সঞ্চয় শুরু করার সহজ অভ্যাস
জীবনে সঞ্চয় করা জরুরি—এ কথা তো আমরা সবাই জানি, তাই নয় কি? কিন্তু এই দুর্মূল্যের বাজারে, যেখানে দৈনন্দিন জীবনের খরচ মেটাতেই হিমশিম খেতে হয়, সেখানে ‘সঞ্চয়’ শব্দটি অনেকের কাছে আঁতকে ওঠার মতো একটি বিষয়ই। সঞ্চয় মানেই যে আপনাকে অনেক কিছু ত্যাগ করতে হবে, তা কিন্তু নয়!
সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে মূল বাধা হয়ে দাঁড়ায় যে, আমরা ঠিক বুঝে উঠতে পারি না—শুরুটা কীভাবে করব। সঞ্চয় থাকলে বিপদের দিনে এই জমানো টাকাগুলো যেন আশীর্বাদের মতো উপকারে আসে। জীবন অনিশ্চিত; আমরা ঠিক জানি না, আগামীকাল আমাদের সঙ্গে কী হতে চলেছে। তাই যেকোনো পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য নিজের কিছু অর্থ সঞ্চয় করা প্রয়োজন।
শুরু করবেন যেভাবে
সঞ্চয় শুরু করার জন্য প্রথমেই আপনি কী কী কারণে, কোথায় এবং কত টাকা খরচ করে থাকেন, তার একটি হিসাব কষতে হবে। একদম ছোট ছোট খরচ—যেমন: ঘরের টুকিটাকি জিনিসপত্র থেকে শুরু করে মাসের নিয়মিত বিল; সবকিছুরই একটি তালিকা বানিয়ে ফেলতে হবে। এ যেন আপনার নিয়মিত খরচের এক দলিল, যাতে একবার চোখ বুলালেই একটি স্বচ্ছ ধারণা তৈরি হয়।
এই তালিকাটি আপনি যেভাবে ইচ্ছে সেভাবে করতে পারেন। যেমন ধরুন, একটি স্প্রেডশিটে, পছন্দসই কোনো মোবাইল অ্যাপে, অনলাইন এক্সপেন্স ট্র্যাকারে অথবা একটি কাগজে হাতে-কলমেও লিখে রাখতে পারেন।
এরপর এই খরচগুলোকে বিভিন্ন ভাগে, যেমন যাতায়াত, খাওয়া-দাওয়া বা সাংসারিক খরচ—এভাবে ভাগ করে নিতে পারেন। তারপর আপনি মাসে কতটা খরচ করেন এবং আপনার মাসিক আয় কত, তার একটি হিসাব কষে খুব সহজেই প্রতি মাসের আয় থেকে কিছু অর্থ সঞ্চয় হিসেবে জমা করা শুরু করতে পারেন। সঞ্চয়ের শুরুটা কিন্তু এভাবেই খুব সহজে করা যায়।
লক্ষ্য নির্ধারণ
সঞ্চয়ের জন্য যদি একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকে, তাহলে টাকা জমানোর বিষয়টি আপনার কাছে অর্থবহ ও অনুপ্রেরণাদায়ক হয়ে উঠবে। প্রথমে সিদ্ধান্ত নিন যে আপনি স্বল্পমেয়াদে নাকি দীর্ঘমেয়াদে সঞ্চয় করতে চান। এরপর সঞ্চয়ের জন্য কত টাকা লাগবে এবং কতদিন ধরে তা জমা রাখতে হবে, সে সম্পর্কে একটি ধারণা নিন। এসব তথ্যের ভিত্তিতে এবার আপনি সঞ্চয়ের পরিকল্পনা করে ফেলুন।
যে অভ্যাসগুলোর অনুশীলন জরুরি
খরচের হিসাব রাখা
সঞ্চয় শুরু করার জন্য প্রথমেই আপনাকে আপনার সব খরচের হিসাব রাখতে হবে। আপনি যদি আপনার খরচের পরিমাণ এবং খাত সম্পর্কে না জানেন, তাহলে অযাচিত খরচগুলো বাদ দিয়ে সেগুলোকে সঞ্চয়ে পরিণত করতে পারবেন না।
দৈনন্দিন খরচ কমানো
আপনার প্রতিদিনের খরচের পরিমাণ থেকে যে টাকাটা আপনি খরচ করবেন না, দিনশেষে সেটাই আপনার সঞ্চয়ের তালিকায় যোগ হবে। যেমন ধরুন, খাওয়ার খরচ নিয়ে নতুন করে পরিকল্পনা করতে পারেন, বিভিন্ন মাসিক সাবস্ক্রিপশন ও ইউটিলিটি বিল পর্যালোচনা করা যেতে পারে এবং হুটহাট কেনাকাটা এড়িয়ে চলতে হবে। এই খরচগুলো নিয়ে হিসাব করলে অনেক অপ্রয়োজনীয় খরচের ধারণা পাওয়া যায়। এসব খরচ বাদ দিলেই তা সঞ্চয়ের খাতায় যোগ হতে থাকবে।
উদ্দেশ্য নির্ধারণ
লক্ষ্য ছাড়া যেমন কার্যসাধন হয় না, ঠিক তেমনি সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া সঞ্চয় শুরু করলে কিছুদিন পর এটি আপনার কাছে অর্থহীন মনে হতে পারে। তাই বাস্তবসম্মত এবং পূরণ করতে পারবেন; এমন সঞ্চয়ের কারণ ও লক্ষ্য নির্ধারণ করুন।
নিয়মিত সঞ্চয়ের পরিমাণ ঠিক করুন
আপনার লক্ষ্য, কতদিনের জন্য সঞ্চয় করতে চান এবং আপনার বর্তমান আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে ঠিক করতে হবে যে, আপনার মাসিক আয় থেকে কী পরিমাণ অর্থ সঞ্চয় করতে চান। সাধারণত মাসিক আয়ের ১০ থেকে ২০ শতাংশ সঞ্চয় করা হয়। তবে এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করে আপনার সার্বিক পরিস্থিতির ওপর।
ভেবেচিন্তে কেনাকাটা করা
অনলাইনে স্ক্রল করতে গিয়ে কোনো কিছু চোখে পড়লে আমরা অনেক সময় হুট করে কিনে ফেলি। কেনার আগে আমরা একটু সময় নিয়ে ভেবে দেখি না যে, আসলেই এই জিনিসটি আমাদের জন্য কতটা প্রয়োজনীয় বা এই মুহূর্তে কেনাটা জরুরি কি না। কোনো কিছু দেখার পর যদি আমরা কিছুটা সময় নিই; হতে পারে একদিন বা কয়েকদিন-তাহলে এই সময়টি আমাদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে যে, আদৌ ওই জিনিসটি কেনা উচিত কি না। এভাবে ভেবেচিন্তে কেনাকাটা করলে অপ্রয়োজনীয় খরচ কমে এবং সঞ্চয় করা সহজ হয়।
