‘মজুরির টাকাই উঠছে না’, হাওরে ধান কেটে লোকসানে কৃষক

মাসুক হৃদয়
মাসুক হৃদয়

‘গত বছর হাওরে বজ্রপাতে আমার বড় ছেলে মোজাম্মেলের জীবন গেল। এ বছর হাওরের পানি নিয়ে গেল ছয় কানি জমির ধান। এখন কীভাবে সংসার চালামু বুঝতাছি না।’

কথাগুলো বলতে বলতে চোখ ভিজে আসে নাসিরনগরের গোয়ালনগর ইউনিয়নের সোনাতোলা গ্রামের কৃষক মুতি মিয়ার।

গত বছর বড় ছেলেকে হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই এবার আগাম ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে তার সারা বছরের একমাত্র ভরসা।

ছোট ছেলে আকরামকে নিয়ে আট কানি (প্রতি কানিতে প্রায় এক বিঘা) জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছিলেন তিনি। চাষাবাদের খরচ মেটাতে এক এনজিও থেকে ১ লাখ টাকা ঋণও নিয়েছিলেন। কিন্তু দুই কানি জমির ধান কাটতে পারলেও বাকিগুলো এখন পানির নিচে।

শুধু মুতি মিয়াই নন, নাসিরনগরের মেদীর হাওরপাড়ের হাজারো কৃষকের গল্প এখন প্রায় একই। ধার-দেনা, এনজিও ঋণ আর উচ্চ সুদের টাকায় জমি আবাদ করার পর এখন লোকসানের ভার কাঁধে নিয়ে হতাশায় দিন কাটছে তাদের।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বোরো মৌসুমে নাসিরনগর উপজেলায় প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১১ হাজার হেক্টর জমি হাওর এলাকায়। গত কয়েকদিনের অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে মেদীর হাওরের অন্তত ৩৭২ হেক্টর জমি প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় ২ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

সরেজমিনে মেদীর হাওর ও গোয়ালনগর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কোথাও বুক সমান, কোথাও গলা সমান পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে ধান কাটার চেষ্টা করছেন কৃষক। আবার কোথাও পাকা ধান জমিতেই ডুবে আছে। আকাশ পরিষ্কার থাকলেও কৃষকের মুখে স্বস্তি নেই।

কৃষকরা জানান, মৌসুমের শুরুতে দ্বিগুণ মজুরি দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছিল না। পানি বৃদ্ধির পর গত দু-তিনদিনে শ্রমিক সংকট আরও তীব্র হয়েছে। ফলে অনেকে বাধ্য হয়ে জমিতেই পাকা ধান ফেলে রাখছেন।

সোনাতোলা গ্রামের কৃষক জালাল মিয়া দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘পাঁচ কানি জমি করেছিলাম। এক কানি তলাইয়া গেছে। বাকি চার কানি কাটতে ২৫ হাজার টাকা মজুরি লাগছে। অথচ সব মিলায়া ধান পাইছি মাত্র ৪০ মণ। বেপারিরা দাম বলতাছে ২৪ হাজার টাকা। লাভ তো দূরের কথা, খরচই উঠতাছে না।’

তিনি বলেন, ‘এবার এনজিওর কিস্তি ক্যামনে দিমু, এই চিন্তায় ঘুম আসে না।’

একই গ্রামের কৃষক আব্দুন নূর বলেন, ‘১ হাজার ২০০ টাকা দিনমজুরি দিয়াও শ্রমিক পাওয়া যায় না। জমিতে গলা সমান পানি। ধান কাটার অবস্থা নাই। ধান বিক্রি কইরা সংসারের অনেক পরিকল্পনা আছিল, সব শেষ।’

মেদীর হাওরের কৃষক দানিছ মিয়া জানান, এক ফসলি জমির ধান বিক্রির টাকাতেই তার সাত সদস্যের সংসার চলে। তিন সন্তানের লেখাপড়ার খরচও আসে এই জমি থেকে। ‘ছয় বিঘা জমির ধান পানির নিচে গেছে। এখন ধান কাটলেও মান ভালো থাকব না, বাজারেও দাম কম।’

আরেক কৃষক ফজর আলী জানান, তার মোট ছয় বিঘা জমির মধ্যে তিন বিঘা সেচ সংকটের কারণে রোপণই করতে পারেননি। যে তিন বিঘা জমিতে ধান করেছিলেন, তার মধ্যে সোয়া দুই বিঘা তলিয়ে গেছে। বাকি জমি থেকে পেয়েছেন মাত্র ১২ মণ ধান। অথচ তার আশা ছিল অন্তত ৭০ মণ ধান পাবেন।

আরেক কৃষক ফখরুল মিয়া বলেন, পানি বেড়ে যাওয়ার পর শ্রমিকের মজুরি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ‘এক বিঘা জমির ধান কাটতে পাঁচ হাজার টাকা মজুরি দিছি। সেই জমির ধান বিক্রিও করছি পাঁচ হাজার টাকায়।’

বৃষ্টির আগে কাটা ধান রোদে শুকাতে না পারায় পচে যাওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এতে কৃষকের ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

নাসিরনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইমরান হোসাইন বলেন, ‘হাওরের পানি এখনও বাড়ছে। তবে নতুন করে আর কোনো জমি প্লাবিত হয়নি। বৃষ্টির আগে ৬০ শতাংশের বেশি ধান কাটা হয়েছিল। তাই ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা কম হয়েছে।’

তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। তাদের সহায়তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।