যে রাস্তা ফেরে কিয়ারোস্তামির কাছেই
একটা ছেলে দৌড়াচ্ছে। পাহাড়ের গায়ে আঁকাবাঁকা একটা রাস্তা, উপর থেকে নিচে নেমে গেছে জিগজ্যাগ আকারে। আহমেদ নামের ছোট্ট ছেলেটা ছুটছে বন্ধুর খাতা ফিরিয়ে দিতে। ক্যামেরা স্থির, দূর থেকে ধরা। ছেলেটা ছোট হতে হতে বিন্দুর মতো হয়ে যায়, তারপর আবার বড় হতে থাকে। দৃশ্যটা মোটে কয়েক সেকেন্ডের। অথচ ১৯৮৭ সালের ‘খানে-ই দুস্ত কোজাস্ত?’ বা ‘হোয়্যার ইজ দ্য ফ্রেন্ডস হোম?’ সিনেমার এই একটা শটের ভেতরেই গোটা কোকার ত্রয়ীর বীজ লুকিয়ে ছিল, যদিও তখন কেউ জানত না সেটা।
আব্বাস কিয়ারোস্তামি জানতেন না তিনি ত্রয়ী বানাচ্ছেন। কেউ জানত না। এমনকি ইরানের যে গ্রামবাসীদের নিয়ে, যাদের ভেতরে তিনি এই গল্পগুলো খুঁড়ে বের করেছিলেন, তারাও না।
প্রথম সিনেমাটা ছিল নিরীহ এক নৈতিক গল্প। ভুল করে বন্ধুর নিয়ে আসা খাতা ফেরত দেওয়ার দায়, আর তা না দিতে পারলে স্কুল থেকে বহিষ্কারের ভয়। কোকার নামের ছোট্ট গ্রামে শ্যুট হয়েছিল সিনেমাটি, উত্তর ইরানের পাহাড়ি অঞ্চলে।
তিন বছর পর ১৯৯০ সালে ঠিক সেই গ্রামেই আঘাত হানে মাঞ্জিল-রুদবার ভূমিকম্প। হাজার হাজার মৃত্যু। গোটা একটা জনপদ এক রাতে মুছে যায় মানচিত্র থেকে। কিয়ারোস্তামি গাড়ি নিয়ে ফিরে যান ধ্বংসস্তূপের ভেতর, খুঁজতে থাকেন তার ছবির শিশু-অভিনেতাদের, যারা বেঁচে আছে কি না জানা নেই তখনো। এই খোঁজ থেকেই ১৯৯২ সালে জন্ম নেয় ‘জিন্দেগি ভা দিগার হিচ’ বা ‘অ্যান্ড লাইফ গোজ অন’। আর তার দুই বছর পর ১৯৯৪ সালে ‘জির-এ দারাখতান-এ জেইতুন’ বা ‘থ্রু দ্য অলিভ ট্রিজ’। যেখানে দ্বিতীয় সিনেমার শ্যুটিংটাই হয়ে যায় তৃতীয়টির গল্প। তিন সিনেমা একে অপরের গায়ে গায়ে লেগে আছে, যেন একই দেহের তিনটে অঙ্গ।
তিনটে আলাদা সিনেমা। আলাদা মুখ, আলাদা সময়। কিন্তু একই রাস্তা ফিরে ফিরে আসে, পাহাড়ের গায়ে সেই আঁকাবাঁকা পথ, যা শুধু একটা লোকেশন নয়।
আহমেদের খোঁজ ছিল সরল। এক নির্দিষ্ট বাড়ি, এক নির্দিষ্ট বন্ধু, নেমাতলহ নাম তার। কিন্তু পথে বাধা একের পর এক। বাবা তাকে রুটি আনতে পাঠান, ছেলে তখন বন্ধুর বাড়ি খোঁজার তাড়ায়, অথচ বাবার নির্দেশ অমান্য করার সাহস তার নেই। একটা বুড়ো লোক তাকে ভুল দিক দেখায় বা হয়তো ঠিক দিকই দেখায় কিন্তু বুড়োর কথা বলার ধরনেই আহমেদ আস্থা হারায়। জিগজ্যাগ রাস্তা এখানে নিছক ভূদৃশ্য নয়। প্রতিটা বাঁকে একটা করে প্রতিবন্ধক, একটা করে সিদ্ধান্তের মুহূর্ত, ছোট্ট এক শিশুর কাঁধে যে ভার বড়রা টের পায় না।
