হাওরের কৃষকের নেই ঈদ, আছে ঋণ-ক্ষুধার দুশ্চিন্তা
আর সপ্তাহ দুয়েক পরেই ঈদুল আজহা। অথচ হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার হাওরপাড়ের কৃষকদের চোখে-মুখে চরম দুশ্চিন্তা আর হাহাকারের ছাপ।
বছরের এই সময়টায় বোরো ধান ঘরে তোলার খুশি জোটেনি এলাকাটির হাজারো কৃষকের ভাগ্যে। আকস্মিক বন্যায় তলিয়ে ফসলের পাশাপাশি ম্লান হয়ে গেছে শত শত পরিবারের ঈদের আনন্দ।
উপজেলার জলসুখা ইউনিয়নের দক্ষিণপাড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল জলিল (৫৭) চলতি মৌসুমে মেঘার চর জমিতে ৭ হাজার টাকা দরে ইজারা নিয়ে ৬ বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছিলেন। কয়েক দিন আগেও তার মাঠজুড়ে ছিল সোনালি ধান। কিন্তু উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর টানা বৃষ্টির পানিতে চোখের সামনেই তলিয়ে গেছে স্বপ্নের ফসল।
আজ মঙ্গলবার ঋণ শোধ করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘স্বপ্ন আছিল ধান বেইচ্যা পোলাপানরে ঈদের কাপড় দিমু, ঘরে পিঠা-পায়েস অইবো। অখন ঈদের আনন্দ তো দূরের কথা, সামনের দিনগুলোতে পরিবার নিয়া কী খাইয়া বাঁচমু, সেই চিন্তায় চোখে ঘুম নাই। পাওনাদাররা এখনই আইসা ভিড় করতাছে।’
শুধু জলিন নন, উৎসবের আগমুহূর্তে এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় হাওরপাড়ের জনপদকে বিষণ্ন করে তুলেছে। যেখানে থাকার কথা ছিল আনন্দ-উৎসব, সেখানে এখন শত শত কৃষকের কেবলই হাহাকার আর দীর্ঘশ্বাস।
উপজেলা কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে আজমিরীগঞ্জে মোট ১৪ হাজার ৫৬০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ১ হাজার ৪৮০ হেক্টর জমির ধান সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে।
কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত এই ধানের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ কোটি টাকা।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা বলছেন, স্থানীয় কৃষি বিভাগ ও প্রশাসন ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ শুরু করলেও তাদের প্রয়োজন জরুরি সরকারি সহায়তা ও কৃষিঋণ মওকুফ। তা না হলে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন হাওর ঘুরে দেখা গেছে, পচে যাওয়া ধানের গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। অনেক কৃষক বুকসমান পানিতে নেমে আধপাকা ধান কাটার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। কিন্তু সেই ধান গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবেও ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
প্রায় দেড়শ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন সদর ইউনিয়নের কৃষক উছমান মিয়া। মাত্র ২০ বিঘা ধান কাটার পরই বানের পানিতে তার ১৩০ বিঘা জমির ধান তলিয়ে যায়। শ্রমিক সংকট ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে বাকি ধান কাটতে পারেননি তিনি।
শিবপাশা ইউনিয়নের কৃষক কাউছার মিয়া ও কাকাইলছেও ইউনিয়নের কৃষক লুৎফর রহমানের কাছাকাছি অবস্থা। লুৎফর বলেন, ‘পানির মধ্যে থেকে কিছু ধান কাটছি, কিন্তু যা অবস্থা তাতে এই বছর সংসার চালানোই কষ্ট হবে। খড়ও জড়ো করতে পারছি না। এখন গবাদিপশুগুলোকে সারা বর্ষা কী খাওয়াব, সেই চিন্তায় আছি।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন বলেন, ‘ইতোমধ্যে উপজেলার হাওর এলাকায় ৭২ শতাংশ ও নন-হাওর এলাকায় ৩৮ শতাংশসহ মোট ৫৭ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া সরকারি মূল্যে গুদামে ধান সরবরাহের জন্য উপজেলার প্রায় ৫ হাজার কৃষকের মধ্য থেকে উন্মুক্ত লটারির মাধ্যমে ৪৭৭ জন কৃষককে বাছাই করা হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম রেজাউল করিম বলেন, আমরা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করেছি। তিন ক্যাটাগরিতে তাদের সহায়তা প্রদান করা হবে। বরাদ্দ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সহায়তা কার্যক্রম শুরু করা হবে। এ বিষয়ে সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।