যে স্বপ্নের শেষ দৃশ্য লেখা বাকি ছিল জহির রায়হানের
১৯৫৭ সালের কথা। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ অবলম্বনে এ জে কারদার নির্মাণ করছেন ‘জাগো হুয়া সাভেরা’। সিনেমাটির সহকারীদের একজন তরুণ জহির রায়হান। প্রকৃত নাম মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ। কিন্তু লেখক হিসেবে তিনি ব্যবহার করছেন ‘জহির রায়হান’ নামটি। তখনো কেউ জানত না, এই নামটি একদিন বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আলাদা একটি অধ্যায়ের নাম হয়ে উঠবে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন জহির। লিখেছিলেন ‘ওদের জানিয়ে দাও’-এর মতো কবিতা। চলচ্চিত্রকে তিনি শুধু বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখতেন না, দেখতে চেয়েছিলেন সময়ের চলমান চিত্র হিসেবে।
‘জাগো হুয়া সাভেরা’র কাজ করতে গিয়ে তার সামনে খুলে গেল এক নতুন জগৎ। সেখানে তিনি পেলেন ওয়াল্টার ল্যাসালি, ফয়েজ আহমদ ফয়েজ, তৃপ্তি মিত্র, খান আতাউর রহমানের মতো মানুষদের। চলচ্চিত্র যে কেবল ক্যামেরা আর গল্পের সমষ্টি নয়, বরং সমাজ ও সময়কে দেখারও একটি ভাষা—সেই বোধের ভিত তখনই তৈরি হচ্ছিল।
জহির রায়হানের ভাবনাটি ছিল সহজ, কিন্তু গভীর। একটি বই লেখা হলে সেটি সবাই পড়ে না। কিন্তু সেই বইটিকে যদি চলচ্চিত্রে রূপ দেওয়া যায়, তাহলে একই গল্প একসঙ্গে অনেক মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। তাই বৃহৎ গণমাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্রের শক্তিকেই তিনি বেছে নিলেন।
শুরু থেকেই তার সিনেমায় ছিল নিরীক্ষার প্রবণতা। ‘কখনো আসেনি’ (১৯৬১) চলচ্চিত্রে জাদুঘরের সেই নারীচরিত্র—যাকে মুক্ত করতে কেউ কখনো আসে না—ছিল এক অদ্ভুত, বিষণ্ণ প্রতীক। পাশাপাশি ছিল একটি পরিবারের অভাব, মৃত্যু এবং বাস্তবতার ভেতরে প্রায় অবাস্তব এক আবহ। গল্প বলার এই ভঙ্গিতে ম্যাজিক রিয়ালিজমের ছায়াও দেখা যায়।
‘কাঁচের দেয়াল’ (১৯৬৩) সিনেমায় তিনি দেখালেন আরেক ধরনের বাস্তবতা। একটি অনাথ মেয়ে হঠাৎ লটারি জিতে বিপুল অর্থের মালিক হয়ে যায়। অর্থ তার জীবন বদলে দেয়, কিন্তু সমস্যাগুলো শেষ করে না। বরং নতুন অর্থ নতুন প্রশ্ন নিয়ে আসে। টাকা থাকলেই মানুষের সমস্ত সংকটের সমাধান হয় না—জহির সেই সরল সত্যটিকেই গল্পের ভেতর দিয়ে সামনে আনলেন।
তবে এই সময় পর্যন্ত তার সিনেমাগুলো বাণিজ্যিকভাবে খুব বেশি সফল হয়নি। কিন্তু তাতে তার ভাবনার জায়গাটি বদলায়নি। বরং তিনি আরও পরিষ্কারভাবে বুঝতে শুরু করলেন, গণমানুষের কথা বলতে চাইলে চলচ্চিত্রের অর্থনীতি ও বাজারের কথাও বুঝতে হবে।
চলচ্চিত্রের প্রযোজনা ও পরিবেশনা ব্যয়বহুল। ফলে সাধারণত এই মাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে সম্পদশালী মানুষের। কিন্তু যে শিল্প গণমানুষের কথা বলবে, তার উৎপাদনব্যবস্থা যদি কেবল বিত্তশালীদের হাতে থাকে, তাহলে সেখানে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব থেকেই যায়।
