জাহাজ ভাঙার সময় যেসব বিষাক্ত রাসায়নিক ও গ্যাসে প্রাণঝুঁকিতে থাকেন শ্রমিকরা

দুলি মল্লিক
দুলি মল্লিক

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলে গড়ে ওঠা জাহাজভাঙা শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো শ্রমিকের জীবন ও স্বাস্থ্যঝুঁকি।

মেয়াদোত্তীর্ণ জাহাজ ভাঙার সময় শুধু ইস্পাত, অ্যাসবেসটস, ভারী ধাতু নয়; বেরিয়ে আসে তেল, বিষাক্ত পেইন্ট, পলিক্লোরিনেটেড বাইফিনাইলসহ (পিসিবি) নানা বিপজ্জনক উপাদান। গ্যাস কাটিংয়ের সময়ও তৈরি হয় বিষাক্ত ধোঁয়া। আবার জাহাজের বদ্ধ অংশে জমে থাকা গ্যাস থেকে ঘটতে পারে অগ্নিকাণ্ড, বিস্ফোরণ কিংবা শ্বাসরোধের মতো ঘটনাও।

স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ইয়াং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশনের (ওয়াইপিএসএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে গত ১৩ বছরে চট্টগ্রামের শিপব্রেকিং ইয়ার্ডগুলোতে মোট ১৬১ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।

গতকাল শুক্রবারও একটি জাহাজ ভাঙার সময় বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয়ে মারা গেছেন ৯ শ্রমিক।

মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান মাইক্রো থিঙ্ক ইনস্টিটিউটের ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই দশকে পর্যাপ্ত সুরক্ষার অভাবে চট্টগ্রামের জাহাজভাঙা শিল্পে কর্মরত ৪০০ জনের বেশি শ্রমিক মারা গেছেন এবং ৬ হাজারের বেশি গুরুতর আহত হয়েছেন।

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের হিসাবে, বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্পে কর্মরত পুরুষ শ্রমিকদের গড় আয়ু জাতীয় গড়ের চেয়ে প্রায় ২০ বছর কম।

সংস্থাটির তথ্য মতে, ২০২০ সাল থেকে প্রায় ২০ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক ৫২০টির বেশি জাহাজ ভাঙার কাজ করেছেন।

এ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিবেদনে জাহাজ ভাঙার সময় বিষাক্ত রাসায়নিক, ভারী ধাতু, ক্ষতিকর গ্যাস ও ধোঁয়া, সেগুলো কীভাবে শ্রমিকদের শরীরে প্রভাব ফেলে এবং তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকির চিত্র উঠে এসেছে।

চট্টগ্রামে একটি জাহাজ ভাঙার কারখানা। ১৭ জুলাই ২০১৩। ছবি: রয়টার্স

বিষাক্ত পদার্থ

২০২৪ সালে নেদারল্যান্ডসভিত্তিক আন্তর্জাতিক জার্নাল হেলিয়নে প্রকাশিত বাংলাদেশের জাহাজভাঙা ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ নিয়ে একটি গবেষণায় জাহাজভাঙার সময় শ্রমিকদের সংস্পর্শে আসতে পারে এমন বেশকিছু বিভিন্ন বিষাক্ত পদার্থের কথা বলা হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে অ্যাসবেসটস, পলিক্লোরিনেটেড বাইফিনাইল (পিসিবি), ট্রিবিউটাইলটিন (টিবিটি), ওজোনস্তর ক্ষয়কারী পদার্থ (ওডিএস), পারদ, সীসা, আর্সেনিক ও ক্রোমিয়াম।

এ ছাড়া, গবেষণাটিতে ডাইঅক্সিন, পলিভিনাইল ক্লোরাইড (পিভিসি), পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন (পিএএইচ) এবং অর্গানোটিনের মতো ক্ষতিকর পদার্থের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এগুলোর মধ্যে অন্যতম বিপজ্জনক পদার্থ হলো অ্যাসবেসটস। পুরোনো জাহাজে থাকা অ্যাসবেসটস কাটাকাটি বা নাড়াচাড়া করার সময় এর সূক্ষ্ম তন্তু বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে পারে। দীর্ঘদিন এর সংস্পর্শে থাকলে ফুসফুসের ক্যানসার, অ্যাসবেসটোসিস ও মেসোথেলিওমার মতো গুরুতর রোগের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

জাহাজে পুরোনো বৈদ্যুতিক তার ও রঙ করা বিভিন্ন অংশে পিসিবি থাকতে পারে। এটি শ্বাসের মাধ্যমে বা ত্বকের সংস্পর্শে শরীরে ঢুকতে পারে বলে গবেষণাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে জাহাজের বিভিন্ন অংশে ব্যবহৃত টিবিটিও শ্রমিকদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

