ডেস্ক জব: ব্যাক পেইন ছাড়া আরও যেসব শারীরিক ঝুঁকি

স্মৃতি মন্ডল
স্মৃতি মন্ডল

প্রযুক্তির উৎকর্ষ ও ক্রমবিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে মানুষের কাজের ধরন। ডিজিটাল যুগে কর্মঘণ্টার বেশিরভাগ সময় মানুষ ব্যয় করছেন ডেস্কে বসে, যা শারীরিকভাবে কম পরিশ্রমের কাজ। কিন্তু দীর্ঘসময় একটানা বসে থাকা কিংবা দাঁড়িয়ে থাকার কারণে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বাড়ে।

এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়েছেন ফেলোশিপ অন অ্যাডভান্স বায়োলজিক থেরাপি মাসকুলোস্কেলেটাল আল্ট্রাসনোগ্রাম, কেটিপিএইচ, সিংগাপুর এবং এনাম মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হসপিটালের রিউম্যাটোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. হাবিব ইমতিয়াজ আহমাদ

ডেস্ক জবের শারীরিক ঝুঁকি

ডা. হাবিব ইমতিয়াজ আহমাদ বলেন, ডেস্ক জবের ক্ষেত্রে কাজের বেশিরভাগ সময় অফিসে বসে কাগজপত্র, কম্পিউটার কিংবা ল্যাপটপের স্ক্রিনে তাকিয়ে থেকে কাজ করতে হয়। ডেস্কের কাজে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার কারণে বা দীর্ঘসময় একই রকম ভঙ্গিতে (পশ্চারে) বসে থাকার কারণে আমাদের শরীরে বেশকিছু নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যগত বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।

১. ডেস্ক জবে দীর্ঘসময় একই ভঙ্গিতে বসে কাজ করার ফলে ঘাড়, কাঁধ, পিঠ ও কোমরের পেশিতে অতিরিক্ত চাপ পড়ে। এর ফলে এসব স্থানে ব্যথা বা অস্বস্তি অনুভূত হতে পারে।

২. ভুল ভঙ্গিতে দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করলে মেরুদণ্ডের ডিস্ক এবং মেরুদণ্ডের চারপাশের পেশি ও লিগামেন্টের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি কোমর বা পিঠের ব্যথা বাড়াতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে মেরুদণ্ড সম্পর্কিত সমস্যার ঝুঁকিও বাড়ায়।

৩. দীর্ঘসময় বসে থাকা ও শারীরিক কার্যকলাপ কম হওয়ার কারণে পেশির দুর্বলতা হতে পারে। বিশেষ করে নিতম্ব ও পায়ের পেশির দুর্বলতা বেশি দেখা দেয়।

৪. ডেস্কের কাজে কম শারীরিক পরিশ্রম ও কার্যকলাপের কারণে ক্যালোরি কম খরচ হয়, এর ফলে স্থূলতা বা ওজন বেড়ে যেতে পারে।

৫. দীর্ঘসময় একটানা বসে থাকা ও শারীরিক কার্যকলাপ কম হওয়ার কারণে শরীরের বিপাকক্রিয়া (মেটাবলিজম) ধীর হয়ে যেতে পারে এবং রক্ত সঞ্চালন কমে যায়। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরল ও হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।

৬. দীর্ঘসময় কম্পিউটার বা ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার কারণে চোখে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন: চোখে ঝাপসা দেখা, চোখ শুকিয়ে যাওয়া, জ্বালাপোড়া করা, চোখে চাপ বা ক্লান্তি অনুভূত হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে মাথাব্যথাও হতে পারে।

৭. বারবার টাইপিং ও মাউস ব্যবহারে হাত ও কব্জিতে ব্যথা বা অসাড়তাসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে।

৮. দীর্ঘসময় বসে কিংবা দাঁড়িয়ে কাজ করলে পা ফুলে যাওয়া, শিরা ফুলে যাওয়ার (ভ্যারিকোজ ভেইন) ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।

করণীয়

ডেস্ক জবের কারণে স্বল্প কিংবা দীর্ঘমেয়াদি যে জটিলতাগুলো আসে, সেগুলো প্রতিরোধ করতে মূলত সচেতনতা হতে পারে অন্যতম হাতিয়ার।

  • ডেস্ক জবে অবশ্যই সঠিক ভঙ্গিতে বসার অভ্যাস করতে হবে। পিঠ সোজা রেখে বসতে হবে, পায়ের পাতা মেঝেতে সমানভাবে রাখতে হবে এবং কম্পিউটারের স্ক্রিন চোখের সমতলে রেখে কাজ করতে হবে।

  • ডেস্ক জবে স্পাইন ফিটেট চেয়ার ব্যবহার করতে হবে। এমন চেয়ার ব্যবহার করা উচিত যা মেরুদণ্ডকে সাপোর্ট দেয়।

  • প্রতি ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা পর পর বসার ভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। বসে থাকলে উঠে দাঁড়িয়ে একটু হাঁটাহাঁটি করতে হবে বা দাঁড়িয়ে থাকলে বসে বিশ্রাম নিতে হবে। একটানা এক রকম পশ্চারে না থাকার চেষ্টা করতে হবে।

  • পশ্চার পরিবর্তনের পাশাপাশি স্ট্রেচিং এক্সারসাইজ করলে পেশির নমনীয়তা বজায় থাকে, রক্ত সঞ্চালন বাড়ে ও ব্যথার ঝুঁকি কমে। কাজের ফাঁকে ব্যাক মাসল স্ট্রেচিং, হাঁটুর ও বিভিন্ন অস্থিসন্ধির যে স্ট্রেচিং এক্সারসাইজ রয়েছে সেগুলো করতে হবে।

  • ১০ মিনিটের মাইক্রো ওয়ার্ক আউট করতে হবে (অফিস বা বাসায়)।

  • চোখের যত্নে ২০-২০-২০ নিয়ম মেনে চলতে হবে, অর্থাৎ প্রতি ২০ মিনিট পরপর স্ক্রিন থেকে চোখে সরিয়ে ২০ ফুট দূরের কোনোকিছুর দিতে অন্তত ২০ সেকেন্ডে তাকিয়ে থাকা। আই ব্লিংক এক্সারসাইজ করতে হবে।

  • কাজের ফাঁকে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করতে হবে, এতে মাংসপেশির দুর্বলতা কমে।

  • আগে থেকেই যদি ওজন বেশি থাকে, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ থাকে, তাহলে তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। অফিস শেষে নিয়মিত হাঁটাহাঁটি, ব্যায়াম ও সাঁতার কাটার অভ্যাস করলে তা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হবে।