মাঠে খুশি, হাটে হতাশ

এস দিলীপ রায়
এস দিলীপ রায়

লালমনিরহাটের দুড়াকুটি হাটে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে ধান নিয়ে আসেন কৃষক মনসুর আলী (৬৫)। আশা ছিল, প্রতি মণ ধান ১ হাজার টাকায় বিক্রি করবেন। কিন্তু প্রায় দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পরও সেই দাম না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ৮০০ টাকায় প্রতি মণ ধান বিক্রি করেন তিনি। টাকা হাতে নেওয়ার সময় তার চোখে-মুখে ছিল হতাশা।

লালমনিরহাট সদর উপজেলার কর্ণপুর গ্রামের এ কৃষক দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, এ বছর তিনি ১০ বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করেছেন। ইতোমধ্যে ২ বিঘা জমির ধান কেটে ৪৫ মণ ফলন পেয়েছেন। মাঠে ভালো ফলন দেখে তিনি খুশি হয়েছিলেন, কিন্তু বাজারে এসে সেই আনন্দ মুহূর্তেই ফিকে হয়ে যায়।

মনসুর আলী বলেন, এ বছর বিঘাপ্রতি প্রায় ২ মণ ধান বেশি পেয়েছি। মাঠে গিয়ে ধান দেখে মন ভরে যায়, কিন্তু হাটে দাম না পেয়ে শুধু হতাশ হতে হয়।

‘গত বছর একই সময়ে আমি প্রতি মণ ধান ১ হাজার ৫০ টাকায় বিক্রি করেছিলাম’, বলেন তিনি।

সদর উপজেলার তিস্তা এলাকার কৃষক নরেশ চন্দ্র বর্মণ বলেন, এ বছর ১০ বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করেছি। বীজ বপন থেকে শুরু করে ঘরে ধান তোলা পর্যন্ত প্রতি বিঘা জমিতে খরচ হয়েছে ১৮ হাজার টাকা। আর বিঘা প্রতি ধান পেয়েছি ১৯ মণ। এতে প্রতিমণ ধানের উৎপাদন খরচ পড়েছে প্রায় ৯৫০ টাকা।

তিনি বলেন, ২ দিন আগে ৮০০ টাকা মণ দরে ১৫ মণ ধান বিক্রি করেছি। বাজারদর কম থাকায় আপাতত ধান বিক্রি করছি না।

নরেশ চন্দ্র বলেন, এ বছর ধান চাষে সার ও ডিজেল জোগাড় করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। এ জন্য বাড়তি খরচও গুনতে হয়েছে। তার ওপর শ্রমিকের মজুরিও বেড়েছে। সব মিলিয়ে এখন আমরা লোকসানেই আছি।

একই অভিজ্ঞতার মুখে পড়েছেন আদিতমারী উপজেলার শালমারা গ্রামের কৃষক নবীন চন্দ্র বর্মণ (৬০)।

তিনি বলেন, প্রতি মণ ধান মাত্র ৭৮০ টাকা দরে বিক্রি করেছি। গত বছর প্রতি মণ ১ হাজার ৫০ টাকা বিক্রি করেছিলাম। এ বছর উৎপাদন খরচও বেড়েছে, অথচ দাম কমে গেছে। আগে জানলে ধান হাটে আনতাম না।

রংপুর সদর উপজেলার গোপীনাথপুর গ্রামের কৃষক আতোয়ার রহমান ডেইলি স্টারকে বলেন, ২০ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছি। ৪ বিঘা জমির ধান কেটে পেয়েছি ৯১ মণ ধান। এর মধ্যে ২৫ মণ ধান ৮০০ টাকা দরে বিক্রি করেছি।

তিনি বলেন, মাঠে ধানের ফলন দেখে মনে আশা জাগে, কিন্তু হাটে এসে সেই আশা ভেঙে যায়। এভাবে চললে ভবিষ্যতে চাষ করা কঠিন হয়ে যাবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলা— লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর, গাইবান্ধা ও নীলফামারীতে ৫ লাখ ৯ হাজার ৯৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে।

বর্তমানে চরাঞ্চল, আগাম জাত ও নিম্নাঞ্চলের প্রায় ২০-২৫ শতাংশ জমির ধান কাটা শুরু হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এ বছর ফলন তুলনামূলক বেশি।

লালমনিরহাটের ধানের পাইকার সোলেমান আলী ডেইলি স্টারকে বলেন, আমাদের গুদামে এখনো পুরোনো ধান রয়েছে। নতুন ধানের বাজার পুরোপুরি জমে ওঠেনি। এছাড়া বাজারে আসা ধানের অনেকটাই ঠিকভাবে শুকানো হয়নি। তাই আমরা ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা দরে ধান কিনছি।

তিনি বলেন, ৩-৪ সপ্তাহ পর বাজার পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ শুরু হলে দাম বাড়বে।

রংপুরের ধানের পাইকার সুনীল চন্দ্র সেন ডেইলি স্টারকে বলেন, আমরাও কৃষক। বর্তমান দামে ধান কিনতে হচ্ছে অনেকটা বাধ্য হয়ে। গুদামে পর্যাপ্ত মজুত থাকায় নতুন ধান কেনার আগ্রহ কম।

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম ডেইলি স্টারকে বলেন, এ বছর ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। কৃষকরা মাঠে খুশি, কিন্তু বাজারে দাম কম হওয়ায় হতাশ। তবে এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হবে না।

তিনি বলেন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ধানের দাম বাড়তে পারে। যদি প্রতি মণ ধান ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হয়, তাহলে কৃষকরা লাভবান হবেন ও চাষে আগ্রহ বাড়বে।

রংপুর বিভাগীয় খাদ্য কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম ডেইলি স্টারকে বলেন, এ বছর সরকার ধানের দাম প্রতি কেজি ৩৬ টাকা নির্ধারণ করেছে। তবে এখনো সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ শুরু হয়নি।

তিনি বলেন, আগামী ২ সপ্তাহের মধ্যে ধান সংগ্রহ শুরু হবে। তখন সরকারি ক্রয় শুরু হলে বাজারে ধানের দাম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।