ভারী ধাতুর বিষক্রিয়া

জাহাজের রং, কোটিং ও বিভিন্ন সরঞ্জাম থেকে ছড়িয়ে পড়তে পারে ভারী ধাতু। গবেষণায় বিশেষভাবে পারদ, সীসা, আর্সেনিক ও ক্রোমিয়ামের কথা বলা হয়েছে। এসব ধাতু দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শে শ্রমিকদের শরীরে বিষক্রিয়া তৈরি করতে পারে।

২০২৫ সালে ‘বাংলাদেশের চট্টগ্রামে জাহাজভাঙা শিল্পে পেশাগত আঘাত ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি: আইন বাস্তবায়নে একটি চ্যালেঞ্জ’ শিরোনামে মাইক্রোথিঙ্ক ইনস্টিটিউট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, একটি স্ক্র্যাপ জাহাজের ওজন ৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার টন পর্যন্ত হতে পারে। গড় ওজন ১৩ হাজার টনের বেশি। প্রতিটি জাহাজ থেকে গড়ে ১০ থেকে ১০০ টন বিষাক্ত পেইন্ট বের হতে পারে। এসব পেইন্টে সীসা, ক্যাডমিয়াম, আর্সেনিক, দস্তা ও ক্রোমিয়াম থাকতে পারে।

তেলবাহী ট্যাংকারে আবার প্রায় ১ হাজার ঘনমিটার পর্যন্ত অবশিষ্ট তেল, হাইড্রোলিক তেল ও লুব্রিকেন্ট থাকতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এসব পদার্থ সরানোর সময় শ্রমিকেরা সরাসরি রাসায়নিকের সংস্পর্শে এলে চর্মরোগসহ দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

চট্টগ্রামের একটি জাহাজ ভাঙার কারখানায় কাজের মাঝে শ্রমিকরা বিশ্রাম নিচ্ছেন। ১৯ আগস্ট, ২০০৯।  ছবি: রয়টার্স

গ্যাস ও বিষাক্ত ধোঁয়া

জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে বিপদের আরেকটি বড় উৎস হলো বিভিন্ন গ্যাস ও কাটিংয়ের ধোঁয়া। হেলিয়নে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে ফ্রেয়ন, এলপিজি, অ্যামোনিয়া ও কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মতো গ্যাসের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। জাহাজের সিলিন্ডার বা বিভিন্ন সিস্টেম থেকে এসব গ্যাস বের হলে শ্রমিকদের শ্বাসকষ্ট, বিষক্রিয়া ও শ্বাসরোধের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে জাহাজের বদ্ধ জায়গায় পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল না থাকলে ঝুঁকি আরও বাড়ে।

জাহাজ কাটার সময় গ্যাস কাটার বা গরম কাজের ফলে বিষাক্ত ধোঁয়া ও ধাতব কণা তৈরি হয়। এসব ধোঁয়া দীর্ঘসময় শ্বাসের সঙ্গে শরীরে গেলে ফুসফুসের বিভিন্ন সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া, বর্জ্য তেল ও জাহাজের তলদেশে জমা হওয়া বিষাক্ত তরল পরিষ্কার ও অপসারণের সময়ও শ্রমিকেরা রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসতে পারেন।

স্বাস্থ্যঝুঁকি

ফুসফুসের যে চিত্র পাওয়া গেছে

জাহাজভাঙা শ্রমিকদের মধ্যে এসব ঝুঁকির বাস্তব প্রভাবের একটি চিত্র পাওয়া যায় ২০১৯ সালের একটি গবেষণায়। ২০১৯ সালের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পের ১২০ পুরুষ শ্রমিকের ওপর কর্মস্থল সম্পর্কিত শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা নিয়ে গবেষণাটি করা হয়।

অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে—

  • ৭১ শতাংশ ৫ বছরের কম সময় ধরে এ শিল্পে কাজ করছিলেন

  • ৯৫ দশমিক ৮ শতাংশের আগে কোনো শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা ছিল না

  • কিন্তু ৬৩ দশমিক ৩ শতাংশ মনে করেন, জাহাজভাঙার কাজের কারণে তাদের শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা দিন দিন বাড়ছে

  • ৮৫ শতাংশ কর্মস্থলে ঠান্ডা লাগা বা হাঁচির কথা জানিয়েছেন

  • প্রায় ৮০ শতাংশ ছুটির দিনে নিজেদের তুলনামূলক ভালো অনুভব করতেন

শুধু উপসর্গের কথা নয়, শ্রমিকদের ফুসফুস কতটা ভালোভাবে বাতাস গ্রহণ ও বের করতে পারছেন, তার জন্য পালমোনারি ফাংশন টেস্ট (স্পাইরোমেট্রি) করে দেখেন গবেষকরা।

