কম তেলে রান্না করতে পারেন এই ৫ খাবার

শবনম জাবীন চৌধুরী

রান্নায় অতিরিক্ত তেল ব্যবহার ওজন বৃদ্ধিসহ নানা শারীরিক জটিলতার কারণ হতে পারে। আমাদের বর্তমান জীবনযাত্রায় স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়েছে। অল্প তেলে খাবার রান্না করলে তা আমাদের কম ক্যালরি গ্রহণ নিশ্চিত করে, হৃৎপিণ্ড ভালো রাখতে সাহায্য করে, রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে, হজমশক্তি উন্নত করে এবং খাবারের পুষ্টিগুণ বজায় রাখতে সাহায্য করে। রান্নায় অল্প তেলের ব্যবহার স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

আজকের এই লেখায় তুলে ধরা হলো এমন কিছু খাদ্যের রেসিপি, যেগুলো অল্প তেলেই রান্না করা হয়। শুধু তাই নয়, তেল ছাড়াও কিছু কিছু রান্না যে মজাদার হতে পারে, তা হয়তো আমরা অনেকেই জানি না। তাই আপনাদের তেল ছাড়া রান্নার কয়েকটি রেসিপিও এখানে তুলে ধরা হলো।

Noodles Soup
ছবি: সংগৃহীত

নুডলসের স্যুপ

উপকরণ
• তেল—১ টেবিল চামচ
• লবণ—স্বাদমতো 
• কর্নফ্লাওয়ার—১ টেবিল চামচ 
• রসুন কুঁচি—১ চা-চামচ 
• আলু (বড়)—১টি (ছোট টুকরো করে কাটা)
• বিভিন্ন রঙের সবজি—১/২ কাপ
• ক্যাপসিকাম—১/৪ কাপ
• নুডলসের মশলা—২ প্যাকেট
• টমেটো সস—১/৩ কাপ
• পানি—৪ কাপ
• নুডলস—২ প্যাকেট

প্রস্তুত প্রণালি
প্রথমে চুলায় একটি পাত্র বসিয়ে ১ টেবিল চামচ তেল গরম করতে হবে। এরপর এতে ১ চা-চামচ রসুন কুঁচি দিয়ে হালকা আঁচে প্রায় ৩০ সেকেন্ড ভেজে নিতে হবে। তারপর ছোট টুকরো করে কাটা আলু দিয়ে প্রায় ১ মিনিট ভেজে নিতে হবে। আলু হালকা ভাজা হয়ে গেলে এতে বিভিন্ন রঙের সবজি যোগ করে ভালোভাবে নেড়েচেড়ে ৩–৪ মিনিট ভাজতে হবে।

এরপর চুলার আঁচ মিডিয়াম-লো করে নুডলসের প্যাকেট থেকে ১ প্যাকেট মশলা যোগ করতে হবে এবং এতে ৪ কাপ পানি ঢেলে দিতে হবে। পানি ফুটতে শুরু করলে ২ প্যাকেট নুডলস ছোট টুকরো করে এতে দিয়ে দিতে হবে। এ সময় আঁচ মিডিয়াম থেকে একটু বাড়িয়ে দিতে হবে।

এরপর ১/৩ কাপ টমেটো সস ও স্বাদমতো লবণ দিয়ে ঢেকে কিছুক্ষণ রান্না করতে হবে। নুডলস সেদ্ধ হয়ে গেলে স্যুপ ঘন করার জন্য ১ টেবিল চামচ কর্নফ্লাওয়ার ২ টেবিল চামচ পানিতে মিশিয়ে রান্নায় যোগ করতে হবে।

এ পর্যায়ে ভালোভাবে নেড়ে ১/৪ কাপ ক্যাপসিকাম কুঁচি ও বাকি ১ প্যাকেট নুডলসের মশলা দিয়ে দিতে হবে। সবকিছু ভালোভাবে মিশিয়ে নিয়ে চুলা থেকে নামিয়ে ফেলতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে, কর্নফ্লাওয়ার দেওয়ার কারণে স্যুপটি কিছুটা পাতলা থাকতেই নামাতে হবে। কারণ ঠান্ডা হলে এটি আরও ঘন হয়ে যাবে।

