নীল নদ থেকে যেভাবে মেস-বাড়ির ফ্রাইপ্যানে এলো তেলাপিয়া

স্টার অনলাইন ডেস্ক

সস্তার প্রোটিন দাতা, নাকি নদী-বিলের বাস্তুতন্ত্রের আন্তর্জাতিক ত্রাস? জাপানি রাজপ্রাসাদের উপহার থেকে মেসের ফ্রাইপ্যানে আসার পেছনে রয়েছে তেলাপিয়ার এক রোমাঞ্চকর ইতিহাস।

ঢাকার যেকোনো ব্যাচেলর মেস কিংবা সাধারণ মধ্যবিত্তের বাজারের থলেতে যে মাছটি সবচেয়ে বিশ্বস্ততার সঙ্গে জায়গা করে নেয়, তার নাম তেলাপিয়া। কাঁচাবাজারে ইলিশের দাম যখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে, আর রুই-কাতলা যখন বিশেষ কোনো উৎসবের খোরাক, তখন কম খরচে মেসের বাসিন্দা থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে তেলাপিয়ার জুড়ি মেলা ভার।

কিন্তু প্রতিদিনের পাতে থাকা এই সাধারণ চ্যাপ্টা মাছটির সঙ্গে যে জড়িয়ে আছে নীল নদের রাজকীয় আভিজাত্য, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বৈশ্বিক খাদ্যসংকট এবং আধুনিক জেনেটিক্সের রোমাঞ্চকর গল্প, তা গরম তেলে মাছভাজার ধোঁয়ায় অনেকটাই ঢাকা পড়ে যায়।

কীভাবে আফ্রিকার কাদামাটি থেকে যাত্রা শুরু করে তেলাপিয়া বিশ্ববাজারে জায়গা করে নিল, আর কেনই বা একইসঙ্গে এটি কোটি মানুষের খাদ্যনিরাপত্তার নায়ক এবং উন্মুক্ত জলাশয়ের বাস্তুতন্ত্রের চিহ্নিত ভিলেন হয়ে গেল?

ফারাও থেকে সেন্ট পিটার

তেলাপিয়ার আদি নিবাস মূলত আফ্রিকা মহাদেশ ও মধ্যপ্রাচ্যের নীল নদ অববাহিকা। প্রাচীন মিশরীয় প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা এবং নীল নদের উপকূলীয় সমাধিগাত্রের দেয়ালচিত্র থেকে জানা যায়, আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগেই এই মাছ মিশরীয়দের খাদ্য ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।

কায়রো ও লুক্সরের প্রাচীন সমাধিফলকে আঁকা চিত্রে তেলাপিয়াকে ‘ইন্ত’ নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রাচীন মিশরীয়রা বিশ্বাস করত, এই মাছ সৃষ্টির দেবতা ‘রা’-এর সূর্যতরী পাহারা দেয়। তাই তৎকালীন সমাজে তেলাপিয়াকে উর্বরতা ও পুনর্জন্মের প্রতীক হিসেবে দেখা হতো।

মাছটির এই আধ্যাত্মিক সুনামের পেছনে অবশ্য রয়েছে একটি নিখাদ জীববৈজ্ঞানিক কারণ। জীববিজ্ঞানের পরিভাষায় তেলাপিয়া হলো মুখে পোনা আগলে রাখা মাছ বা মাউথব্রুডার। মা তেলাপিয়া ডিম ফুটে বের হওয়া সদ্যোজাত পোনাগুলোকে বিপদের সময় নিজের মুখের ভেতর লুকিয়ে রাখে। চারপাশ নিরাপদ মনে হলে আবার মুখ খুলে পোনাগুলোকে বের করে দেয়।

পানির নিচের এই বৈজ্ঞানিক আচরণের ব্যাখ্যা না বুঝে প্রাচীন মিশরীয়রা ভাবত, মাছটি বুঝি মুখ থেকেই অলৌকিকভাবে নতুন জীবনের জন্ম দিচ্ছে।

মিশরীয় লোকগাথি পেরিয়ে তেলাপিয়ার প্রবেশ ঘটে বাইবেলের পাতাতেও।

নিউ টেস্টামেন্টের ঐতিহাসিক বিবরণ ও মধ্যপ্রাচ্যের মৎস্যবিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুসারে, গ্যালিলি সাগরে প্রেরিত সেন্ট পিটার বড়শিতে যে মাছটি ধরেছিলেন এবং যিশু খ্রিষ্ট যে মাছ দিয়ে হাজারো ক্ষুধার্ত মানুষের পেট ভরিয়েছিলেন বলে ধর্মগ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে, তা মূলত তেলাপিয়া গোত্রের মাছ।

এই ঐতিহাসিক সূত্র ধরেই পশ্চিমা বিশ্বে তেলাপিয়াকে অনেক জায়গায় ‘সেন্ট পিটারের মাছ’ নামেও খাবার টেবিলে পরিবেশন করা হয়।

