সপ্তাহের সাত দিনের নাম কীভাবে এলো?

পূর্বাশা পৃথ্বী

গল্পের শুরুটা প্রাচীন রোমের আকাশে। রোমানরা দেখতে পায়, রাতের আকাশে মাথার ওপর জ্বলজ্বল করে সাতটি জ্যোতিষ্ক—সূর্য, চাঁদ, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র আর শনি। এগুলো খালি চোখেই দেখা যেত।

মানুষের বিশ্বাস ছিল, প্রতিটি দিনের ওপর একেকটি গ্রহ-দেবতার বিশেষ প্রভাব আছে। প্রতিটি দিন ভালো কাটার জন্য দরকার ছিল সেই দেবতাদের আশীর্বাদও। তাই তৈরি করা হলো এমন একটি দিনপঞ্জি, যা শুধু সময় গোনার উপায় ছিল না। ছিল দেবতাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন আর অটুট বিশ্বাসের প্রতিফলনও।

রবিবার বা সানডেকে রোমানরা বলত ডিয়েস সোলিস, অর্থাৎ সূর্যের দিন। সূর্যদেব সোল ছিলেন আলো, জীবনীশক্তি ও শক্তির প্রতীক। রোমানদের কাছে সূর্যই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্যোতিষ্ক। কারণ এটি নিয়ন্ত্রণ করত ঋতু আর দিন-রাতের চক্র। পরবর্তীতে খ্রিস্টান রোমান সাম্রাজ্যে এই দিনটিকে গুরুত্ব দেওয়া হয় ‘লর্ডস ডে’ বা ‘প্রভুর দিন’ হিসেবেও।

সোমবারকে বলা হতো ডিয়েস লুনায়ে, অর্থাৎ চাঁদের দিন। চন্দ্রদেবী লুনা ছিলেন রাত, রহস্য ও পরিবর্তনের প্রতীক। চাঁদের ক্ষয়-বৃদ্ধি ছিল রোমানদের সময় মাপার অন্যতম প্রধান উপায়। তাই সপ্তাহের দ্বিতীয় দিনটি উৎসর্গ করা হলো তার নামে।

যুদ্ধদেবতা মার্স ছিলেন সাহস, শক্তি ও যুদ্ধক্ষেত্রের রক্ষাকর্তা। তার নামেই হলো ডিয়েস মার্তিস, মার্সের দিন। রোমান রাষ্ট্রের সামরিক শক্তির প্রতীক হিসেবে তাকে করা হতো অত্যন্ত সম্মান। এমনকি মার্চ মাসের নামও এসেছে তার নাম থেকেই।

বার্তাবাহক দেবতা মার্কারি ছিলেন বাণিজ্য, যোগাযোগ, ভ্রমণ ও চতুরতার দেবতা। তিনি বহন করতেন দেবতাদের বার্তা, পরিচিত ছিলেন দ্রুতগতির প্রতীক হিসেবে। ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য শুভদিন ভেবে এই দিনের নাম রাখা হলো ডিয়েস মার্কুরিই, মার্কারির দিন।

দেবরাজ জুপিটার ছিলেন আকাশ, বজ্র-বিদ্যুৎ ও সব দেবতার রাজা। তার গ্রহকেই আমরা বলি বৃহস্পতি। তিনি ছিলেন ন্যায়বিচার, শাসন ও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কর্তৃত্বের প্রতীক, অনেকটা গ্রিক জিউসের সমতুল্য। তার সম্মানে দিনের নাম রাখা হলো ডিয়েস ইয়োভিস, জুপিটারের দিন।

প্রেম ও সৌন্দর্যের দেবী ভেনাস। তার জ্যোতিষ্ক হিসেবে গণ্য করা হতো শুক্রগ্রহকে। তিনি ছিলেন সৌন্দর্য, প্রেম, উর্বরতা ও আকর্ষণের প্রতীক। রোমান সংস্কৃতিতে তাকে ঘিরে হতো অনেক উৎসব ও পূজা-অর্চনা। একটি দিন তার নামে উৎসর্গ করা হলো—ডিয়েস ভেনেরিস, ভেনাসের দিন।