ফলাফলে দেখা যায়—

  • মাত্র ২০ দশমিক ৮৩ শতাংশের ফুসফুসের কার্যকারিতা স্বাভাবিক

  • ৫৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ শ্রমিক ফুসফুস থেকে দ্রুত বাতাস বের করে দিতে পারছেন না

  • ২০ দশমিক ৮৩ শতাংশ শ্রমিকের ফুসফুসের মোট ধারণক্ষমতা কমে গেছে এবং দ্রুত বাতাস বের করে দিতে সমস্যা হয়  

গবেষণায় অংশ নেওয়া শ্রমিকদের প্রায় ৭৯ শতাংশের ফুসফুসের পরীক্ষায় স্বাভাবিক ফল পাওয়া যায়নি।

দুর্ঘটনায় হতাহত

২০০০ সালের ৩১ মে ইরানি ট্যাংকার ‘টিটি দেনা’ বিস্ফোরণের ঘটনা তুলে ধরা হয় মাইক্রো থিঙ্ক ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদনে। ওই ঘটনায় ৫০ জন শ্রমিক মারা যান।

প্রতিবেদনে জাহাজের ওপরের ডেক থেকে ভারী লোহার প্লেট পড়া, গ্যাস বিস্ফোরণ ও বদ্ধ জায়গায় গ্যাস জমে শ্রমিকদের দম বন্ধ হয়ে যাওয়াকে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৩ সালে প্রকাশিত হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও এনজিও শিপব্রেকিং প্ল্যাটফর্মের ৯০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে শ্রমিকদের কর্মপরিবেশের আরও বিস্তারিত চিত্র পাওয়া যায়।

শ্রমিকরা জানিয়েছেন, তাদের পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ ও নিরাপদে কাজের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দেওয়া হয় না। অনেকে গরম ধাতু কাটার সময় সাধারণ মোজাকে গ্লাভস হিসেবে ব্যবহার করেন। বিষাক্ত ধোঁয়া থেকে বাঁচতে জামা দিয়ে মুখ ঢাকেন। আবার অনেকে খালি পায়ে ভারী লোহার টুকরা বহন করেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, শ্রমিকেরা অনেক সময় কর্মস্থলে আহত হলেও পর্যাপ্ত চিকিৎসা, বিশ্রাম বা ক্ষতিপূরণ পান না। অনেক শ্রমিকের আনুষ্ঠানিক নিয়োগপত্রও থাকে না।

জার্মান গণমাধ্যম ডয়চে ভেলের এক ডকুমেন্টারিতে দাবি করা হয়েছে, শিপইয়ার্ডের আশপাশে ভারী ধাতুর ঘনত্ব বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মানের চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা জাহাজভাঙাকে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

আইন আছে, বাস্তবায়ন কতটা?

জাহাজভাঙা শিল্পের ঝুঁকি কমাতে বাংলাদেশে জাতীয় আইন ও আন্তর্জাতিক চুক্তি রয়েছে। মাইক্রো থিঙ্ক ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬, জাহাজভাঙা ও রিসাইক্লিং বিধিমালা ২০১১, বাংলাদেশ জাহাজ রিসাইক্লিং আইন ২০১৮ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাসেল কনভেনশন ও হংকং কনভেনশনের কথাও বলা হয়েছে। বাংলাদেশ ২০২৩ সালের ২৬ জুন হংকং কনভেনশন মেনে চলতে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মত হয়।

বাংলাদেশের শ্রম আইনের অধীনে কর্মক্ষেত্রে কোনো শ্রমিক মারা গেলে তার পরিবারকে ২ লাখ টাকা এবং স্থায়ী পঙ্গুত্বের ক্ষেত্রে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণের বিধান রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনটির মতে, শ্রমিকদের জীবনের ঝুঁকির তুলনায় এই ক্ষতিপূরণের পরিমাণ অত্যন্ত কম।

হংকং কনভেনশনে জাহাজ পুনর্ব্যবহারকে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব করার জন্য হংকং কনভেনশনে শ্রমিক ও পরিবেশ সুরক্ষার বিভিন্ন বিধান রয়েছে।

হেলিয়নের গবেষণা প্রতিবেদনে হংকং কনভেনশনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা তুলে ধরা হয়েছে।

  • জাহাজ পুনর্ব্যবহারের কার্যক্রমে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ঠেকানোর দায়িত্ব ইয়ার্ডের।

  • বিপজ্জনক পদার্থের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা।

  • জাহাজে থাকা ক্ষতিকর বর্জ্য ও বিপজ্জনক রাসায়নিক অপসারণ ও ব্যবস্থাপনার সময় শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

