৮০ ও ৯০-এর দশক যদি এতই চমৎকার হয়ে থাকে, তাহলে বর্তমানটা গড়ে তুলল কে?

Jannatul Naym Pieal
জান্নাতুল নাঈম পিয়াল

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড় তুলেছে ৮০ ও ৯০-এর দশকের নস্টালজিয়া। সবাই যেন বর্তমান সময়ের নিজেদের ছবিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মাধ্যমে ৮০ ও ৯০-এর দশকের অবয়বে রূপ দিচ্ছেন। একইসঙ্গে হৃদয়ের কাছের সেই সময় হারিয়ে যাওয়ার জন্য আক্ষেপ করছেন এবং বর্তমানকে অভিশাপ দিচ্ছেন।

এআইয়ের ছোঁয়া হয়তো নতুন, কিন্তু এই অনুভূতি মোটেও নতুন নয়। মাঝেমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ৮০ ও ৯০-এর দশকের স্মৃতিচারণকারীদের পোস্টে ভরে যায়। তারা জোর দিয়ে বলেন, তখন জীবন অনেক ভালো ছিল এবং আক্ষেপ করেন যে বর্তমান প্রজন্ম কোনো না কোনোভাবে ‘রসাতলে গেছে’।

জেন জি প্রজন্মের একজন সদস্য হিসেবে অতীতকে এমন রঙিন চশমায় দেখার বিষয়টি আমার কাচে বেশ অবিশ্বাস্য মনে হয়।

নস্টালজিয়া খারাপ কিছু নয়। এটি মানুষের সবচেয়ে স্বাভাবিক অনুভূতিগুলোর একটি। আমরা সবাই জীবনের কিছু সময়, বিশেষ করে শৈশব ও কৈশোরকে রোমান্টিকভাবে স্মরণ করি। কিন্তু আমরা একসময় কোনো এক সাংস্কৃতিক স্বর্ণযুগে বাস করতাম এবং এরপর হঠাৎ করেই সবকিছু অধঃপতনের দিকে গেল, এমন ধারণা অনেক বেশি জটিল।

কারণ বর্তমান প্রজন্ম তো শূন্য থেকে আসেনি। ২০২৬ সালের এই পৃথিবী একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। ৮০-এর দশক ৯০-এর দশককে গড়ে দিয়েছে, ৯০-এর দশক গড়ে দিয়েছে ২০০০-এর দশককে, ২০০০-এর দশক গড়ে দিয়েছে ২০১০-এর দশককে। আমরা আজ যে সমাজে বাস করি, এভাবেই বিভিন্ন দশকের ধারাবাহিকতায় সেটি তৈরি হয়েছে।

আর এখানে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন আছে: এখন আসলে দেশ চালাচ্ছেন কারা?

কথিত সেই গৌরবময় ৮০ ও ৯০-এর দশকে বেড়ে ওঠা মানুষগুলোই আজকের নীতিনির্ধারক, আমলা, শিক্ষাবিদ, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের নিয়ন্ত্রক এবং রাজনৈতিক নেতা। যে প্রতিষ্ঠান ও সমাজ নিয়ে আমরা এখন অভিযোগ করি, সেগুলো গড়ে তুলতে তারা বছরের পর বছর ব্যয় করেছেন।

তাহলে কথিত সেই চমৎকার সময়ে বেড়ে ওঠা যদি সত্যিই আমরা যতটা শুনি, ততটাই অসাধারণ হয়ে থাকে, তাহলে তা আসলে কী তৈরি করেছে? প্রাতিষ্ঠানিক উৎকর্ষ কোথায়? নাগরিক সংস্কৃতি কোথায়? জবাবদিহি কোথায়? জননৈতিকতা কোথায়? বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য কোথায়? কথিত সেই উন্নততর সামাজিক মূল্যবোধই বা কোথায়?

তরুণ প্রজন্মকে সাংস্কৃতিকভাবে নিকৃষ্ট বলে যেতে পারেন না, অথচ স্বীকার করতে অস্বীকার করবেন যে আপনারাই এই দেশটি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছেন এবং যে সমাজে তারা বেড়ে উঠেছে, সেটি গড়ে তুলতে আপনারাও ভূমিকা রেখেছেন।

অতীতকে আমরা যেভাবে মনে রাখি, সেখানেও একটি সমস্যা আছে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তন নিয়ে যথেষ্ট কঠোর ও গভীর একাডেমিক গবেষণা কখনোই হয়নি। মোটামুটি ২০১০-এর দশক পর্যন্ত জনপরিসরও নগরভিত্তিক অভিজাত শ্রেণি ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের নিয়ন্ত্রকদের দ্বারা অনেক বেশি প্রভাবিত ছিল।

