জেন-জির কাছে ‘পিক মি’ তকমা পান কারা?
কয়েক বছর আগে কেউ যদি বলত, ‘আমি অন্যদের মতো না’, তাহলে হয়তো কথাটি শুনে কেউ খুব একটা গুরুত্ব দিত না। এখন বললে একটু ঝুঁকি আছে। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্যের ঘরে কেউ না কেউ এসে লিখবেই ‘পিক মি’।
গত কয়েক বছরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হরহামেশাই ‘পিক মি’ বলা হচ্ছে। মজার ব্যাপার হলো, অনেক সময় যাকে বলা হচ্ছে, তিনি নিজেও বুঝতে পারছেন না কেন বলা হচ্ছে।
‘পিক মি’ শব্দটি মূলত ইংরেজি ‘pick me’ থেকে এসেছে। অর্থাৎ, ‘আমাকে বেছে নাও’। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এটি এমন এক ধরনের আচরণ বোঝাতে ব্যবহৃত হতে শুরু করেছে, যেখানে কেউ অন্যদের চেয়ে নিজেকে বেশি ব্যতিক্রমী বা বেশি পছন্দনীয় হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে।
ধরুন, রাহাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বন্ধুরা সবাই যখন আইপিএল নিয়ে মেতে উঠেছে, সে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলো, ‘ক্রিকেট দেখে সময় নষ্ট করার চেয়ে আমি দস্তয়েভস্কি পড়ি। মানুষ কীভাবে এত ঘণ্টা বলের পেছনে দৌড়ানো দেখে বুঝি না।’ পোস্টে লাইক পড়ল, কেউ কেউ ‘ইন্টেলেকচুয়াল’ বলে মন্তব্য করল। রাহাতও খুশি। পরদিন আরেকটি স্ট্যাটাস, ‘আমি আসলে সামাজিক অনুষ্ঠানে যেতে পছন্দ করি না। মানুষের সঙ্গে কথা বলার চেয়ে একা থাকা ভালো।’ প্রথমে বন্ধুরা হাসাহাসি করল। পরে কেউ একজন মন্তব্য করল, ‘ভাই, পিক মি।’ রাহাত অবাক। কারণ সে তো সত্যিই বই পড়তে ভালোবাসে, সত্যিই একা থাকতে পছন্দ করে।
কিন্তু ‘পিক মি’ আলোচনায় সমস্যাটা সাধারণত সত্য-মিথ্যার নয়। সমস্যাটা হয় তখন, যখন নিজের পছন্দের কথা বলতে গিয়ে অন্যদের পছন্দকে ছোট করা শুরু হয়। রাহাত বলতে পারত, ‘আমি বই পড়তে ভালোবাসি।’ কিন্তু সে বলল, ‘ক্রিকেট দেখে সময় নষ্ট করার চেয়ে’। এই ‘চেয়ে’ শব্দটিই অনেক সময় পার্থক্য তৈরি করে।
আলাদা হওয়া আর আলাদা দেখানোর চেষ্টা—দুটো এক জিনিস নয়। কেউ সত্যিই ডকুমেন্টারি পছন্দ করতে পারে, জনপ্রিয় কোনো সিরিজ নয়। কেউ সত্যিই ভিড় এড়িয়ে চলতে ভালোবাসতে পারে। কেউ হয়তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খুব সক্রিয় নয়। শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের সঙ্গে একমত না হলেই কেউ ‘পিক মি’ হয়ে যায় না। তাই ‘পিক মি’ বলা হবে কি না, সেটি অনেক সময় নির্ভর করে কথার ভঙ্গির ওপর। ধরুন, সবাই যখন কোনো জনপ্রিয় ক্যাফেতে ছবি তুলছে, তখন একজন স্টোরি দিলেন, ‘আমি আসলে ছবি তুলতে ব্যস্ত না, মুহূর্তটা উপভোগ করছি।’ মজার ব্যাপার হলো, সেই কথাটিও তিনি স্টোরিতেই জানালেন। এই ধরনের ছোট ছোট বৈপরীত্যই অনেক সময় মানুষকে ‘পিক মি’ তকমা দেওয়ার দিকে ঠেলে দেয়।
বর্তমানে ‘পিক মি’ এত বেশি ব্যবহার করা হয় যে সেটি একটি ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে। কোনো মন্তব্য পছন্দ হলো না? পিক মি। কারও আচরণ বিরক্তিকর লাগল? পিক মি। কারও মতামত জনপ্রিয় মতের সঙ্গে মিলল না? সেখানেও পিক মি। ফলে অনেক সময় শব্দটি তার আসল অর্থ হারিয়ে ফেলে। একসময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ একে অপরকে ‘ক্রিঞ্জ’ বলত। এখন অনেক ক্ষেত্রে ‘পিক মি’ সেই জায়গা দখল করেছে। এটি শুধু একটি আচরণের বর্ণনা নয়, অনেক সময় দ্রুত সমালোচনার শর্টকাট হিসেবেও ব্যবহার করা হয়।
তবু শব্দটি জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে একটি বাস্তব কারণ আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষকে সবসময় নিজেকে উপস্থাপন করার সুযোগ দেয়। কে কী খায়, কোথায় যায়, কী দেখে, কী পছন্দ করে সবকিছুই এখন দৃশ্যমান। ফলে নিজেকে অন্যদের থেকে একটু আলাদা দেখানোর চেষ্টাও আগের চেয়ে বেশি চোখে পড়ে। হয়তো সে কারণেই ‘পিক মি’ শব্দটি এত দ্রুত জনপ্রিয় হয়েছে। কারণ এটি শুধু অন্য কাউকে নিয়ে নয়, আমাদের নিজেদের কিছু আচরণ নিয়েও প্রশ্ন তোলে। আমরা কি সত্যিই নিজের পছন্দের কথা বলছি, নাকি মাঝে মাঝে নিজেদের একটু আলাদা হিসেবে দেখানোর চেষ্টাও করছি? প্রশ্নটির উত্তর সবসময় সহজ নয়। আর সম্ভবত সে কারণেই ‘পিক মি’ শব্দটি নিয়ে আলোচনা এত সহজে থামে না।


