ফুটওভারব্রিজ: হাঁটার জায়গা নেই, রাতে বসে মাদকের আড্ডা
রাজধানীর তেজগাঁওয়ের নাবিস্কো মোড়। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত আটটা। তীব্র যানজটের মধ্যেই ফুটওভার ব্রিজের নিচে দুই বছরের সন্তানকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন রিপা রুদ্র। ওভারব্রিজ ব্যবহার না করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি রাস্তা পার হওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করার কারণ জানতে চাইলে রিপা রুদ্র বলেন, ‘আপনি নিজে একবার উঠে দেখেন। তাহলেই বুঝবেন, কেন নিচ দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছি।’
ফুটওভারব্রিজে উঠে দেখা যায়, সেখানে কোনো বাতি নেই। রাস্তার পাশের দোকানগুলোর আলোতেই সিঁড়ি কিছুটা আলোকিত হয়ে আছে। ব্রিজে পা রাখতেই চোখে পড়ে একদল মাদকসেবী। কয়েক গজ দূরেই ভাসমান লোকজন রাত কাটানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এই দৃশ্য শুধু একটি ফুটওভারব্রিজের নয়। পথচারীদের নিরাপদে রাস্তা পারাপারের জন্য কোটি কোটি টাকা সরকারি অর্থ খরচ করে বানানো রাজধানীর অনেক ফুটওভারব্রিজই এখন চরম অবহেলায় পড়ে আছে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এগুলো এখন ভাসমান মানুষের আশ্রয়স্থল, অবৈধ দখল ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের আখড়ায় পরিণত হয়েছে।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ব্যস্ত সড়কগুলোয় মোট ৯২টি ফুটওভারব্রিজ রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটিতে এস্কেলেটরসহ আধুনিক সুযোগ-সুবিধাও রাখা হয়েছে।
কিন্তু নির্মাণের পরই যেন কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। সম্প্রতি রাজধানীর বেশ কয়েকটি পুরোনো ও নতুন ফুটওভারব্রিজ ঘুরে দেখা যায়, তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বেশির ভাগই অপরিষ্কার এবং ভাসমান মানুষের আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে।
পুরান ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত সড়ক জনসন রোডের ফুটওভারব্রিজটি এখন বলতে গেলে একেবারেই পরিত্যক্ত। অথচ এর এক প্রান্তে রয়েছে ঢাকা সিএমএম আদালত এবং অন্য প্রান্তে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
বছরের পর বছর ধরে অবহেলা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মানুষ এই ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করা ছেড়ে দিয়েছে। এর বড় একটি অংশ এখন ভাসমান মানুষ, মাদক কারবারি ও ছিনতাইকারীদের দখলে।
বাংলাবাজারের বাসিন্দা সুব্রত পাল বলেন, ‘দীর্ঘদিনের অবহেলায় ব্রিজটি এখন মানুষের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ এটি ব্যবহার না করায় দিনের বেলাতেই এখানে মাদক বিক্রি হয়। আর রাতে এটি ভাসমান মানুষের দখলে থাকে।’
রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যিক ও পরিবহন হাব ফার্মগেটের অবস্থা আরও ভয়াবহ। এখানে আধা কিলোমিটারের মধ্যেই তিনটি ফুটওভারব্রিজ আছে। এর মধ্যে তেজতুরী পাড়ার দিকের ব্রিজটিতে রাতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নেই। দিনের বেলা কিছুটা নিরাপদ মনে হলেও সন্ধ্যার পর থেকেই এটি মাদকসেবী ও ছিনতাইকারীদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়। স্থানীয়রা জানান, নিরাপত্তার অভাবে অনেকেই রাতে এই ব্রিজ ব্যবহার করেন না।
তেজতুরী বাজার মসজিদ লেন এলাকার বাসিন্দা ও ব্যাংক কর্মকর্তা ফারজানা ইতি দুই সপ্তাহ আগের ভীতিকর অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, ‘যখন সিঁড়ি দিয়ে উঠছিলাম, তখন নাকে বাজে একটা গন্ধ এল। একদল কিশোর ব্রিজের ওপর গোল হয়ে বসে ছিল। আমি যখন তাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন একজন আমার পেছন পেছন আসতে শুরু করে। সে আমাকে বাজে কথা বলে আমার পা স্পর্শ করার চেষ্টা করে। আমি এত ভয় পেয়েছিলাম যে চিৎকারও করতে পারিনি। ওই কয়েকটা মিনিট আমার কাছে অনন্তকাল মনে হচ্ছিল।’