Grilled Chicken
ছবি: সংগৃহীত

গ্রিল চিকেন

উপকরণ
• মুরগি—১টি (প্রায় ১ কেজি ওজনের)
• পেঁয়াজ বাটা—৩ টেবিল চামচ
• আদা বাটা—১ টেবিল চামচ
• রসুন বাটা—১ টেবিল চামচ
• টক দই—৩ টেবিল চামচ (পানি ঝরানো)
• অরেঞ্জ জেলি—১ টেবিল চামচ
• মরিচ গুঁড়া—১ টেবিল চামচ
• জিরা গুঁড়া—১ চা-চামচ
• কাবাব মশলা—১ টেবিল চামচ
• টমেটো সস—১ টেবিল চামচ
• সয়া সস—১ টেবিল চামচ
• টক আচার—১ টেবিল চামচ
• চিনি—১/২ চা-চামচ
• লেবুর রস—১ টেবিল চামচ
• সরিষার তেল—২ টেবিল চামচ
• লবণ—স্বাদমতো

প্রস্তুত প্রণালি
১ কেজি ওজনের একটি মুরগি ভালোভাবে ধুয়ে পরিষ্কার করে নিতে হবে। এরপর বুকের দিকসহ পুরো মুরগিটাই ভালো করে চিড়ে নিতে হবে, যেন তা হাড় পর্যন্ত পৌঁছায়। এতে মশলা মাংসের ভেতরে ভালোভাবে প্রবেশ করতে পারবে।

এরপর মশলার মিশ্রণ তৈরি করতে হবে। পেঁয়াজ বাটা, আদা বাটা, রসুন বাটা, টক দই, অরেঞ্জ জেলি, মরিচ গুঁড়া, জিরা গুঁড়া, কাবাব মশলা, টমেটো সস, সয়া সস, টক আচার, চিনি, লেবুর রস ও স্বাদমতো লবণ একসঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে নিতে হবে। এই মশলা মুরগির সঙ্গে ভালোভাবে মেখে নিতে হবে। এরপর ঢেকে প্রায় ৩ ঘণ্টা মেরিনেট করার জন্য রেখে দিতে হবে।

গ্রিল করার আগে মুরগির পা দুটি সুতো দিয়ে বেঁধে নিতে হবে, এতে গ্রিল করার সময় মুরগির আকার ঠিক থাকবে। এরপর মুরগির গায়ে লেগে থাকা অতিরিক্ত মশলা কিছুটা সরিয়ে নিতে হবে। একটি পাত্রে ২ টেবিল চামচ সরিষার তেল গরম করে মুরগিটি বসিয়ে দিতে হবে। সরিষার তেল ব্যবহার করলে দারুণ একটি ফ্লেভার পাওয়া যায়।

এরপর প্রতি পাশ মিনিটখানেক করে উল্টে-পাল্টে হালকা ভেজে নিতে হবে, যাতে মুরগির আকার নষ্ট না হয়। তারপর ঢাকনা দিয়ে পাত্রটি ঢেকে কম আঁচে ১০ মিনিট রান্না করতে হবে।

১০ মিনিট পরে ঢাকনা খুললে দেখা যাবে মুরগি থেকে কিছু পানি বের হয়েছে। এই পানিতেই মুরগি সেদ্ধ হয়ে যাবে, আলাদা করে পানি দেওয়ার প্রয়োজন নেই। মুরগিটি উল্টে দিয়ে আঁচ মিডিয়ামে রেখে আবার ঢেকে ৮–১০ মিনিট রান্না করতে হবে।

এরপর ঢাকনা খুলে মুরগি উল্টে দিয়ে আঁচ বাড়িয়ে পানি শুকিয়ে নিতে হবে। এ সময় পাত্রে থাকা অবশিষ্ট মশলা থেকে কিছু নিয়ে ব্রাশ দিয়ে মুরগির গায়ে মেখে হালকা ঝলসে নিতে হবে।

এই পর্যায়ে সাবধানে রান্না করতে হবে, যেন মুরগি পুড়ে না যায়। সুন্দর গ্রিলের রঙ চলে এলে চুলা থেকে নামিয়ে নিতে হবে।