দ্বিতীয় সিনেমায় রাস্তাটা আর সুন্দর থাকে না। ফাটল, ধ্বংসস্তূপ, রাস্তার পাশে উলটে পড়ে থাকা গাড়ি। পরিচালক আর তার ছেলে গাড়িতে চড়ে খুঁজছেন আহমেদকে। পথে এক বৃদ্ধের সঙ্গে দেখা হয়, যে নিজের ছেলেকে হারিয়েছে ভূমিকম্পে। লোকটা গাড়িতে উঠে বসে। আর তখনই একটা বিষয় উঠে আসে কথোপকথনে। মৃতের জন্য বসে থাকলে জীবিতের প্রতি অবিচার হয়, জীবন থামে না, এগোতেই হয়। কথাটা সহজ, প্রায় প্রবাদের মতো শোনায়। কিন্তু পুরো সিনেমাটার ভার এসে পড়ে এই একটা সংলাপে। গাড়ির ভেতরের শট, উইন্ডস্ক্রিনের ফ্রেমের ভেতর আরেকটা ফ্রেম, রাস্তার বাঁকে বাঁকে দেখা যায় বিধ্বস্ত মানুষ আর তাদের ফেলে আসা ঘরবাড়ি। এখানেই প্রথমবার পরিণত হয়ে ওঠে কিয়ারোস্তামির ভাষা।
তিনি জানতেন না আহমেদ বেঁচে আছে কি না। অথচ সিনেমা বানিয়ে ফেললেন সেই না-জানা নিয়েই। কোথাও একটা দেয়াল ভেঙে যায়, ফিকশন আর বাস্তবের মধ্যে যে দেয়াল থাকার কথা। ধ্বংসস্তূপের ভেতর একজন বুড়ো লোক টিভি অ্যান্টেনা সারাচ্ছে, যাতে বিশ্বকাপ ফুটবল দেখা যায়। দৃশ্যটা হাস্যকর শোনাতে পারত। কিন্তু হাস্যকর লাগে না। বরং এই একটা শটেই গোটা সিনেমার শিরোনাম যেন সত্যি হয়ে ওঠে। জীবন চলে যায়, কিছু থামায় না তাকে।
তৃতীয় সিনেমা জটিলতাকে আরও গভীরে নিয়ে যায়। এখানে আমরা দেখি দ্বিতীয় সিনেমার শ্যুটিং চলছে। এক তরুণ, হোসেইন, পেশায় রাজমিস্ত্রি, তার বিপরীতে অভিনয় করা মেয়ে তাহেরেহকে বিয়ে করতে চায়। মেয়ের পরিবার রাজি নয়, হোসেইন গরিব, নিরক্ষর, ঘরবাড়ি নেই। পরিচালক একটা শট নিচ্ছেন বারবার, একই দৃশ্য একই ভুল। রিটেকের ফাঁকে ফাঁকে তাহেরেহর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে যায় হোসেইন। কিন্তু মেয়েটা তার দিকে ফিরেও তাকায় না। এক জায়গায় হোসেইন পরিচালককে যুক্তি দেয়, জমির মালিক যদি কেবল মালিকের সঙ্গেই বিয়ে করে, ধনী কেবল ধনীর সঙ্গে, নিরক্ষর কেবল নিরক্ষরের সঙ্গে, তবে দুনিয়া বদলাবে কীভাবে। কোনো নাটকীয়তা নেই এই সংলাপে। গলার স্বর উঁচু হয় না। তবু পুরো শ্রেণিবিভেদের কাঠামোটা একনিমেষে খুলে যায়, যেন কেউ একটা পর্দা সরিয়ে দিলো।
শেষ শটটা নিয়েই যত আলোচনা, যত লেখা। হোসেইন হাঁটছে জলপাই বাগানের ভেতর দিয়ে, তাহেরেহর পেছনে পেছনে, মেয়েটার হাতে ফুলের টব। ক্যামেরা ক্রমশ দূরে সরে যায়, উপর থেকে ধরা এক্সট্রিম লং শটে, প্রায় তিন মিনিট ধরে। সংলাপ শোনা যায় না, মিলিয়ে যায় সুরের সঙ্গে। দুটো সাদা বিন্দু পাহাড়ের গায়ে আঁকাবাঁকা সবুজ পথে কখনো কাছে আসছে, কখনো দূরে যাচ্ছে। বোঝার উপায় নেই কী ঘটছে। তাহেরেহ এক মুহূর্ত থামে। ফিরে তাকায় হোসেইনের দিকে। তারপর হোসেইন দৌড়ে ফেরে, পথ ছেড়ে, সোজা ঘাসের ভেতর দিয়ে, যেন তার আর তাড়া নেই কোনো নির্দিষ্ট রাস্তা মেনে চলার। উত্তরটা কী ছিল, বলেন না কিয়ারোস্তামি। বলতেই হবে এমন কোনো নিয়মও নেই!