জরুরি প্রস্তুতি: অগ্নিকাণ্ড, বিস্ফোরণ, বিষাক্ত গ্যাস নির্গমন বা দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জরুরি পরিকল্পনা থাকতে হবে। নিয়মিত মহড়ার ব্যবস্থাও থাকতে হবে।

শ্রমিকের নিরাপত্তা ও প্রশিক্ষণ: শ্রমিকদের পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম দিতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শ্রমিক ও ঠিকাদারের কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণও দিতে হবে।

দুর্ঘটনা ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের তথ্য: কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা এবং পেশাগত বা দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঘটনা রেকর্ড ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে।

মূল সমস্যা কোথায়?

গবেষণা, মানবাধিকার প্রতিবেদন ও ডকুমেন্টারির তথ্য একসঙ্গে দেখলে জাহাজভাঙা শিল্পের ঝুঁকিকে তিনটি স্তরে দেখা যায়।

১. তাৎক্ষণিক প্রাণঘাতী ঝুঁকি: আগুন, বিস্ফোরণ, ভারী লোহার অংশ পড়ে যাওয়া, উচ্চতা থেকে পড়ে যাওয়া এবং বদ্ধ জায়গায় বিষাক্ত গ্যাস বা অক্সিজেনের ঘাটতির কারণে শ্বাসরোধ।

২. কর্মস্থলজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি: জাহাজ কাটার ধোঁয়া, ধাতব কণা, অ্যাসবেস্টস ও বিভিন্ন রাসায়নিকের সংস্পর্শে কাশি, শ্বাসকষ্ট, বুকে চাপ এবং ফুসফুসের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি।

৩. দীর্ঘমেয়াদি বিষক্রিয়া: অ্যাসবেসটস, সীসা, পারদ, আর্সেনিক, ক্রোমিয়ামসহ বিভিন্ন বিপজ্জনক পদার্থের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শে গুরুতর রোগের ঝুঁকি।

এসব তথ্য থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট, জাহাজভাঙার ঝুঁকি শুধু শ্রমিকের হাতে থাকা গ্যাস কাটার বা মাথার ওপর ঝুলে থাকা লোহার প্লেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি পুরোনো জাহাজ ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে তার ভেতরে থাকা বহু বছরের রাসায়নিক, ভারী ধাতু, তেল ও অন্যান্য বিপজ্জনক পদার্থও শ্রমিক ও পরিবেশের সামনে চলে আসে।

আন্তর্জাতিক নিয়মে এসব ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের জন্য যেসব ব্যবস্থা—বিপজ্জনক পদার্থের তালিকা, গ্যাস পরীক্ষা, পিপিই, প্রশিক্ষণ, জরুরি পরিকল্পনা, চিকিৎসা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা—থাকার কথা, বাস্তবে সেগুলো কতটা কার্যকরভাবে মানা হচ্ছে, সেটাই বড় প্রশ্ন।

জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিকদের নিরাপত্তা, কর্মপরিবেশ এবং শ্রম আইন বাস্তবায়নে মূল তদারকি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে এই অধিদপ্তর মূলত শ্রমিকদের পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা তদারকি, ইয়ার্ডে শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত, সেফটি কমিটি গঠন ও তাদের নিয়মিত কাজ ও দুর্ঘটনা তদন্তের কাজ করে থাকে।

যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রাম কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমরা সাধারণত শ্রম আইনের আলোকে পরিদর্শনের সময় শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়গুলো দেখে থাকি। কিন্তু বিষাক্ত রাসায়নিক ও গ্যাসের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে গেলে তা অত্যন্ত গভীর ও কারিগরি দক্ষতার বিষয়। এটি সাধারণত আমাদের দপ্তরের আওতায় পড়ে না।’

তিনি বলেন, ‘শিপব্রেকিং বিশেষায়িত খাত হলেও এখানে অন্যান্য শিল্পের মতো স্থায়ী, অভিজ্ঞ বা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রশিক্ষিত শ্রমিকের ঘাটতি রয়েছে। নতুন ও অনভিজ্ঞ শ্রমিকরা নিয়মিত এই কাজে যুক্ত হওয়ায় তাদের নিরাপত্তা ও কারিগরি ঝুঁকি বোঝাতে বেশ বেগ পেতে হয়। এই খাতে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।’

তার মতে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জাহাজভাঙা শিল্পে কাজের পদ্ধতি দ্রুত বদলে ফেলা সম্ভব নয়। এর জন্য সরকারের অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাসহ সবার সম্মিলিত উদ্যোগ ও সচেতনতা জরুরি।