ব্যাস, তৈরি হয়ে গেল মজাদার গ্রিল চিকেন।

Mixed Vegetables
ছবি: সংগৃহীত

পাঁচমিশালি সবজি

উপকরণ
• পেঁয়াজ—২টি (মাঝারি সাইজের)
• রসুন—২/৩ কোয়া
• গাজর—১টি
• লাউ—১/৩ কাপ
• পেপে—১/৪ কাপ
• ফুলকপি—১/২ কাপ (বা অর্ধেক পরিমাণ)
• আলু—১টি (বড় সাইজের)
• মিষ্টি কুমড়া—১/৪ কাপ
• শিম—১/৪ কাপ
• তেজপাতা—২টি
• পাঁচফোঁড়ন—১/২ টেবিল চামচ
• আদা বাটা—১/২ চা-চামচ
• কাঁচামরিচ বাটা—১ চা-চামচ
• টমেটো—১টি (বড়, কুঁচি করা)
• লবণ—স্বাদমতো
• হলুদ গুঁড়া—১/৩ চা-চামচ
• ধনে গুঁড়া—১/২ চা-চামচ
• জিরা গুঁড়া—১/২ চা-চামচ
• মরিচ গুঁড়া—১/২ চা-চামচ
• পানি—১/৪ কাপ
• ধনেপাতা কুঁচি—পরিমাণমতো

প্রস্তুত প্রণালি
প্রথমে সব সবজি পছন্দমতো সাইজে টুকরো করে নিতে হবে। পেঁয়াজ ও রসুন একসঙ্গে বেটে নিতে হবে। এরপর একটি পাত্রে পরিমাণমতো পানি ফুটিয়ে তাতে যেসব সবজি সেদ্ধ হতে বেশি সময় লাগে, যেমন গাজর, লাউ ও পেপে-প্রথমে দিয়ে দিতে হবে। এগুলো ১ থেকে দেড় মিনিট সেদ্ধ করে তাতে আলু ও ফুলকপি দিয়ে আরও ১ থেকে দেড় মিনিট সেদ্ধ করতে হবে।

এরপর মিষ্টি কুমড়া ও শিম যোগ করতে হবে। সব সবজি হাফ বয়েল হলে ছেঁকে নিতে হবে।

এরপর একটি কড়াইতে তেজপাতা ও পাঁচফোঁড়ন দিয়ে অল্প আঁচে হালকা ভেজে নিতে হবে। ভাজা হয়ে গেলে এতে পেঁয়াজ-রসুন বাটা দিয়ে নাড়তে হবে। তারপর একে একে আদা বাটা ও কাঁচামরিচ বাটা যোগ করতে হবে। তেল ছাড়া রান্না করলে মশলা কষাতে একটু বেশি সময় লাগে এবং এই কষানোর ওপরই রান্নার স্বাদ নির্ভর করে। মশলা কষানোর সময় আঁচ কম রাখতে হবে।

পানি শুকিয়ে এলে টমেটো কুঁচি দিয়ে ঢেকে কিছুক্ষণ রান্না করতে হবে। টমেটো নরম হয়ে গেলে এতে লবণ, হলুদ, ধনে গুঁড়া, জিরা গুঁড়া ও মরিচ গুঁড়া দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে নিতে হবে।

এরপর ১/৪ কাপ পানি থেকে অল্প অল্প করে দিয়ে মশলার কাঁচা গন্ধ দূর হওয়া পর্যন্ত কষাতে হবে। এ সময় আঁচ লো থেকে মিডিয়াম রাখতে হবে।

এবার এতে আগে সেদ্ধ করা সবজি দিয়ে ভালোভাবে নেড়ে মিশিয়ে নিতে হবে। প্রয়োজনমতো লবণ দিয়ে ২–৩ মিনিট কষিয়ে নিতে হবে। এরপর সবজি সেদ্ধ করা পানি যোগ করে আঁচ বাড়িয়ে রান্না সম্পন্ন করতে হবে।
রান্না শেষে ওপরে ধনেপাতা কুঁচি ছড়িয়ে পরিবেশন করতে হবে।

