নাগরিকত্ব প্রশ্নে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের প্রতিক্রিয়া কী বার্তা দেয়?

সাদী মুহাম্মাদ আলোক
সাদী মুহাম্মাদ আলোক

সম্প্রতি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়া হুমায়ুন কবিরের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগে তিনি বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না, তা নিয়ে এখনো পরিষ্কার কোনো বার্তা পাওয়া যায়নি।

যদিও মঙ্গলবার আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, সরকার সংবিধান মেনেই পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরকে নিয়োগ দিয়েছে। তবে তিনি দ্বৈত নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না, সে বিষয়ে সরাসরি উত্তর দেননি আইনমন্ত্রী।

নাগরিকত্ব নিয়ে সোমবার সাংবাদিকরা জানতে চাইলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির উল্টো প্রশ্ন করেন—বিষয়টি নিয়ে কে নিউজ করেছে। বলেন, ‘...কোন নিউজপেপার? কার এত জ্বালা যে মানে কাজ করতে দেবে না, হ্যাঁ? তো তার জ্বালা কেন হচ্ছে? তার কি ২০০৮-এর জ্বালা উঠেছে নাকি আবার? মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনের জ্বালা উঠছে তার আবার? নাকি?’

রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল জায়গায় থাকা ব্যক্তির এমন প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্য কী বার্তা দেয়?

অধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা বলছেন, প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির কাছ থেকে এই ধরনের মন্তব্য প্রকৃতপক্ষে ‘ঔদ্ধত্যের’ বহিঃপ্রকাশ। তার নাগরিকত্ব নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, সেটির উত্তর দেওয়ার পরিবর্তে তিনি যেভাবে উল্টো প্রশ্ন করলেন, সেটা ‘দায়িত্বশীল আচরণ নয়’।

‘পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন’ শিরোনামে গত ২৩ আগস্ট প্রতিবেদন প্রকাশ করে প্রথম আলো। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, হুমায়ুন কবির যুক্তরাজ্যের নাগরিক এবং দেশটির লেবার পার্টির রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার আগে তিনি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগের (রিনাউন্স) আবেদন করেছেন কি না, সেই তথ্য বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর কাছে নেই।

প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার আগে তিনি একই পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা (পররাষ্ট্র) ছিলেন।

বাংলাদেশ সংবিধানের ৫৬ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপ-মন্ত্রীদিগকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দান করিবেন। তবে শর্ত থাকে যে, তাঁহাদের সংখ্যার অন্যূন নয়-দশমাংশ সংসদ-সদস্যগণের মধ্য হইতে নিযুক্ত হইবেন এবং অনধিক এক-দশমাংশ সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইবার যোগ্য ব্যক্তিগণের মধ্য হইতে মনোনীত হইতে পারিবেন।’

সংবিধানের ৬৬ (২) (গ) অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘কোন ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হইবার এবং সংসদ-সদস্য থাকিবার যোগ্য হইবেন না, যদি তিনি কোন বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন কিংবা কোন বিদেশী রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করেন।’

ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে নিন্দা ও উদ্বেগ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর এ ধরনের পাল্টা প্রশ্নকে ‘শুট দ্য মেসেঞ্জার’ প্রবণতার দৃষ্টান্ত এবং মুক্ত গণমাধ্যম ও জনগণের তথ্য জানার অধিকারের প্রতি হুমকি বলে উল্লেখ করেছে।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, টেকনোক্র্যাট কোটায় দ্বৈত নাগরিকত্বধারীর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ অসাংবিধানিক। দ্বৈত নাগরিকত্ব বহাল থাকা অবস্থায় টেকনোক্র্যাট কোটায় তার নিয়োগ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ বিষয়ে স্বচ্ছতার সঙ্গে নিজের অবস্থান প্রকাশ না করে প্রতিমন্ত্রীর পদ গ্রহণের মাধ্যমে তিনি নিজেকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।

‘সংবাদকর্মীরা বিষয়টি নিয়ে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করলে প্রতিমন্ত্রী সরাসরি উত্তর না দিয়ে “কে নিউজ করছে” এবং “কার এত জ্বালা” বলে পাল্টা প্রশ্ন করেছেন। সংবাদটি কে করেছে বা কে প্রশ্ন তুলেছে, তা মূল বিষয় নয়; মূল প্রশ্ন হলো, প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের সময় তার বিদেশি নাগরিকত্ব বহাল ছিল কি না। এমন সাংবিধানিক ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেওয়া তার দায়িত্ব।’