জহির তাই ভাবলেন, প্রযোজনা ও পরিবেশনার জন্য শুধু ধনী মালিকদের ওপর নির্ভর না করে কলাকুশলীদেরই সংগঠিত হতে হবে। একইসঙ্গে মানুষের কাছে জনপ্রিয় শিল্পের বিভিন্ন ফর্ম চলচ্চিত্রে ব্যবহার করা দরকার। এতে চলচ্চিত্রের ভাষা মানুষের কাছে সহজ হবে, আর তার বক্তব্যও পৌঁছাবে আরও দূরে।
এই ভাবনা থেকেই ১৯৬৪ সালে তিনি নির্মাণ করলেন পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র ‘সঙ্গম’। প্রযোজনাতেও নিজে যুক্ত হলেন। অন্য অভিনেতা ও কলাকুশলীদের, বিশেষ করে খান আতাউর রহমানকে, চলচ্চিত্রে আর্থিকভাবে বিনিয়োগে উৎসাহিত করলেন।
এরপর এলো ‘বেহুলা’ (১৯৬৬)। ইফতেখার আলম ও আমীর আলীর প্রযোজনায় নির্মিত এই সিনেমা পুরো পাকিস্তানে ব্যাপক আলোড়ন তুলল। বাণিজ্যিক সাফল্যের পাশাপাশি ‘বেহুলা’ দেখিয়ে দিলো, লোকজ সংস্কৃতি আর জনপ্রিয় বিনোদনের ভাষাকে একসঙ্গে নিয়েও দর্শকের কাছে পৌঁছানো যায়। জহির এখানে ফোক ও পপ কালচারের এমন এক মিশ্রণ ঘটালেন, যা তার আগের কাজগুলোর তুলনায় তাকে অনেক বড় দর্শকের কাছে নিয়ে গেল।
জহিরের এই দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে তার রাজনৈতিক বিশ্বাসেরও ভূমিকা ছিল। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সে সময় সেই রাজনীতির প্রকাশ্য চর্চা নিষিদ্ধ ছিল। প্রখ্যাত রাজনীতিক মণি সিংহ তাকে লেখালেখিতে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। পরে সেই লেখালেখির পথ থেকেই তিনি চলচ্চিত্রের দিকে এগিয়ে যান। ফলে তার চলচ্চিত্রে মার্কসীয় শ্রেণিচেতনার উপস্থিতি খুব একটা অস্বাভাবিক ছিল না।
মুক্তিযুদ্ধের সময় নির্মিত ‘স্টপ জেনোসাইড’ প্রামাণ্যচিত্রের শুরুতেই তিনি ব্যবহার করেছিলেন ভ্লাদিমির লেনিনের বক্তব্যের অংশ। চলচ্চিত্র তার কাছে তখন আর শুধু গল্প বলার মাধ্যম নয়; হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক দলিলও।
উপমহাদেশীয় রাষ্ট্র কাঠামোকে তিনি আধা-সামন্তবাদী ও আধা-ঔপনিবেশিক বলে মনে করতেন। তার বিশ্বাস ছিল, এমন রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতর একজন সৎ চলচ্চিত্রকারের দুর্গতির সীমা থাকে না।
কিন্তু জহির রায়হান বাজারকে অস্বীকার করতে চাননি। বরং তিনি ভাবতেন, বাজারকে ব্যবহার করেই কীভাবে একটি ভালো চলচ্চিত্রকে দুর্বৃত্তায়নের প্রভাব থেকে যতটা সম্ভব মুক্ত রাখা যায়। কারণ তিনি জানতেন, শক্তিশালী বাজার ছাড়া চলচ্চিত্রশিল্প টেকসই হয় না।
তখন পাকিস্তানের চলচ্চিত্রের বাজারের বড় অংশই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক। পূর্ব বাংলার চলচ্চিত্রকে নিজের জায়গা তৈরি করতে হলে নিজেদের দর্শক ও বাজারও তৈরি করতে হবে—এই বাস্তবতা জহির বুঝেছিলেন খুব ভালোভাবেই। সেই কারণে নিজে প্রযোজনাও করেছিলেন। কিন্তু বাণিজ্যিক সিনেমা মানেই তার কাছে ফর্মুলা নয়। গল্পের জায়গায় তিনি ছাড় দেননি।
