন?

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
মাহমুদ নেওয়াজ জয়

দশজন সৈনিক গেল খেতে। একজন দম বন্ধ হয়ে মারা গেল, রইল নয়জন। তারপর নয় থেকে আট, আট থেকে সাত। এভাবে কমতে কমতে শেষ পর্যন্ত কেউই রইল না।

শিশুদের পরিচিত এই গণনার ছড়াটিই ধার করেছিলেন আগাথা ক্রিস্টি। আর সেই ছড়াকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে তার বিখ্যাত রহস্য উপন্যাস ‘অ্যান্ড দেন দেয়ার ওয়্যার নান’।

ডেভনের উপকূলের কাছে সোলজার আইল্যান্ড। বিচ্ছিন্ন এক দ্বীপ। সেখানে এসে হাজির হন দশজন অপরিচিত মানুষ। প্রত্যেকেই আলাদা চিঠি বা টেলিগ্রাম পেয়ে এসেছেন। কিন্তু যিনি তাদের ডেকেছেন, সেই ইউ এন ওয়েনেরই দেখা নেই।

রাতের খাবারের পর হঠাৎ একটি রেকর্ডিং বাজতে শুরু করে। একে একে উচ্চারিত হয় দশজনের নাম। সঙ্গে উঠে আসে তাদের অতীতের এমন কিছু অপরাধের কথা, যার বিচার কখনো আইনের আদালতে হয়নি।

তারপর শুরু হয় অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার পালা।

ছড়ার হিসাব মেনে একজন একজন করে কমতে থাকেন তারা। দ্বীপ থেকে বের হওয়ার কোনো পথ নেই। যে নৌকাটি তাদের নিতে আসার কথা, সেটিও আর ফেরে না। আর সবচেয়ে অস্বস্তিকর সত্যটি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকে, খুনি বাইরের কেউ নয়। এই দশজনেরই একজন। প্রতিরাতে সে অন্যদের সঙ্গে একই টেবিলে বসে খায়, তাদের মতোই ভয় পাওয়ার ভান করে, আর অপেক্ষা করে পরের শিকারের।

সোমবার বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে আগাথা ক্রিস্টির ‘অ্যান্ড দেন দেয়ার ওয়্যার নান’ মঞ্চে এনেছে ওপেন স্পেস থিয়েটার। হল প্রায় পূর্ণ। আলো নিভতেই দর্শকদের ফিসফাসও থেমে গেল।

মঞ্চসজ্জা ইচ্ছাকৃতভাবেই ফাঁকা রাখা হয়েছিল। একটি সোফা, দুয়েকটি চেয়ার, আর আলো-ছায়ার খেলা। আড়াল করার মতো খুব বেশি কিছু নেই। ফলে রহস্য তৈরির ভারটা অভিনয়, সংলাপ আর সময়ের ব্যবহারের ওপর গিয়ে পড়ে।

দর্শক শুরু থেকেই জানেন, সংখ্যাটা কমবে। কিন্তু পরের জন কে, সেটাই জানা নেই।

এই অনিশ্চয়তাকে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে ধরে রাখাই এমন নাটকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একটি দৃশ্য একটু বেশি টেনে গেলেই উত্তেজনার সুতো ছিঁড়ে যেতে পারে। ওপেন স্পেস থিয়েটারের প্রযোজনাটি সেই ঝুঁকি বেশ ভালোভাবেই সামলেছে।

স্যার লরেন্স ওয়ারগ্রেভের চরিত্রে এম আরিফুর রহমান কথা বলার চেয়ে যেন বেশি শোনেন, বেশি দেখেন। কোলে হাত ভাঁজ করে রাখা, চোখ স্থির করে তাকিয়ে থাকা, তার শরীরী ভাষাতেই বিচারকের দীর্ঘদিনের অভ্যাসের ছাপ। এই সংযমই চরিত্রটিকে অন্যদের থেকে খানিকটা দূরে রাখে, আবার তাকে ঘিরে কৌতূহলও তৈরি করে।

