আজও তিনি বাজারে বসেন, একটি ভাঙা ছাতার অপেক্ষায়
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার সীমান্তবর্তী পাইকপাড়া বাজারে বৃষ্টি নামলেই একসময় অন্যরকম এক দৃশ্য দেখা যেত। বাজারের এক কোণে বসে থাকতেন কয়েকজন কারিগর। কারও হাতে সুতা, কারও হাতে তার, সামনে ভাঙা ছাতার স্তূপ। একের পর এক ছাতা মেরামত করে তারা ফিরিয়ে দিতেন মানুষের হাতে।
আজ সেই জায়গায় বসে আছেন শুধু একজন—৬১ বছর বয়সী আনু মিয়া।
চারপাশে বাজারের কোলাহল আগের মতোই আছে। মানুষ আসছে, যাচ্ছে, কেনাকাটা করছে। কিন্তু আনু মিয়ার সামনে থামে না কেউ। বৃষ্টির দিনে যার হাতে মানুষ আশ্রয় খুঁজত, আজ সেই হাতই খুঁজে ফেরে কাজ।
‘এ কাজ করে এখন আর সংসার চলে না,’ ধীর কণ্ঠে বলেন আনু মিয়া। ‘কোনো দিন দুই-একটা ছাতা ঠিক করতে মানুষ আসে, আবার কোনো দিন আসেই না।’
তার কণ্ঠে অভিযোগ নেই, আছে দীর্ঘদিনের সঙ্গী হয়ে ওঠা এক ধরনের নীরবতা। বৃষ্টি হলে মাঝেমধ্যে দুই-একটা কাজ জোটে। বাকি সময় কেটে যায় অপেক্ষায়।
‘বর্তমানে চায়না ছাতা বের হইছে, দামও কম। নষ্ট হইলে মানুষ ফেলাইয়া দিয়া আবার নতুন একটা কিনে। এখন আর কেউ ছাতা ঠিক করতে আসে না,’ কাঁপা কাঁপা গলায় বলেন তিনি।
এই কয়েকটি বাক্য যেন শুধু আনু মিয়ার নয়, একটি হারিয়ে যেতে বসা পেশার ইতিহাস বলে যায়।
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ছাতা মেরামতের কাজ করছেন তিনি। একসময় তার বাবাসহ পরিবারের অনেকেই এই পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শুধু পাইকপাড়া বাজারেই কাজ করতেন পাঁচ-ছয়জন কারিগর। আজ সেখানে টিকে আছেন একা আনু মিয়া।
তবে নিয়মিত বাজারে বসাও আর হয়ে ওঠে না তার।
‘বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে কাজ খুঁজি। কোথাও যদি একটা-দুইটা ভাঙা ছাতা পাওয়া যায়,’ বলেন তিনি।
এক জায়গায় বসে দিনের পর দিন খালি হাতে ফেরার চেয়ে ঘুরে বেড়ানোই যেন তার কাছে সহজতর। হয়তো কোথাও কোনো ছাতা ভাঙবে, কেউ একজন মেরামতের কথা ভাববে—সামান্য এই আশাতেই পথ চলা। কিন্তু বাস্তবতা কঠিন।
‘এখন এ কাজ করে সংসার তো দূরের কথা, নিজের খরচের টাকাও হয় না,’ বলেন আনু মিয়া। তাই বাধ্য হয়েই অন্য কাজও করতে হয় তার।
মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে, বদলেছে যাতায়াতের ধরনও। আগে অধিকাংশ মানুষ হেঁটে চলাফেরা করত। রোদ-বৃষ্টি থেকে বাঁচার প্রধান ভরসা ছিল ছাতা। এখন গাড়ির ব্যবহার বেড়েছে, ছাতার প্রয়োজন কমেছে। তার ওপর বাজার ভরে গেছে কম দামের, একবার ব্যবহারযোগ্য ছাতায়। নষ্ট হলে মানুষ মেরামতের কথা না ভেবে নতুন কিনে নেয়।
আনু মিয়ার ভাষায়, ‘মানুষের আয়ও বাড়ছে। সামান্য একটা ছাতা ঠিক করানোর জন্য সময় নষ্ট করতে চায় না অনেকে।’
ছাতা মেরামত করাতে আসা সাহাদাত হোসেন জানান, একসময় বাজারে, রাস্তার মোড়ে কিংবা ফুটপাতে সহজেই কারিগরদের দেখা মিলত।
‘এখন একজন ছাতা মেরামতের কারিগর খুঁজে পেতেই চার-পাঁচজনের কাছে খোঁজ নিতে হয়,’ বলেন তিনি।
প্রযুক্তির পরিবর্তনও এই পেশাকে আরও সংকুচিত করেছে। আনু মিয়ার মতে, আধুনিক অনেক ছাতাই এমনভাবে তৈরি হয়, যা নষ্ট হলে মেরামত করার সুযোগ থাকে না।
তাই নিজের সন্তান কিংবা আত্মীয়স্বজনকে তিনি এই কাজ শেখাতে চান না। ‘এই পেশায় আর কোনো ভবিষ্যৎ দেখি না,’ বলেন তিনি।
তবু নিজে পুরোনো পেশা ছাড়তে পারেননি। কারণ এটাই তার চেনা পৃথিবী। এই কাজেই কেটে গেছে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়।
কুলাউড়া সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইদুল হাসান সিপন বলেন, ‘একসময় এই পেশার যথেষ্ট কদর ছিল। নিম্নআয়ের বহু মানুষের জীবিকা নির্ভর করত ছাতা মেরামতের ওপর। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই রসদ ফুরিয়ে আসছে।’
এই পেশায় কত মানুষ এখনও টিকে আছেন, তার কোনো নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই। কিন্তু আনু মিয়ার জীবনের হিসাব খুব স্পষ্ট।
প্রতিদিন সকালে বাজারে বসা, দিনভর অপেক্ষা করা, আর সন্ধ্যায় প্রায় খালি হাতে ঘরে ফেরা—এটাই এখন তার বাস্তবতা। তবু তিনি বসেন। কারণ এই কাজটাই তার পরিচয়, তার অভ্যাস, তার জীবনের গল্প।
যুগ বদলেছে, মানুষের অভ্যাস বদলেছে, ছাতার ধরন বদলেছে। বদলায়নি শুধু আনু মিয়ার মতো মানুষদের নিরুপায় নিষ্ঠা।
প্রযুক্তির ঝড়ে হয়তো একদিন হারিয়ে যাবে ছাতা মেরামতের এই পেশা। কিন্তু যতদিন হাতে সামান্য শক্তি থাকবে, ততদিন হয়তো আনু মিয়ারা বসে থাকবেন বাজারের কোনো এক কোণে—কারও একটি ভাঙা ছাতা নিয়ে আসার অপেক্ষায়।