তিস্তায় সামান্য পানি বাড়লেই তীর উপচে প্লাবিত হচ্ছে জনপদ
বর্ষায় সামান্য পানি বাড়লেই তিস্তা নদীর দুই তীর উপচে তা ঢুকে পড়ছে চরাঞ্চল, নিম্নভূমি ও লোকালয়ে। অথচ অনেক সময় নদীর পানি বিপৎসীমার নিচেই থাকে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য বলছে, গত এক মাসে দুই দফা তিস্তার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করলেও তা ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টার মধ্যে আবার নেমে আসে। কিন্তু পানির উচ্চতা বিপৎসীমার নিচে নেমে যাওয়ার পরও তিস্তাপাড়ের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল, কৃষিজমি, বসতভিটা ও গ্রামীণ সড়ক প্লাবিত অবস্থায় ছিল।
বিশেষজ্ঞ, পাউবো কর্মকর্তা ও নদীপাড়ের মানুষের অভিন্ন মত—নদীর তলদেশে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ পলি ও বালুই এর মূল কারণ।
এতে তিস্তা তার স্বাভাবিক গভীরতা ও পানি ধারণক্ষমতা হারিয়েছে। ফলে নদী অতিরিক্ত পানি ধারণ করতে পারছে না; অল্প পানিতেই তা দুই তীর উপচে আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে।
রংপুর বিভাগীয় পাউবোর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিব দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘প্রতিবছর উজান থেকে পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে প্রায় ৫ কোটি ঘনমিটার পলি ও বালু তিস্তা নদীতে এসে জমা হয়। দীর্ঘদিন ধরে এই পলি অপসারিত না হওয়ায় নদীর তলদেশ ক্রমেই উঁচু হয়ে গেছে।’
‘অনেক স্থানে নদীর তলদেশ ও তীরবর্তী মূল ভূখণ্ড এখন প্রায় সমান উচ্চতায় অবস্থান করছে। ফলে সামান্য পানি বাড়লেই নদী তা ধারণ করতে না পেরে আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে পানি বিপৎসীমার নিচে থাকলেও চরাঞ্চল ও নিম্নভূমি প্লাবিত হচ্ছে।’
আহসান হাবিব জানান, বাংলাদেশের অংশে তিস্তা নদীতে কখনো পূর্ণাঙ্গ ড্রেজিং হয়নি। কেবল তিস্তা ব্যারেজের আশপাশে সীমিত পরিসরে খনন হয়েছে। ফলে নদীর বুকে পলি জমে শুষ্ক মৌসুমে নদীটি পাঁচ থেকে আটটি পৃথক চ্যানেলে বিভক্ত হয়ে যায়। বর্ষায় কিছু চ্যানেল একীভূত হলেও নদীর ভরাট তলদেশের কারণে পানি দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, আজ বুধবার সকাল ৬টায় ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানির উচ্চতা ছিল ৫১ দশমিক ৯৮ মিটার, যা বিপৎসীমার ১৭ সেন্টিমিটার নিচে। আগের দিন মঙ্গলবার একই পয়েন্টে পানির উচ্চতা ছিল ৫২ দশমিক ২২ মিটার।
কিন্তু উচ্চতা কমলেও লালমনিরহাট, নীলফামারী, গাইবান্ধা, রংপুর ও কুড়িগ্রামের বিভিন্ন চরাঞ্চলের নিচু এলাকা ছিল পানির নিচে। অনেক স্থানে ডুবে গেছে আমন বীজতলা, সবজি খেত, কাঁচা রাস্তা ও বসতভিটার আঙিনা।
লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার চর গড্ডিমারীর ৭৫ বছর বয়সী কৃষক সুরত আলী বলেন, ‘২৫-৩০ বছর আগে তিস্তা অনেক গভীর ছিল। তখন এত সহজে পানি লোকালয়ে ঢুকত না। এখন নদীর বুক আর পাশের জমি প্রায় সমান হয়ে গেছে। একটু পানি বাড়লেই সব ডুবে যায়।’
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার চর মহিপুরের কৃষক হাসমত আলী বলেন, ‘তিস্তায় এখন দুইটা দুর্যোগ—পানি বাড়লে বন্যা, আর পানি নামলে ভাঙন। নদীর গভীরতা না থাকলে পানি ধারণক্ষমতাও থাকে না।’