ভেরা ক্লেথর্নের চরিত্রে সুহালা নওশিন অন্তরা শুরুতে নিয়ন্ত্রিত, আবেগ চেপে রাখা এক গভর্নেস। কিন্তু নাটক যত এগোয়, সেই নিয়ন্ত্রণ একটু একটু করে আলগা হতে থাকে। কণ্ঠ ভাঙে, চলাফেরায় তাড়াহুড়া আসে। শেষদিকে তাকে দেখে মনে হয়, চোখের সামনে একজন মানুষ সত্যিই ভেঙে পড়ছেন।

জেনারেল ম্যাকেঞ্জির চরিত্রটি একটু ভিন্নরকমভাবে কঠিন। তিনি কখন বর্তমানে আছেন, কখন অতীতে ফিরে যাচ্ছেন, সেটি যেন নিজেও ঠিক জানেন না। তানজিল শাহরিয়ার এই দোলাচলটি ভালোভাবে ধরেছেন। কখনো মনে হয় পুরোনো সৈনিকটি চারপাশের সবই বুঝছেন, আবার পরমুহূর্তেই মৃত স্ত্রীর নাম বিড়বিড় করেন। দূরের কোনো বিন্দুতে স্থির হয়ে থাকা তার চোখ এই দ্বিধাকে আরও দৃশ্যমান করে।

রজার্সের চরিত্রে এ এস এম মোসাব্বির তানিমকে একইসঙ্গে দুটি অবস্থান সামলাতে হয়েছে। বাইরে থেকে তিনি ভদ্র ও দায়িত্বশীল এক পরিচারক। ভেতরে তিনি এমন একটি বাড়ি সামলাচ্ছেন, যার মালিক কার্যত অনুপস্থিত। পরিস্থিতি বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই ভদ্রতার ফাঁক দিয়ে ভয় বেরিয়ে আসতে থাকে। হাতে ট্রে নিয়ে তার পায়ের চলনও ধীরে ধীরে অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে।

অ্যান্থনি মার্সটনের চরিত্রে হায়ন সাহা মঞ্চে খুব বেশি সময় পান নি। চরিত্রটির মৃত্যু হয় শুরুর দিকেই। কিন্তু দায়িত্বজ্ঞানহীন, বেপরোয়া এক তরুণের উপস্থিতি তিনি অল্প সময়েই ফুটিয়ে তোলেন। তার মৃত্যুই প্রথম জানিয়ে দেয়, এই দ্বীপে তারুণ্য কিংবা অর্থ, কোনো কিছুই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নয়।

ফিলিপ লম্বার্ডের চরিত্রে তাহমিদ সুপ্রভের অভিনয়ে আছে নিজের অতীত নিয়ে প্রায় নির্লজ্জ সততা। নিজেকে ভালো মানুষ প্রমাণের তেমন কোনো চেষ্টাই নেই। আর এই চেষ্টা না করাটাই অদ্ভুতভাবে তাকে কিছুটা বেশি বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।

উইলিয়াম ব্লোরের চরিত্রে রাফায়াতুল্লাহ সোহানের চোখে সারাক্ষণ পুলিশের সন্দেহ। ভ্রু কুঁচকে থাকে এমনভাবে, যেন সামনে থাকা প্রত্যেক মানুষকেই তিনি মনে মনে জেরা করছেন।

এমিলি ব্রেন্টের চরিত্রে আয়নুন নিশাত প্রেরণার কঠোরতা প্রথমে নৈতিক দৃঢ়তা বলে মনে হয়। কিন্তু নাটক এগোতে থাকলে সেই কঠোরতার অন্য দিকটিও দেখা যায়। তখন বোঝা যায়, নীতির প্রতি তার অনড় অবস্থান একই সঙ্গে একধরনের অন্ধত্বও।

