কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে বিস্তীর্ণ এলাকার ফসলি জমি বিলীন

ভাঙনরোধে নেই কার্যকর উদ্যোগ, হুমকিতে শতাধিক পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
এস দিলীপ রায়
এস দিলীপ রায়

কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলায় আবারো ভয়াবহ রূপ নিয়েছে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন। গত দুই সপ্তাহে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বিস্তীর্ণ এলাকার ফসলি জমি।

নতুন করে ভাঙনের মুখে পড়েছে কয়েকশ পরিবার, বসতভিটা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গ্রামীণ সড়ক ও বিভিন্ন স্থাপনা। এ নিয়ে নদী তীরবর্তী মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান,দুই সপ্তাহে প্রায় ১২০ হেক্টর ফসলি জমি নদীভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। প্রতি বছরই বর্ষা মৌসুমের আগে ও পরে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন শুরু হয়। কিন্তু স্থায়ী ভাঙনরোধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া না হওয়ায় বছরের পর বছর তারা ঘরবাড়ি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। দ্রুত টেকসই নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

তারা জানান, ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বাড়তে শুরু করায় রৌমারীর চরশৌলমারী ইউনিয়নের চর গেন্দার আলগা, সোনাপুর, পশ্চিম খেদাইমারী, সুখেরবাতি, ঘুঘুমারী ও নামাজের চর এলাকায় তীব্র ভাঙন শুরু হয়েছে। নদীর স্রোত ও তীরধসের কারণে প্রতিদিনই নতুন নতুন অংশ নদীতে বিলীন হচ্ছে।

স্থানীয় কৃষকরা জানান, ভাঙনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আবাদি জমি। নদীগর্ভে চলে গেছে বোরো ধান, ভুট্টা, পাট, শাকসবজি ও বিভিন্ন মৌসুমি ফসলের জমি। এতে কৃষক পরিবারগুলো বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

স্থানীয়রা জানান, প্রায় ১০ মাস আগে একই ইউনিয়নের সুখেরবাতি, ঘুঘুমারী, চর গেন্দার আলগা, গেন্দার আলগা, সোনাপুর ও নামাজের চর এলাকায় ভয়াবহ ভাঙনে অন্তত ৭২০ পরিবারের বসতবাড়ি ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অনেকেই এখনও রাস্তার ধারে, অন্যের জমিতে কিংবা অস্থায়ী ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করছেন। পুনর্বাসন বা স্থায়ী সহায়তা না পাওয়ায় তারা এখনো দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন।

নতুন করে ভাঙন শুরু হওয়ায় তীরবর্তী পরিবারগুলোর মধ্যে ফের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। যেকোনো সময় বসতভিটা নদীতে চলে যেতে পারে—এই শঙ্কায় অনেকে রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন।

চরশৌলমারী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সমসের আলী বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত ৭২০ পরিবারের তালিকা করে চেয়ারম্যানের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এরইমধ্যে আবার নতুন করে ভাঙন শুরু হয়েছে।’

চেয়ারম্যান সাইদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি।

সোনাপুর গ্রামের ভুক্তভোগী ৫৫ বছর বয়সী আকবর হোসেন বলেন, ‘আমার এই বয়সে সাতবার বাড়ি ভেঙেছে। এখন নিজের কোনো ঘরবাড়ি নেই। মানুষের বাঁশঝাড়ের নিচে কোনোমতে থাকি। আবার ভাঙন শুরু হয়েছে, এখন সেটাও থাকবে কি না জানি না।’

একই গ্রামের ৬০ বছর বয়সী সেকেন্দার আলী বলেন, ‘আমার বাড়ি আটবার নদীতে গেছে। এখন অন্যের জায়গায় আশ্রয় নিয়ে আছি। আবার ভাঙন শুরু হয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে থাকার জায়গা থাকবে না।’

চর গেন্দার আলগা এলাকার ৫০ বছর বয়সী মেহেরবানু বেগম বলেন, ‘চারবার বাড়ি ভেঙেছে। স্বামী অসুস্থ, আয়-রোজগার নেই। যেখানে যাই, সেখান থেকেও সরিয়ে দেয়। ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে কোথায় যাব?’

একই গ্রামের ৭০ বছর বয়সী সুরুজ মিয়া বলেন, ‘১১ বার বাড়ি ভেঙেছে। এখন অন্যের জমিতে কোনোভাবে আছি। এই ঘরটাও ভেঙে গেলে আর যাওয়ার জায়গা থাকবে না।’

একই গ্রামের স্কুলশিক্ষক আতিয়ার রহমান বলেন, নদীভাঙন অব্যাহত থাকলে চর গেন্দার আলগা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কয়েকটি কাঁচা-পাকা সড়ক, মসজিদ ও বাজার এলাকা ঝুঁকির মুখে পড়বে। এতে শিক্ষা কার্যক্রম ও যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।

কুড়িগ্রামের নদীবিষয়ক সংগঠক মহিউদ্দিন মহির বলেন, ‘প্রতিবারই আশ্বাস দেওয়া হয়, কিন্তু কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয় না। কেবল জিওব্যাগ ফেলে সাময়িক ব্যবস্থা নিলে হবে না। এখানে স্থায়ী নদীশাসন প্রকল্প নিতে হবে।’

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, ‘বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে জরুরি কাজের জন্য বর্তমানে কোনো বরাদ্দ নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্থায়ীভাবে ভাঙন ঠেকাতে একটি প্রকল্পের প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে এবং এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করছে।’