এই ঘটনা তাকে মানসিকভাবে এতটাই নাড়া দিয়েছে যে এখন তিনি ব্রিজটি এড়িয়ে চলেন এবং বিকল্প পথ দিয়ে বাসায় ফেরেন।
ফার্মগেটের আনন্দ সিনেমা হলের কাছের ফুটওভারব্রিজটির অবস্থাও বেশ উদ্বেগজনক। দিনের বেলা এর প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ হকার এবং ভিক্ষুকদের দখলে থাকে। ফলে পথচারীদের হাঁটার জায়গাও থাকে না।
তেজকুনিপাড়ার বাসিন্দা আরিফ হোসেন বলেন, ‘অনেক সময় দূর থেকে বোঝারই উপায় থাকে না যে ব্রিজে ওঠার সিঁড়িটা কোথায়। এত ভিড় থাকে যে বাধ্য হয়ে আমরা অনেক সময় ঝুঁকি নিয়ে নিচ দিয়ে রাস্তা পার হই।’
যা বলছে কর্তৃপক্ষ
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খন্দকার মাহবুব আলম বলেন, ‘আমাদের অধীনে থাকা ৬৪টি ফুটওভারব্রিজের সব কটিই সচল আছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় মিরপুর-১০ এর একটি ব্রিজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। আমরা সেটিসহ আরও নয়টি ব্রিজ সংস্কার করব।’
ফুটওভারব্রিজের রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে তিনি বলেন, এ জন্য আমরা একটি বিশেষ প্রকল্প হাতে নেব। তবে ডিএনসিসির পক্ষে একা সবকিছু করা সম্ভব নয়। হকার ও মাদকসেবীদের কাছ থেকে এগুলো মুক্ত করতে প্রশাসনের আরও সহায়তা প্রয়োজন। আমরা ব্রিজগুলোতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতেও কাজ করছি।
অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সহকারী প্রকৌশলী রাজীব খাদেম দাবি করেন, তাদের অধীন ৩২টি ফুটওভারব্রিজের সব কটি সচল রয়েছে। তিনি বলেন, আমরা সম্প্রতি নিউমার্কেটের সামনের ফুটওভারব্রিজটি পুনর্নির্মাণ করে চালু করেছি। পরিবাগেরটিসহ আরও নয়টি ব্রিজের সংস্কারকাজ চলছে। আমরা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করি।’
ফুটওভারব্রিজগুলোয় হকার ও অবৈধ দখলদারদের বিষয়ে রাজীব খাদেম বলেন, আমরা ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সহায়তায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করি। যখনই কোনো অভিযোগ পাই, সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবস্থা নিই।
নগর–পরিকল্পনাবিদের মত
নগর-পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, এমনিতেই এ দেশের মানুষের মধ্যে ফুটওভার ব্রিজ এড়িয়ে চলার একটা প্রবণতা রয়েছে। এর ওপর পথচারীরা যখন এসব স্থাপনার বেহাল দশা দেখেন, তখন তারা আরও আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।
তিনি বলেন, অনেক ব্রিজই সুবিধাজনক জায়গায় নির্মাণ করা হয়নি। এ ছাড়া সরু ও অনিরাপদ সিঁড়ির কারণেও মানুষ এগুলো ব্যবহার করতে নিরুৎসাহিত হয়।
আদিল মুহাম্মদ খান আরও বলেন, অনেক সময় সাজসজ্জা ও চলন্ত সিঁড়ি লাগিয়ে ফুটওভার ব্রিজগুলোকে আকর্ষণীয় করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু কিছুদিন পরই সেগুলো নোংরা হয়ে যায় এবং চলন্ত সিঁড়িগুলো নষ্ট হয়ে পড়ে থাকে। এতে পথচারীদের ভোগান্তি উল্টো বেড়ে যায়।
ফুটওভারব্রিজগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিষ্কারের জন্য একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থা রাখার ওপর জোর দেন এই নগর-পরিকল্পনাবিদ। তিনি বলেন, ‘নগরবাসীর নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় চলাচল নিশ্চিত করতে এসব স্থাপনা যে সুরক্ষিত, তা আগে নিশ্চিত করতে হবে। তবেই এগুলো নির্মাণের প্রকৃত উদ্দেশ্য সফল হবে।’