ফলে আমরা ‘সমাজ’ বলতে যা দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলাম, তা প্রায়ই ছিল সমাজের সেই সম্মানজনক অংশটুকুই, যেটিকে ওই নিয়ন্ত্রকেরা জনসমক্ষে আসার যোগ্য বলে মনে করতেন।

যেসব বিষয়কে আমরা এখন ‘অশ্লীল’, ‘রুচিহীন’ বা ‘অপসংস্কৃতি’ বলি, সেগুলো আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সৃষ্টি করেনি। এগুলো বরাবরই জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশ ছিল। শুধু মূলধারায় তাদের প্রবেশাধিকার ছিল না।

হুমায়ূন আহমেদ ও কাসেম বিন আবু বকরকে উদাহরণ হিসেবে নেওয়া যাক।

হুমায়ূন আহমেদ বিপুল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন, কারণ তিনি মধ্যবিত্তের সাংস্কৃতিক রুচির একটি পরিশীলিত ও সহজবোধ্য রূপ তুলে ধরেছিলেন এবং টেলিভিশন ও সাহিত্যের মাধ্যমে সফলভাবে মূলধারায় প্রবেশ করেছিলেন।

কিন্তু কাসেম বিন আবু বকরের বইও তখন বিপুল জনপ্রিয় ছিল। পার্থক্য ছিল, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের প্রভাবশালী মহল তাকে একই ধরনের মূলধারার মনোযোগ পাওয়ার যোগ্য মনে করেনি। তার জনপ্রিয়তা তবু ছিল। ঢাকাকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক অভিজাতরা শুধু সেটি দেখতে পাননি।

সাংস্কৃতিক অভিজাতদের চোখে কোনো কিছু অদৃশ্য থাকার অর্থ এই নয় যে তার অস্তিত্ব ছিল না।

প্রযুক্তি এখন সেই নিয়ন্ত্রণের বড় একটি অংশই ভেঙে দিয়েছে। প্রায় সবার হাতেই স্মার্টফোন এবং ফেসবুক, ইউটিউব বা টিকটকে প্রবেশাধিকার রয়েছে। যারা একসময় অদৃশ্যই থেকে যেতেন, তারা এখন সংবাদপত্র, টেলিভিশন চ্যানেল, প্রকাশক বা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের অনুমতি না নিয়েই বিপুল দর্শক-শ্রোতা তৈরি করতে পারেন।

এভাবেই হিরো আলম, প্রিন্স মামুনসহ অগণিত মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে।

তারা আর আড়ালে নেই। কখনো কখনো তারা এতটাই বর্ণময়, বিতর্কিত ও সাংস্কৃতিকভাবে সর্বব্যাপী হয়ে ওঠেন যে, জনসাধারণের মনোযোগ পাওয়ার যোগ্য কী, একসময় যারা তা নির্ধারণ করতেন, সেই অভিজাতদেরই তারা ছাপিয়ে যেতে পারেন। শেষ পর্যন্ত মূলধারার গণমাধ্যমের তাদের স্বীকৃতি দেওয়া ছাড়া তেমন কোনো উপায় থাকে না।

আর তখন মধ্যবিত্তের ‘সুরুচি’র রক্ষকেরা আক্ষেপ করতে শুরু করেন যে, সমাজে ‘নান্দনিক রুচির দুর্ভিক্ষ’ চলছে।

কিন্তু হয়তো সমাজ হঠাৎ রসাতলে যাচ্ছে না। হয়তো যা সব সময়ই ছিল, আমরা এখন শুধু তার আরও বেশি কিছু দেখতে পাচ্ছি।

তাই ৮০ ও ৯০-এর দশকের নস্টালজিয়ার সমস্যা হলো, আমরা সেই অংশগুলোই মনে রাখি, যা আমাদের ভালো অনুভব করায়। অথচ যেসব বিষয় বর্তমান কেন এমন দেখাচ্ছে, তা ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে, সেগুলো ভুলে যাই।

আর কথিত সেই গৌরবময় দশকগুলোতে বেড়ে ওঠা মানুষগুলো যদি এখন দেশ চালিয়ে থাকেন, তাহলে তাদের নিজেদের একটি সহজ প্রশ্ন করা উচিত: আপনার বেড়ে ওঠার সময়টা যদি সত্যিই এত অসাধারণ হয়ে থাকে, তাহলে আপনারা যে সমাজ গড়ে তুলেছেন, এবং এখনো যেভাবে গড়ে চলেছেন, তার অবস্থা এত করুণ কেন?