জহিরের প্রযোজিত বাণিজ্যিক সিনেমাগুলোও কেবল দর্শক টানার জন্য বানানো ফর্মুলা ফিল্ম হয়ে থাকেনি। জনপ্রিয়তার ভেতরেও তিনি সামাজিক বক্তব্যের জায়গা খুঁজে নিয়েছিলেন।
আর এ কারণেই জহির রায়হানের চলচ্চিত্রচিন্তা বুঝতে গেলে অবধারিতভাবে ফিরে আসতে হয় ‘জীবন থেকে নেয়া’র কাছে।
একটি পরিবারের গল্পের ভেতর দিয়ে তিনি প্রতীকীভাবে পুরো রাষ্ট্রকে দেখিয়েছিলেন। পরিবারের ক্ষমতার সম্পর্ক, কর্তৃত্ব, ভয় এবং প্রতিরোধ—সবকিছু যেন রাষ্ট্রেরই ক্ষুদ্র সংস্করণ। উপমহাদেশীয় চলচ্চিত্রে তখনো এ ধরনের প্রতীকী রাজনৈতিক চলচ্চিত্রের চল খুব একটা তৈরি হয়নি।
‘জীবন থেকে নেয়া’ও তৈরি হয়েছিল সমবায়ভিত্তিক প্রযোজনায়। জহির রায়হান ও সুচন্দা ছিলেন মূল প্রযোজক। সঙ্গে খান আতাউর রহমান, আনোয়ার হোসেন, রাজ্জাক, রোজী, রওশন জামিলসহ অন্যরাও প্রযোজনায় সহযোগিতা করেছিলেন।
কিন্তু চলচ্চিত্রটি পাকিস্তান সরকারের চোখ এড়ায়নি। পূর্ব পাকিস্তানে এর প্রদর্শনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় প্রদর্শিত হয়ে ছবিটি নতুন এক রাজনৈতিক অর্থ পায়। একটি চলচ্চিত্র তখন আর কেবল চলচ্চিত্র থাকেনি; হয়ে উঠেছিল একটি জাতির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।
এরই মধ্যে জহির আরেকটি বড় স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। নিজের লেখা উপন্যাস ‘আর কতদিন’ অবলম্বনে তিনি নির্মাণ শুরু করেছিলেন ‘লেট দেয়ার বি লাইট’। নামটি নেওয়া হয়েছিল বাইবেলের একটি বাক্য থেকে। পাকিস্তানি অভিনেতা ওমর চিশতিকে কাস্ট করা হয়েছিল। তার বিপরীতে ছিলেন অলিভিয়া গোমেজ। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বড় করে ঘোষণা হয়েছিল চলচ্চিত্রটির।
পরে স্ত্রী সুচন্দার ইচ্ছায় তিনি সিদ্ধান্ত বদলান এবং ববিতাকে নেওয়া হয়। পরিকল্পনা ছিল পাকিস্তান, ভারত, রাশিয়াসহ কয়েকটি দেশ মিলে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করবে। কিন্তু ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ আর শেষ করে যেতে পারেননি জহির রায়হান।
তার আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেছে। কিছু চলচ্চিত্র হারিয়ে গেছে। কিছু অসমাপ্ত থেকে গেছে। কিন্তু যে প্রশ্নগুলো তিনি তার চলচ্চিত্রের ভেতর রেখে গিয়েছিলেন—শ্রেণি, ক্ষমতা, রাষ্ট্র, মানুষ ও স্বাধীনতার প্রশ্ন—সেগুলো এখনো প্রাসঙ্গিক।
আর তাই জহির রায়হানের গল্পের সবচেয়ে বেদনাদায়ক জায়গাটি হয়তো তার মৃত্যু নয়; বরং তার রেখে যাওয়া অসমাপ্ত কাজগুলো। তিনি যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তার অনেকটাই পর্দায় এসেছিল। কিন্তু শেষ দৃশ্যটি তিনি নিজে লিখে যেতে পারেননি।
সেই কারণেই জহির রায়হান কেবল বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের একটি নাম নন। তিনি এমন এক চলচ্চিত্র-ভাবনার নাম, যার ভেতরে একটি সময়, একটি সমাজ এবং একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন একসঙ্গে ধরা পড়েছিল।