আধুনিক প্রযুক্তিতে ড্রেজিং করে নদীকে একটি কার্যকর মূল চ্যানেলে ফিরিয়ে আনার দাবি জানান তিনি।
লালমনিরহাট পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী শুনীল কুমার জানান, তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় নদীর আকৃতি ও প্রবাহপথে বড় পরিবর্তন এসেছে।
তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছরে তিস্তা ব্যারেজ ও কাউনিয়া পয়েন্টে নদীর বিপৎসীমার মান চারবার পরিবর্তন করতে হয়েছে। কারণ নদীর তলদেশ ক্রমাগত উঁচু হয়ে যাওয়ায় আগের পরিমাপ বাস্তবতার সঙ্গে আর মিলছে না।’
তার মতে, ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের জলকপাট খুলে দিলে বিপুল পরিমাণ পানি ও পলি একসঙ্গে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। সেই পলি নদীর তলদেশে জমে তিস্তাকে আরও অগভীর করে তুলছে।
জাতীয় তথ্য বাতায়ন অনুসারে, বাংলাদেশ অংশে ১১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ তিস্তা নদী লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। আন্তঃসীমান্ত নদীটি নীলফামারী জেলার কালীগঞ্জ সীমান্ত এলাকা দিয়ে প্রবেশ করে চিলমারি নদী বন্দরের দক্ষিণে ব্রক্ষ্মপুত্র নদের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। উত্তরাঞ্চলের কৃষি, সেচ, মৎস্যসম্পদ, নৌ-যোগাযোগ ও জীবিকার অন্যতম ভিত্তি এই নদী।
‘তিস্তা বাঁচাও, নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদে’র সভাপতি প্রফেসর নজরুল ইসলাম হক্কানী ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘তিন দশক আগেও তিস্তার গভীরতা ছিল অনেক বেশি। এখন নদীর বুক যেন বিশাল বালুর মাঠ। বর্ষায় সামান্য পানি এলেই নদী উপচে পড়ে, আবার সেই পানির সঙ্গে আসা বালু কৃষিজমির ওপর জমে জমিকে অনুর্বর করে দেয়।’
তার মতে, বন্যায় কৃষক ফসল হারান, পানি নেমে গেলে শুরু হয় নদীভাঙন। এতে একদিকে আবাদি জমি আর অন্যদিকে বসতভিটা হারিয়ে বহু পরিবার ভূমিহীন হয়ে পড়ছে।
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম ডেইলি স্টারকে জানান, তিস্তা নদীসংলগ্ন এলাকায় প্রায় ৯০ হাজার হেক্টর আবাদি জমি রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ জমির ওপর বালুর স্তর জমে পূর্ণ উৎপাদনক্ষমতা হারিয়েছে অথবা আংশিক অনাবাদি হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, ‘প্রতি বর্ষায় নতুন করে বালু জমে মাটির উর্বরতা কমে যায়। পাশাপাশি অল্প পানিতেই বন্যা সৃষ্টি হওয়ায় প্রতিবছর ৫ থেকে ৭ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার কৃষক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আগে নদী একটি মূল ধারায় বইত। এখন বালু জমে অনেকগুলো শাখা তৈরি হয়েছে। নিয়মিত ড্রেজিং ছাড়া নদীকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তা না হলে একসময় তিস্তাপাড়ের উর্বর জমিগুলো মরুভূমির মতো অনুর্বর হয়ে যাবে।’
গভীরতা হারিয়ে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমে প্রায়ই প্লাবিত হয়ে তিস্তাপাড়ের বাসিন্দাদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে এই নদীকেন্দ্রিক উত্তরাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও জনজীবনের সংকট আরও গভীর হয়ে উঠতে পারে বলে শঙ্কা বাসিন্দাদের।