কৃষি ও সময়ের দেবতা স্যাটার্ন ছিলেন সমৃদ্ধি, ফসল ও কালের প্রতীক। তাকে ঘিরে পালিত স্যাটারনালিয়া উৎসব ছিল রোমানদের সবচেয়ে জনপ্রিয় উৎসবগুলোর একটি। এটি ছিল আনন্দ, উপহার বিনিময় আর সামাজিক নিয়ম শিথিল করার সময়। তার নামেই হলো ডিয়েস স্যাটার্নি, স্যাটার্নের দিন।

সময়ের সঙ্গে সপ্তদিনের এই ধারণা রোমান সাম্রাজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে পৌঁছে গেল উত্তর ইউরোপে, জার্মানিক আর অ্যাংলো-স্যাক্সন জনগোষ্ঠীর কাছে। কিন্তু তারা তো রোমান দেবতাদের চিনত না। তারা চিনত নিজেদের নর্স পুরাণের দেবতাদের। তাই রোমান দেবতাদের সঙ্গে চরিত্রের মিল খুঁজে তারা নিজেদের দেবতাদের নাম বসিয়ে দিল দিনের নামে।

যুদ্ধদেবতা মার্সের জায়গায় এলেন নর্স যুদ্ধদেবতা টিউ। তৈরি হলো টিউজডে। বার্তাবাহক দেবতা মার্কারির বদলে বসলেন দেবরাজ ওডেন। জন্ম নিল ওয়েডনসডে। বজ্র-বিদ্যুতের দেবতা জুপিটারের জায়গা নিলেন থর। তার সম্মানে যোগ হলো থার্সডে। আর সৌন্দর্য-প্রেমের দেবী ভেনাসের বদলে এলেন ফ্রিগ বা ফ্রেয়া। গড়ে উঠল ফ্রাইডে।

ছয়টি দিনের নাম বদলে গেলেও স্যাটারডে নামটি আজও রয়ে গেছে রোমান দেবতা স্যাটার্নের নামেই। ইতিহাসবিদদের ধারণা, নর্স পুরাণে স্যাটার্নের চরিত্রের সঙ্গে মেলে এমন কোনো স্পষ্ট দেবতা ছিল না। তাই এই নামটি বদলানো হয়নি। ফলে স্যাটারডে হয়ে আছে আদি রোমান ঐতিহ্যের এক নীরব সাক্ষী। বাকি ছয়টি দিন পেয়েছে উত্তরের দেবতাদের হাতে নতুন রূপ।

এই গল্পটা আরও চমকপ্রদ হয়ে ওঠে বাংলা সপ্তাহের দিকে চোখ ফেরালে। পৃথিবীর দুই প্রান্তের দুই সভ্যতা—রোমান আর ভারতীয়—একেবারে আলাদাভাবে, অথচ প্রায় একই চিন্তাভাবনায় আকাশের সাতটি জ্যোতিষ্কের নামেই দিন গুনতে শুরু করেছিল। বাংলা সপ্তাহের দিনের নামগুলোও এসেছে সংস্কৃত জ্যোতিষশাস্ত্র ও নবগ্রহ ধারণা থেকে। প্রতিটি দিনের নাম রাখা হয়েছে একটি গ্রহ বা আকাশীয় বস্তুর নামে। আর সেই গ্রহগুলোর সঙ্গে যুক্ত আছে হিন্দু পুরাণের দেবতাদের নাম।

রবি সূর্যের অপর নাম। রবি বা সূর্য বৈদিক যুগের অন্যতম প্রধান দেবতা। তাকে ভাবা হতো আলো, জীবন, শক্তি ও সত্যের উৎস। ঋগ্বেদে সূর্যকে বর্ণনা করা হয়েছে এমন এক দেবতা হিসেবে, যিনি অন্ধকার দূর করেন এবং বিশ্বকে সচল রাখেন। তাই রবিবার হলো সূর্যের দিন।

সোম মূলত চন্দ্রের একটি সমার্থক নাম। চন্দ্রকে ধরা হয় মন, আবেগ, কল্পনা ও সৌন্দর্যের প্রতীক। সোমদেব বা চন্দ্রদেবের নামেই এই দিনের নামকরণ। রোমান দেবী লুনার দিন বা ইংরেজি মানডে পরিচিত হলো সোমবার নামে।