যুদ্ধের পর বিশ্বজয়

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত তেলাপিয়া মূলত আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বুনো জলাশয়েই সীমাবদ্ধ ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তীব্র খাদ্যসংকট এর ভাগ্য বদলে দেয়।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ঐতিহাসিক মৎস্যবিষয়ক গবেষণা নথি অনুযায়ী, যুদ্ধের পর বিশ্বজুড়ে প্রোটিনের ঘাটতি দেখা দিলে গবেষকেরা এমন একটি জলজ প্রাণীর সন্ধান করছিলেন, যা প্রতিকূল পরিবেশেও দ্রুত বংশবৃদ্ধি করতে পারে এবং সস্তা খাবারেও বেঁচে থাকতে পারে।

আফ্রিকার খনি শ্রমিকদের কম খরচে পুষ্টি জোগাতে ঔপনিবেশিক শাসকেরা যে মাছের কৃত্রিম চাষের পরীক্ষা চালিয়েছিল, সেটিই পরে আন্তর্জাতিক ত্রাণ ও টেকসই উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) আওতায় এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

তবে আধুনিক তেলাপিয়া চাষের ইতিহাসে বড় মোড় আসে ১৯৬৫ সালে।

থাইল্যান্ডের মৎস্য বিভাগ ও সে দেশের রাজকীয় নথি অনুযায়ী, ওই বছরের মার্চে জাপানের তৎকালীন যুবরাজ এবং পরবর্তী সম্রাট আকিহিতো থাইল্যান্ড সফর করেন। খ্যাতিমান মৎস্যবিজ্ঞানী ও সম্রাট আকিহিতো থাইল্যান্ডের রাজা নবম ভূমিবল অতুল্যতেজকে ৫০টি নীল নদের তেলাপিয়া উপহার দেন।

রাজা ভূমিবল ব্যাংককের রাজপ্রাসাদের পুকুরে মাছগুলোর নিবিড় প্রজনন করান। দ্রুত বৃদ্ধি ও পুষ্টিগুণে মুগ্ধ হয়ে তিনি মাছটির নাম দেন ‘প্লা নিল’, যার অর্থ থাই ভাষায় নীল নদের মাছ। পরে থাই রাজপ্রাসাদ থেকে এই মাছের পোনা সারা দেশের গ্রামীণ কৃষকদের মধ্যে বিনা মূল্যে বিতরণ করা হয়।

থাইল্যান্ডের সেই রাজকীয় পুকুর থেকেই মূলত এশিয়াজুড়ে আধুনিক নাইল তেলাপিয়া চাষের বিস্তার শুরু হয়।

বাংলাদেশে প্রথম ব্যর্থতা

বাংলাদেশে তেলাপিয়ার আগমনও খুব একটা মসৃণ ছিল না।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ও সরকারি মৎস্য অধিদপ্তরের নথি অনুযায়ী, ১৯৫৪ সালে জাতিসংঘের সহায়তায় থাইল্যান্ড থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম আনা হয় মোজাম্বিক তেলাপিয়া।

কিন্তু এই মাছ বাঙালি ভোজনরসিকদের মন জয় করতে পারেনি। ছোট আকার, কালচে রং এবং পুকুরে ছাড়ার পর নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ডিম পেড়ে জলাশয় অপরিপক্ব ছোট মাছে ভরে ফেলার কারণে চাষিরা একে কার্যত পুকুরের আগাছা মনে করতেন।

এরপর ১৯৭৪ সালে সরাসরি থাইল্যান্ড থেকে উন্নত জাতের নাইল তেলাপিয়া আমদানি করা হয়। তবে বাংলাদেশের তেলাপিয়া চাষে বড় বিপ্লব আসে নব্বইয়ের দশকে।

ফিলিপাইনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্ব মাছ গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন দেশ থেকে সংগৃহীত তেলাপিয়ার বুনো ও খামারি জাতের মধ্যে কৃত্রিম প্রজনন ঘটিয়ে তৈরি করা হয় দ্রুত বর্ধনশীল একটি বিশেষ জাত। এর নাম জিনগতভাবে উন্নত খামারি তেলাপিয়া, সংক্ষেপে ‘গিফট’ জাত।

১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট এই বিশেষ জাত দেশে নিয়ে আসে এবং বাংলাদেশের আবহাওয়ার উপযোগী করে তোলে। সাধারণ জাতের তুলনায় এটি প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ দ্রুত বাড়ে।

এর পর যুক্ত হয় আধুনিক মৎস্যবিজ্ঞানের আরেক গুরুত্বপূর্ণ কৌশল—পুরুষ তেলাপিয়া বা মনোসেক্স চাষ।

পুরুষেই চাষের সাফল্য

গবেষণায় দেখা যায়, সাধারণ পুকুরে পুরুষ ও স্ত্রী তেলাপিয়া একসঙ্গে থাকলে তারা খাবার খেয়ে বড় হওয়ার চেয়ে বংশবৃদ্ধি ও প্রতিযোগিতায় বেশি শক্তি ব্যয় করে। তাছাড়া পুরুষ তেলাপিয়া স্ত্রী মাছের তুলনায় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ দ্রুত বাড়ে এবং ওজনে ভারী হয়।