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রয়োজনীয় তথ্য ও প্রমাণ প্রকাশের মাধ্যমে প্রতিমন্ত্রী স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারতেন। তা না করে গণমাধ্যম ও সংবাদকর্মীদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করা শোভনীয় নয়; বরং অনৈতিক ও উদ্বেগজনক। এ ধরনের প্রতিক্রিয়া মুক্ত গণমাধ্যম, বাকস্বাধীনতা ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থী এবং এতে জনগণের তথ্য জানার অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, সরকারের উচিত অবিলম্বে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে সঠিক ও প্রামাণ্য তথ্য প্রকাশ এবং তার নিয়োগের সাংবিধানিক বৈধতার বিষয়ে যথাযথ সিদ্ধান্ত নেওয়া। তিনি যদি নাগরিকত্ব রিনাউন্স না করে থাকেন, তাহলে সেটি সংবিধানের পরিপন্থী ও আইনের লঙ্ঘন। আর রিনাউন্স করে থাকলে সেটি প্রকাশ করতে তার দ্বিধার কারণ নেই। ‘কে প্রতিবেদন করেছে, কেন এত জ্বালা?’—এ ধরনের ন্যারেটিভ কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, মুক্ত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানুষের জানার অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কাছ থেকে এই ধরনের মন্তব্য ও প্রতিক্রিয়া প্রত্যাশিত নয় বলে মন্তব্য করেছেন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য, অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘যিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন, প্রচলিত আইন ও সংবিধানের বিধিবিধান মেনে তার কথা বলা ও দায়িত্ব পালন করা উচিত। তাকে যখন একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে, তখন সেই প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর দেওয়াই তার দায়িত্ব।’

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে প্রতিনিধিত্ব করবেন। অথচ দেশের মধ্যেই যদি তার নিজের পরিচয় ও নাগরিকত্ব নিয়ে ওঠা প্রশ্নের বিষয়ে তিনি স্বচ্ছভাবে অবস্থান পরিষ্কার করতে না পারেন, তাহলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তিনি কীভাবে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করবেন—সেটি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

তিনি আরও বলেন, তার এই প্রতিক্রিয়া একটি ভুল বার্তা দেয়। এতে মনে হয়, সরকারের মন্ত্রীরা সমাজে কোনো প্রশ্ন উঠলে বা কোনো সংবাদমাধ্যম কোনো বিষয়ে জানতে চাইলে স্বচ্ছভাবে জবাব দিতে প্রস্তুত নন। একইসঙ্গে এ ধরনের মন্তব্য এক ধরনের ঔদ্ধত্যেরও প্রকাশ ঘটায়, যা গণতান্ত্রিক সরকারের গণতান্ত্রিক আচরণের পরিচয় বহন করে না। আমি মনে করি, তার উচিত বিষয়টি পরিষ্কার করা এবং এ ধরনের মন্তব্য করার জন্য দুঃখ প্রকাশ করা।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক বলেন, কে নিউজ করল বা করল না, তার চেয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আইনগত অবস্থান অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হওয়ার সাংবিধানিক যোগ্যতা আছে কি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। তিনি যদি যুক্তরাজ্যের নাগরিক হয়ে থাকেন, তাহলে দায়িত্বশীল সাংবিধানিক পদে থাকার ক্ষেত্রে যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা এড়িয়ে গিয়ে সংবাদকর্মীকে দোষারোপ করা তার দক্ষতা ও যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।

‘তিনি যদি দ্বৈত নাগরিক হন, তাহলে বাংলাদেশের সংবিধানের আওতায় মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তিনি নিশ্চিতভাবে অযোগ্য। তিনি যদি সত্যিই ব্রিটিশ নাগরিক হয়ে থাকেন, তাহলে এ পদে তার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকে। এমনকি প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তিনি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করলেও, তার আগে যতদিন তিনি ওই পদে ছিলেন, সে সময় তিনি বেআইনি বা অসাংবিধানিকভাবে পদে ছিলেন কি না—সেই প্রশ্ন থেকেই যাবে।

শাহদীন মালিক আরও বলেন, সরকারের বিভিন্ন নিয়োগ নিয়েও অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠছে। এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকার সুচিন্তিতভাবে সিদ্ধান্ত না নিয়ে অনেকটা তাড়াহুড়া করছে বলে মনে হচ্ছে। এ ধরনের নিয়োগ সরকারের ভাবমূর্তির জন্য সহায়ক নয়।