Bhapa Rui
ছবি: স্পাইস বাংলার সৌজন্যে

রুই ভাপা

উপকরণ
• রুই মাছ—৬/৭ টুকরো
• লবণ—পরিমাণমতো
• হলুদ—১ চা-চামচ
• লেবুর রস—২ টেবিল চামচ
• কালো সরিষা—৩ চা-চামচ
• সাদা সরিষা—৩ চা-চামচ
• পোস্ত দানা—২ চা-চামচ
• কাঁচামরিচ—৫টি
• সরিষার তেল—২ চা-চামচ
• পানি—পরিমাণমতো
• টক দই—২/৩ কাপ

প্রস্তুত প্রণালি
রুই মাছের টুকরোগুলো প্রথমে ভালো করে ধুয়ে পরিষ্কার করে নিতে হবে। এরপর এতে লবণ ও লেবুর রস মাখিয়ে প্রায় ৩০ মিনিট ভিজিয়ে রাখতে হবে। এতে মাছের আঁশটে গন্ধ দূর হবে এবং মাছ নরম হবে। ফলে ভাপানোর সময় মশলা ভেতরে ভালোভাবে ঢুকতে পারবে।

এরপর মশলার পেস্ট তৈরি করতে হবে। একটি ব্লেন্ডারের জারে সরিষা, পোস্ত দানা, কাঁচামরিচ, লবণ, সরিষার তেল ও সামান্য পানি দিয়ে ভালোভাবে ব্লেন্ড করতে হবে। এরপর এই পেস্টে টক দই মিশিয়ে নিতে হবে।

৩০ মিনিট পর মাছগুলো পানি থেকে তুলে টিস্যু বা কিচেন টাওয়াল দিয়ে মুছে নিতে হবে। তারপর একটি পাত্রে নিয়ে হলুদ গুঁড়া দিয়ে হালকা করে মেখে নিতে হবে। এরপর একটি ঢাকনাযুক্ত স্টিলের বাটিতে মশলার পেস্ট নিয়ে তাতে মাছের টুকরোগুলো দিয়ে ভালোভাবে মাখাতে হবে। ঢাকনা দেওয়ার আগে কয়েকটি কাঁচামরিচ চিরে ওপরে দিয়ে দিতে হবে।

চুলায় একটি কড়াই বসিয়ে তার মধ্যে একটি স্ট্যান্ড বসিয়ে বাটিটি রাখতে হবে। কড়াইয়ে কিছু পানি দিতে হবে, তবে খেয়াল রাখতে হবে পানির স্তর যেন বাটির নিচে থাকে, ভেতরে না ঢোকে। এবার কড়াই ঢেকে মাঝারি থেকে উচ্চ আঁচে প্রায় ২৫ মিনিট ভাপে রান্না করতে হবে।

২৫ মিনিট পর চুলা থেকে নামিয়ে ৪–৫ মিনিট রেখে তারপর ঢাকনা খুলে গরম গরম ভাপা রুই পরিবেশন করতে হবে।

Cholar Salad
ছবি: সংগৃহীত

ছোলার সালাদ

উপকরণ
• ছোলা—১/২ কাপ
• শসা—১টি
• ক্যাপসিকাম—১টি
• টমেটো—১/২ কাপ
• অলিভ অয়েল—১ টেবিল চামচ
• লেবুর রস—১ টেবিল চামচ
• লবণ—স্বাদমতো
• কালো গোলমরিচের গুঁড়া—১ চা-চামচ
• তেঁতুলের সস—১ চা-চামচ
• চাট মশলা—১/২ চা-চামচ
• ধনেপাতা কুঁচি—পরিমাণমতো

প্রস্তুত প্রণালি
সারারাত ভিজিয়ে রাখা ছোলা সামান্য লবণ দিয়ে সেদ্ধ করে নিতে হবে। এরপর শসা, টমেটো ও ক্যাপসিকাম পছন্দমতো আকারে কেটে নিতে হবে।

সালাদের ড্রেসিং তৈরির জন্য একটি পাত্রে অলিভ অয়েল, লেবুর রস, লবণ, কালো গোলমরিচের গুঁড়া ও তেঁতুলের সস একসঙ্গে মিশিয়ে নিতে হবে। এরপর একটি বড় পাত্রে সেদ্ধ ছোলা ও বকি সব উপকরণ একসঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে নিতে হবে।

সবশেষে চাট মশলা ও ধনেপাতা কুঁচি ছিটিয়ে পরিবেশন করতে হবে।