এই সমস্যা এড়াতে কৃত্রিম হ্যাচারিতে ডিম ফোটার পরপরই রেণু পোনাকে বিশেষ খাদ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পুরুষ তেলাপিয়ায় রূপান্তর করা হয়। এভাবে মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষের ফলে মাত্র চার থেকে পাঁচ মাসে প্রতিটি মাছ ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রামের বাণিজ্যিক ওজনে পৌঁছাতে পারে।

এই দ্রুত বর্ধনশীল জাত ও মনোসেক্স চাষপদ্ধতির ওপর ভর করেই বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ তেলাপিয়া উৎপাদনকারী দেশগুলোর কাতারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।

পুষ্টি ও অর্থনীতির দিক থেকে তেলাপিয়া যদি উন্নয়নশীল বিশ্বের খাদ্যনিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হয়, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের বিচারে এর বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকাও দীর্ঘ।

আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থার বৈশ্বিক আক্রমণাত্মক প্রজাতি তথ্যভাণ্ডারে মোজাম্বিক তেলাপিয়াকে বিশ্বের একশত শীর্ষ ক্ষতিকর আক্রমণাত্মক প্রজাতির একটি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

বন্যা বা অসাবধানতার কারণে কোনো বদ্ধ খামার থেকে তেলাপিয়া প্রাকৃতিক নদী, হাওর কিংবা উন্মুক্ত বিলে ছড়িয়ে পড়লে তা স্থানীয় জলজ পরিবেশের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। আন্তর্জাতিক মৎস্য ও পরিবেশবিজ্ঞানবিষয়ক গবেষণা সাময়িকীগুলোর তথ্য থেকে কয়েকটি ঝুঁকির কথা জানা যায়।

প্রথমত, মাউথব্রুডিং স্বভাবের কারণে তেলাপিয়ার ডিম ও পোনা প্রাকৃতিক শিকারিদের হাত থেকে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সুরক্ষা পায়। বিপরীতে রুই, কাতলা, মলা, ঢেলা বা খলসের মতো দেশি মাছের ডিম খোলা পানিতে থাকায় সেগুলোর বড় অংশ অন্য মাছের খাদ্যে পরিণত হয় বা নষ্ট হয়ে যায়। ফলে অনুকূল পরিবেশে তেলাপিয়া দ্রুত সংখ্যায় বাড়তে পারে এবং উন্মুক্ত জলাশয়ে দেশি মাছের সঙ্গে খাদ্য ও জায়গার প্রতিযোগিতা তৈরি করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, যুক্তরাজ্যের মাছ জীববিজ্ঞানবিষয়ক একটি জার্নালের গবেষণায় দেখা যায়, প্রজনন মৌসুমে পুরুষ তেলাপিয়া জলাশয়ের তলদেশের কাদা খুঁড়ে বড় বড় বৃত্তাকার গর্ত তৈরি করে। এতে পানির নিচের শেকড়যুক্ত জলজ ঘাস ও গাছপালা উপড়ে যেতে পারে। এসব উদ্ভিদ ছিল অন্যান্য দেশি মাছের ডিম পাড়ার ও আশ্রয়ের জায়গা।

তৃতীয়ত, তলদেশের মাটি ক্রমাগত আলোড়িত হলে কাদার নিচে জমে থাকা বিভিন্ন খনিজ উপাদান পানিতে মিশতে পারে। এর ফলে ক্ষতিকর শেওলার অতিরিক্ত বৃদ্ধি ঘটতে পারে, যা পানির দ্রবীভূত অক্সিজেন কমিয়ে দেশি মাছের জন্য প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে।

চতুর্থত, আন্তর্জাতিক জৈব আক্রমণবিষয়ক গবেষণা সাময়িকীর তথ্য অনুযায়ী, সর্বভুক তেলাপিয়া পানির ক্ষুদ্র উদ্ভিদ, পোকামাকড় ও তলদেশের নানা খাদ্য উপাদান খায়। ফলে স্থানীয় প্রজাতির মাছের সঙ্গে খাবারের জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে।

এক মাছ, দুই রূপ

তাহলে দিন শেষে তেলাপিয়া আমাদের কাছে কী?

প্রকৃতপক্ষে, তেলাপিয়া নিজের ইচ্ছায় নীল নদ ছেড়ে আমাদের পুকুরে আসেনি। মানুষই পেটের তাগিদ ও বাণিজ্যিক লাভের আশায় একে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততার এই সময়ে, যখন অন্যান্য মাছের চাষ কঠিন হয়ে পড়ছে, তেলাপিয়ার চরম সহনশীলতা কোটি মানুষের পুষ্টির জোগান নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তাই তেলাপিয়াকে এক কথায় নায়ক বা ভিলেন বলা কঠিন। মানুষের নিয়ন্ত্রিত পুকুরে এটি সস্তা ও সহজলভ্য প্রোটিনের উৎস। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উন্মুক্ত জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়লে একই মাছ স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।