ডা. আর্মস্ট্রংয়ের চরিত্রে ফয়সাল আলম সানি ছোট ছোট মুহূর্তে চরিত্রটিকে তৈরি করেছেন। রোগীকে স্পর্শ করার আগে সামান্য থেমে যাওয়া কিংবা প্রয়োজনের চেয়ে একটু বেশি সময় কারও দিকে তাকিয়ে থাকা, এমন কিছু সূক্ষ্ম আচরণ চরিত্রটির চারপাশে প্রশ্ন তৈরি করে।

মিসেস রজার্সের চরিত্রে মাহেলেকা জাবিন মঞ্চে সময় পেয়েছেন কম। কিন্তু প্রথম মৃত্যুর আগেই তার মুখে জমে থাকা ভয় দর্শকের মধ্যে অস্বস্তির বীজ বুনে দেয়।

ফ্রেড নারাকটের চরিত্রে শাদমান চৌধুরীর উপস্থিতিও সংক্ষিপ্ত। শুরুতে নৌকায় করে অতিথিদের দ্বীপে পৌঁছে দিয়ে চলে যান তিনি। ছোট চরিত্র হলেও তার উপস্থিতিই এই বিচ্ছিন্ন দ্বীপে প্রথম পৌঁছানোর দৃশ্যটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।

মঞ্চের সামনের এই মানুষগুলোর পাশাপাশি নেপথ্যেও বেশ কিছু কাজ আলাদা করে নজরে পড়ে।

নাটকটির অনুবাদ করেছেন এম আরিফুর রহমান। অনুবাদের ভাষায় বিদেশি বা কৃত্রিম ভাব নেই। আবার মূল ইংরেজি সংলাপের টানটান, খানিকটা রুক্ষ স্বরটিও হারিয়ে যায়নি। আবহসংগীতেও কাজ করেছেন তিনি।সংগীত কখনো আলাদা করে নিজের উপস্থিতি জানান দেয় না, বরং দৃশ্যের নিচ দিয়ে নীরবে চাপ বাড়াতে থাকে।

প্রযোজনা ব্যবস্থাপনায় ছিলেন মাহজাবিন চৌধুরী। পোশাক বদল, প্রপসের ব্যবহার কিংবা দৃশ্যের সময়, সবকিছুর সমন্বয় এমনভাবে হয়েছে যে দর্শকের চোখে ব্যবস্থাপনার ব্যস্ততা ধরা পড়ে না। আর মঞ্চে যখন নেপথ্যের মঞ্চে যখন নেপথ্যের কাজ চোখে পড়ে না, তখন সেটিই সম্ভবত তার সবচেয়ে বড় সাফল্য। পুরো ব্যবস্থাপনাই ছিল নিখুঁত।

আলোক প্রক্ষেপণে রাহাত আহমেদের কাজ বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। বিশেষ করে যেসব মুহূর্তে মঞ্চের বাকি অংশ প্রায় অন্ধকারে মিলিয়ে গিয়ে শুধু একটি চরিত্রকে আলাদা করে সামনে আনার প্রয়োজন হয়েছে, সেখানে আলোর ব্যবহার দৃশ্যের চাপ বাড়িয়েছে।

দুই ঘণ্টা কখন পেরিয়ে যায়, টের পাওয়া যায় না।

শেষ পর্যন্ত সেই গুনতির ছড়ায় সংখ্যাটা কোথায় গিয়ে থামে, সেটি এখানে বলে দেওয়ার জায়গা নয়। কারণ এই নাটকের রোমাঞ্চই হলো, দর্শক জানেন মানুষ কমছে, কিন্তু শেষ হিসাবটা জানেন না।

হল থেকে বের হওয়ার সময় তাই মাথায় থেকে যায় না শুধু একটি সংখ্যা। থেকে যায় ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া এক অস্বস্তি, যা পর্দা নামার পরও মিলিয়ে যায় না।

হাততালির শব্দের নিচেও সেটি যেন কিছুক্ষণ বাজতে থাকে।