পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন কেন হয়, কতদিন থাকতে পারে?
সন্তান জন্মদানের পুরো প্রক্রিয়ায় একজন মাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে কঠিন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সন্তান জন্মের আগে মায়ের স্বাস্থ্য ও মানসিক অবস্থা যতটা গুরুত্ব পায়, সন্তান জন্মের পর মা কি সেই একই গুরুত্ব এবং যত্ন পায় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন সেন্ট্রাল হাসপাতাল লিমিটেড এবং আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতালের গাইনি ও প্রসূতি বিভাগের অধ্যাপক ডা. আঞ্জুমান আরা রিতা।
পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন
অধ্যাপক ডা. আঞ্জুমান আরা রিতা বলেন, পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন বা পিপিডি হলো সন্তান জন্মের পর মায়ের মধ্যে দেখা দেওয়া একটি গুরুতর বিষণ্নতাজনিত মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা। সাধারণত প্রসবের পর প্রথম কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাসের মধ্যে এটি শুরু হতে পারে।
পিপিডির প্রধান লক্ষণের মধ্যে রয়েছে—দীর্ঘ সময় মন খারাপ বা কান্না পেতে থাকা, কোনো কিছুতে আনন্দ বা আগ্রহ না থাকা, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা বা বিরক্তি, ঘুমের সমস্যা, শিশু ঘুমালেও ঘুম না আসা, অতিরিক্ত ক্লান্তি ও দুর্বল লাগা, নিজেকে ‘ভালো মা নই’ মনে হওয়া বা অপরাধ বোধ।
সাধারণত প্রথম মা বা কর্মজীবী মায়েদের এই পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন বেশি হয়।
পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন কেন হয়
পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন একটি মাত্র কারণে হয় না। সন্তান প্রসবের পর শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিভিন্ন কারণ একসঙ্গে ভূমিকা রাখে।
হরমোনের দ্রুত পরিবর্তন: প্রসবের পর ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোনের মাত্রা দ্রুত কমে যায়। এর সঙ্গে মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটারের পরিবর্তনও মুডকে প্রভাবিত করতে পারে।
ঘুমের অভাব ও শারীরিক ক্লান্তি: নবজাতকের বারবার কান্না, রাত জাগা ও প্রসবের পর শরীরের রিকভারি—সব মিলিয়ে অতিরিক্ত ক্লান্তি তৈরি হয়।
মানসিক চাপ: নতুন শিশুর দায়িত্ব, শিশুর স্বাস্থ্য নিয়ে দুশ্চিন্তা, পরিবারের বিভিন্ন সদস্যদের বাচ্চার পরিচর্যা নিয়ে মাকে বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য করা, নিজের শরীরের পরিবর্তন বা ব্রেস্টফিডিংয়ের সমস্যা মানসিক চাপ বাড়াতে পারে।
সামাজিক ও পারিবারিক সহায়তার অভাব: স্বামী বা পরিবারের সদস্যদের পর্যাপ্ত সহযোগিতা না পাওয়া, একাকীত্ব বা পারিবারিক দ্বন্দ্ব ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
পূর্বের ডিপ্রেশন বা অ্যাংজাইটি থাকার ইতিহাস: বিষণ্নতা, উদ্বেগ বা আগের প্রেগনেন্সিতে পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন থাকলে এই রোগের ঝুঁকি বেশি।
প্রসব-সংক্রান্ত জটিলতা: কঠিন বা ট্রমাটিক ডেলিভারি, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, প্রিম্যাচিউর বেবি বা শিশুর জন্মগত অসুস্থতা মায়ের মানসিক চাপ বাড়াতে পারে।
আর্থিক বা সম্পর্কজনিত সমস্যা: অর্থনৈতিক চাপ, দাম্পত্য সমস্যা বা অনিরাপদ পারিবারিক পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পিপিডির লক্ষণ
দীর্ঘস্থায়ী মন খারাপ বা বিষণ্নতা
অকারণে কান্না পেতে থাকা
অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা
অস্থিরতা বা ভয়
ঘুমের সমস্যা; শিশু ঘুমালেও ঘুম না আসা কিংবা অতিরিক্ত ঘুম
ক্ষুধা কমে বা বেড়ে যাওয়া
সব সময় ক্লান্তি ও দুর্বল লাগা
শিশুর প্রতি আগ্রহ বা ভালোবাসা অনুভব করতে কষ্ট হওয়া
নিজেকে অযোগ্য মা মনে হওয়া বা অতিরিক্ত অপরাধ বোধ
কোনো কিছুতেই আনন্দ না পাওয়া
মনোযোগ ধরে রাখা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে যাওয়া
পরিবার/স্বজনদের থেকে দূরে থাকতে ইচ্ছা করা
নিজের (সুইসাইডাল টেনডেনসি বা আত্মহত্যার প্রবণতা) বা শিশুর ক্ষতি করার চিন্তা মাথায় আসা
কতদিন থাকতে পারে?
পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন কতদিন থাকতে পারে সে প্রসঙ্গে অধ্যাপক ডা. আঞ্জুমান আরা রিতা বলেন, চিকিৎসা না নিলে কয়েক মাস থেকে এক বছর বা তারও বেশি সময় থাকতে পারে।
চিকিৎসা নিলে অনেকের ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়। এটি মূলত ব্যক্তি, উপসর্গের তীব্রতা এবং চিকিৎসা শুরু করার সময়ের ওপর নির্ভর করে।
মায়ের করণীয়
১. পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনে মায়ের একাই সব সামলানোর চেষ্টা করা উচিত নয়। স্বামী, মা-বাবা, আত্মীয় বা বিশ্বস্ত কাউকে নিজের অনুভূতির কথা বলুন।
২. বিশ্রাম ও ঘুমের সুযোগ নিন; শিশু ঘুমালে সম্ভব হলে আপনিও বিশ্রাম নিন।
৩. নিয়মিত খাবার ও পানি পান করুন।
৪. প্রতিদিন সামান্য হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম করুন; মা যদি শারীরিকভাবে উপযুক্ত থাকেন।
৫. শিশুর যত্নে পরিবারকে সহায়তা গ্রহণ করুন; সব কাজ নিজেকেই করতে হবে এমন নয়।
৬. নিজের অনুভূতি নিয়ে লজ্জা বা অপরাধ বোধ থাকা উচিত নয়; এটি চিকিৎসাযোগ্য একটি সমস্যা।
যদি লক্ষণগুলো ২ সপ্তাহের বেশি থাকে, বাড়তে থাকে বা দৈনন্দিন কাজ অথবা শিশুর যত্নে অবহেলা হয়, তাহলে গাইনি অথবা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনে কাউন্সেলিং বা সাইকোথেরাপি ও ওষুধ নিতে হবে।
নিজেকে বা শিশুকে আঘাত করার চিন্তা, বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন লাগা, অস্বাভাবিক আচরণ বা কণ্ঠস্বর শুনতে পেলে এটি জরুরি অবস্থা; এমন পরিস্থিতি দেখা দিলে মাকে একা রাখা যাবে না এবং দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করাতে হবে।
পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ভূমিকা
অধ্যাপক ডা. আঞ্জুমান আরা রিতা বলেন, পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন বা সন্তান জন্মের পর বিষণ্নতায় আক্রান্ত মায়ের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা ফিরিয়ে আনতে পরিবারের অন্যান্য সব সদস্যদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মাকে ‘দুর্বল’ বা ‘খারাপ মা’ না ভেবে, এটি একটি চিকিৎসাযোগ্য মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা উচিত।
মা কথা বলার সময় বাধা না দিয়ে মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে।
‘এত কিছু পেয়েও তুমি খুশি নও কেন?’ এ ধরনের কথা এড়িয়ে চলতে হবে। বলতে হবে: ‘তুমি একা নও, আমরা তোমার পাশে আছি।’ মাকে দোষারোপ করা যাবে না।
‘তুমি বাচ্চাকে ভালোবাসো না’, ‘নিজেকে শক্ত করো’ এগুলো বলা উচিত নয়।
কান্না, বিরক্তি বা অস্থিরতাকে ইচ্ছাকৃত আচরণ হিসেবে দেখা উচিত নয়।
পরিবারের অন্যান্যদের শিশুর দেখাশোনার দায়িত্ব নিতে হবে। বিশেষ করে রাতে শিশুর যত্নে সাহায্য করতে হবে।
ঘরের কাজে মাকে সাহায্য করতে হবে। রান্না, বাজার, ঘরের কাজ ভাগ করে নিতে হবে।
মাকে নিয়মিত খাওয়া, গোসল ও বিশ্রামের সুযোগ করে দিতে হবে। ঘুমের ব্যবস্থা করতে হবে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে বিষণ্নতা আরও খারাপ হতে পারে।
মাকে চিকিৎসা নিতে উৎসাহ দিতে হবে। প্রয়োজনে গাইনি অথবা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা মনোবিজ্ঞানীর কাছে নিয়ে যেতে হবে। চিকিৎসা নেওয়াকে লজ্জার বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না।
চিকিৎসক ওষুধ দিলে পরিবারের সদস্যরা যেন নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ না করেন, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
মাকে একা করে রাখা যাবে না; বিশেষ করে যদি তিনি খুব বেশি হতাশ, অস্থির বা অসহায় বোধ করেন।
নিয়মিত তার সঙ্গে কথা বলতে হবে এবং তার খোঁজ খবর নিতে হবে।





