পাহাড়ি খাবার ‘তোজা’ খেয়েছেন কখনো?
কক্সবাজার মানেই অনেকের কাছে সমুদ্র, ঝিনুক আর সি-ফুডের বাহার। কিন্তু শহরের ভেতরে, বৌদ্ধ বিহারের পথে এক কোণে লুকিয়ে আছে পাহাড়, মাটি, আর মানুষের ভিন্ন এক স্বাদ। সেই জায়গার নাম ‘ব্যাম্বু হাব’। নামের মতোই সরল, কিন্তু অভিজ্ঞতায় গভীর।
সেদিন সেখানে বসে ছিলাম এক প্লেট সেদ্ধ সবজি আর লাল মরিচের চাটনি নিয়ে। দেখতে খুব সাধারণ, তেল-মসলা নেই, বাহারি সাজ নেই। কিন্তু মুখে নিতেই বোঝা যায়, এই রান্নার শক্তি তার সরলতায়।
বিভিন্ন পাহাড়ি সবজি একসঙ্গে সেদ্ধ করে পরিবেশন করা হয়, পাশে থাকে লাল মরিচের ঝাঁজওয়ালা চাটনি।
পাহাড়ে এই খাবারকে ‘তোজা’ বলে। চাকমা, মারমা, রাখাইন—সব পাহাড়ি জনগোষ্ঠীতেই এই খাবারের প্রচলন আছে, যার ঘ্রাণে জিভে জল আসে। সেই ঝাঁজে যেন পাহাড়ি বাতাসের ছোঁয়া, আর প্রতিটা লোকমায় ঘরের রান্নার উষ্ণতা।
এই অভিজ্ঞতাকে আরও আলাদা করে তুলেছিলেন ব্যাম্বু হাবের রবিন দা। অতিথি হিসেবে নয়, বরং আপনজনের মতো করে আমাদের গ্রহণ করেছিলেন তিনি। গল্প করতে করতে জানালেন পাহাড়ি রান্না ও তাদের সংস্কৃতির কথা।
পাহাড়ি সেদ্ধ সবজি শুধু একটা খাবার নয়; এটা এক ধরনের জীবনদর্শন। কম উপকরণে, কম প্রক্রিয়ায়, প্রকৃতির স্বাদটাকে ধরে রাখার চেষ্টা। এখানে ঝাল আছে, কিন্তু তা জ্বালাপোড়া নয়, বরং ধীরে ছড়িয়ে পড়া স্বাদের ছোঁয়া।
শহুরে মসলার জাঁকজমক থেকে দূরে, এই স্বাদ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, খাবার আসলে কতটা সহজ হতে পারে।
কক্সবাজারের ব্যাম্বু হাবের সেই সেদ্ধ সবজির প্লেটটা আসলে শুধু স্বাদের গল্প নয়, শরীর আর জীবনের এক সহজ দর্শনের প্রতিফলন।
তেল-মসলাহীন এই রান্না প্রথম দেখায় যতটা সাধারণ মনে হয়, ভেতরে ততটাই শক্তিশালী।
বিভিন্ন পাহাড়ি শাকসবজি একসঙ্গে সেদ্ধ করে পরিবেশন করা হয়, আর পাশে থাকে ঝাঁজওয়ালা লাল মরিচের চাটনি। এই সরল কম্বিনেশনটাই তৈরি করে এক অনন্য ভারসাম্য।
খাবারটা মুখে দিলেই বোঝা যায়, এখানে কোনো কৃত্রিমতা নেই; প্রতিটা উপাদান নিজের মতো করে কথা বলে।
শরীরের জন্য এই সেদ্ধ সবজি বেশ উপকারী। তেল প্রায় না থাকায় এটি লো-ফ্যাট, ফলে অপ্রয়োজনীয় ক্যালরি জমে না। সেদ্ধ করার কারণে সবজির ভিটামিন ও মিনারেল অনেকটাই অক্ষত থাকে, যা শরীরকে ভেতর থেকে পুষ্টি জোগায়। একইসঙ্গে এটি খুব সহজপাচ্য, যাদের গ্যাস্ট্রিক বা হজমের সমস্যা আছে, তাদের জন্য এমন খাবার বেশ আরামদায়ক।
বিভিন্ন সবজি থাকার কারণে এতে প্রচুর ফাইবারও থাকে, যা হজম ভালো রাখে এবং শরীরকে হালকা অনুভব করায়। আর লাল মরিচের চাটনিতে থাকা ঝাঁজ শুধু স্বাদই বাড়ায় না, বরং মেটাবোলিজম বাড়াতেও সাহায্য করে।
রান্নার প্রক্রিয়াটাও ঠিক ততটাই সহজ। বড় বড় টুকরো করে কাটা সবজি হালকা লবণ দিয়ে পানিতে সেদ্ধ করা হয়, কখনো সামান্য আদা বা রসুন যোগ করা হয়। কোনো বাড়তি মসলা নেই, কোনো জটিলতা নেই। সেদ্ধ হয়ে গেলে পানি ঝরিয়ে গরম গরম পরিবেশন করা হয়। আর চাটনিটা তৈরি হয় শুকনা বা কাঁচা লাল মরিচ, লবণ আর কখনো রসুন দিয়ে, পাথরে বাটা সেই চাটনির গন্ধই খাবারটাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
ঢাকায় এই স্বাদের পুরোপুরি প্রতিরূপ পাওয়া কঠিন হলেও কিছু জায়গায় কাছাকাছি অভিজ্ঞতা মেলে।
মিরপুর বা মোহাম্মদপুরের কিছু ছোট পাহাড়ি খাবারের দোকানে মাঝে মাঝে এমন সেদ্ধ সবজি পাওয়া যায়।