প্রথম সিনেমার শেষেও তাই। আহমেদ বন্ধুর খাতায় একটা ফুল রেখে আসে। কোনো সংলাপ নেই। শুধু সকালের আলো আর শুকনো ফুল একটা পাতার ভাঁজে। তিন সিনেমাতেই শেষদৃশ্য গড়ে ওঠে নৈঃশব্দ্য আর দূরত্বে, চিৎকার নেই, কান্না নেই, ব্যাখ্যা নেই।
কিয়ারোস্তামি নিজেও বদলে যান এই তিন সিনেমাজুড়ে, যদিও বদলটা চোখে পড়ার মতো নয়। প্রথম ছবিতে তিনি শুধু দূরের এক পর্যবেক্ষক, ক্যামেরার পেছনে অদৃশ্য মানুষ। তারপর ভূমিকম্প আসে এবং নিজের তৈরি গল্পের ভেতরেই তাকে ঢুকে পড়তে হয় খোঁজার ভূমিকায়। পর্দায় তার বিকল্প রূপ ফিরে যায় কোকারে, নিজের সৃষ্টির দায় নিতে, প্রশ্ন করতে নিজেকেই—শিশুরা কি আদৌ বেঁচে আছে, যাদের নিয়ে তিনি একটা সিনেমা বানিয়েছিলেন নিরাপদ দূরত্ব থেকে।
আর সেই দ্বিতীয় সিনেমার শ্যুটিং, ক্যামেরা যেখানে রাখা ছিল, অভিনেতারা যেভাবে দাঁড়িয়েছিল, সবকিছু হুবহু ফিরে আসে তৃতীয় সিনেমায়। কিন্তু এবার কিয়ারোস্তামি আর আড়াল করেন না নিজের ভূমিকা। দেখিয়ে দেন একজন পরিচালক কীভাবে অন্যের ব্যক্তিগত যন্ত্রণা থেকে নিজের শিল্প বানান। হোসেইনের প্রেম, তাহেরেহর নিঃশব্দতা, সবটাই তার ক্যামেরার খাদ্য, আর তিনি সেই অস্বস্তিকর জায়গাটা থেকে সরে যান না। এমনকি প্রথম সিনেমার স্কুলশিক্ষকের চরিত্রটাও ফিরে আসে দ্বিতীয় সিনেমায়, অন্য প্রসঙ্গে, অন্য কাজে, যেন কোকার নামের জায়গাটা নিজেই একটা চরিত্র, যাকে বারবার ডাকা যায় গল্পে।
প্রথম সিনেমায় তিনি জানতেন গল্পের শেষ কোথায়, কারণ গল্পটা তার নিজের লেখা। দ্বিতীয় সিনেমায় এই জানাটাই হারিয়ে যায়, ভূমিকম্প তার চিত্রনাট্যের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায়, আর তাকে মেনে নিতে হয় বাস্তবতা যা বলে তাই। তৃতীয় সিনেমায় এসে তিনি একটা সিদ্ধান্ত নেন, অনেকটা ইচ্ছাকৃতভাবেই উত্তরহীনতাকে বেছে নেওয়া। দর্শকের কাছে গল্প শেষ করার ভারটা ছেড়ে দেন। যেন বলতে চান, বাস্তব জীবনে কোনো পরিচালক থাকে না শেষদৃশ্য লিখে দেওয়ার।
জিগজ্যাগ রাস্তা শেষমেশ সোজাসুজি কোথাও পৌঁছায় না। বরং ঘুরে আসে নিজের কাছেই, আহমেদের দৌড় থেকে হোসেইনের দৌড়ে, এক শিশুর দায়িত্ব থেকে এক তরুণের প্রেমের আকুতিতে। পথ চলতে থাকাটাই বোধহয় গন্তব্য। আর প্রতিটা বাঁকে যে অনিশ্চয়তা অপেক্ষা করে থাকে, সম্ভবত সেটাই সবচেয়ে সৎ উত্তর, যা দিতে পারে সিনেমা।