মঙ্গল গ্রহের নাম থেকেই মঙ্গলবার। অনেক পুরাণে মঙ্গলকে বলা হয়েছে পৃথিবীদেবী ভূমির পুত্র। তিনি শক্তি, সাহস, যুদ্ধ ও উদ্যমের প্রতীক—যা মিলে যায় দেবতা টিউ বা মার্সের সঙ্গে। জ্যোতিষশাস্ত্রে মঙ্গল গ্রহের সম্পর্ক স্থাপন করা হয় রক্ত, আগুন, প্রতিযোগিতা ও নেতৃত্বের সঙ্গে। প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতিষে মঙ্গলকে ধরা হতো শক্তি, যুদ্ধ ও সাহসের প্রতীক। সে থেকেই প্রথমে সংস্কৃতে, পরে বাংলায় এসেছে মঙ্গলবার।

পুরাণে বুধকে বলা হয় চন্দ্র ও তারার (বৃহস্পতির পত্নী) পুত্র। এই কাহিনি ভারতীয় পুরাণের অন্যতম বিখ্যাত পারিবারিক আখ্যান। বুধ জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা, ভাষা, যুক্তি ও ব্যবসার প্রতীক। তাই ‘বুধ’ শব্দের সঙ্গে ‘বোধ’ বা বুদ্ধির সম্পর্কও গভীর। জ্ঞান, বুদ্ধি ও বাণিজ্যের সঙ্গে বুধ গ্রহের সম্পর্ক এতটাই শক্তিশালী যে, রোমানরা যে দিনটি রেখেছিল মার্কারির নামে, আর ইউরোপীয়রা যে দিনটি রেখেছিল ওডেনের নামে—ভারতীয় উপমহাদেশে সেই দিনটিই পরিচিত হলো বুধবার নামে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানে জুপিটার গ্রহের বাংলা নাম বৃহস্পতি। সৌরজগতে বৃহস্পতি গ্রহ আয়তনে সবচেয়ে বড়। আর হিন্দু পুরাণে বৃহস্পতিদেব পরিচিত দেবতাদের গুরু হিসেবে। তাই জুপিটারের দিন কিংবা থরের দিন ভারত ও বাংলায় এসে নাম নিল বৃহস্পতিবার।

ভেনাস দেবী বা ফ্রিগ দেবীর প্রতি রোমান কিংবা ইউরোপীয়দের যে বিশ্বাস ছিল, শুক্রের প্রতি উপমহাদেশের মানুষেরও ছিল প্রায় একই রকম বিশ্বাস। এভাবেই শুক্র গ্রহের নামে হলো শুক্রবার। পুরাণে শুক্রাচার্য ছিলেন অসুরদের গুরু। শুক্র গ্রহকেও বিবেচনা করা হয় সৌন্দর্য, প্রেম ও সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে।

শনি সূর্যের পুত্র বলে বর্ণিত। তিনি পরিচিত কর্মফল ও ন্যায়বিচারের দেবতা হিসেবে। লোকবিশ্বাস ছিল, যে যেমন কাজ করবে, শনি তাকে তেমন ফল দেবেন। তাই শনি আসলে বিচারক দেবতার মতোই। শনিদেবের গ্রহ শনি বা স্যাটার্ন। তার নামেই শনিবার। শনিদেব পরিচিত বিচার ও কর্মফলের প্রতীক হিসেবে।

সব মিলিয়ে সপ্তাহের সাতটি দিন আসলে একাধিক সভ্যতার বিশ্বাসের মিলনস্থল। একদিকে রোমান জ্যোতির্বিজ্ঞানের যুক্তি, অন্যদিকে নর্স পুরাণের কল্পনাশক্তি, আরেকদিকে ভারতীয় বৈদিক বিশ্বাস ও জ্যোতির্বিজ্ঞান। সপ্তাহের এই সাতটি দিন মনে করিয়ে দেয়—মানুষ ভৌগোলিকভাবে যেখানেই থাকুক না কেন, মাথার ওপরের একই আকাশের দিকে তাকিয়ে সময়কে বোঝার চেষ্টা করেছে প্রায় একইভাবে। প্রতিটি দিনের নামের ভেতর তাই লুকিয়ে আছে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের হাজার বছরের পুরোনো বিশ্বাস।