শিপইয়ার্ডে শ্রমিকের মৃত্যু

‘আর ২০ সেকেন্ড থাকলে আমিও মরে যেতাম’

 এফ এম মিজানুর রহমান
এফ এম মিজানুর রহমান

অন্যান্য দিনের মতো আজ শুক্রবার সকালে সীতাকুণ্ড শিপইয়ার্ডে জাহাজ ভাঙার কাজে যান মোহাম্মদ সেলিম। তার আগেই কয়েকজন সহকর্মী প্রথমে জাহাজের ভেতরে ঢোকেন।

বাইরে থেকে ভেতরে যাওয়ার সময় হঠাৎ ‘গ্যাস! গ্যাস!’ চিৎকার ও কান্নাকাটি শুনতে পান সেলিম।

'তাদের উদ্ধার করতে আমরা দ্রুত ভেতরে দৌড়ে যাই। কিন্তু ভেতরে ঢোকার পর বিষাক্ত গ্যাসের তীব্রতায় বেরিয়ে আসতে বাধ্য হই। মুখে মাস্ক থাকলেও ওই গ্যাস এত বিষাক্ত ছিল যে, মনে হয় আর ২০ সেকেন্ড ভেতরে থাকলে আমিও মারা যেতাম,' দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন তিনি।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সেলিম এভাবেই সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর ফেরদৌস শিপইয়ার্ডের আজ সকালের ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন।

তিনি এখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ক্যাজুয়ালটি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন।

ফেরদৌস স্টিল রিমেল্টিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত ৯ শ্রমিক মারা গেছেন। আর অল্পের জন্য বেঁচে যান সেলিম।

তিনি বলেন, 'যে জাহাজে দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেটির চারপাশ গত কয়েক মাস ধরে কাটা হচ্ছিল। জাহাজটিতে আগে এলএনজি পরিবহন করা হতো। এ কারণে ভেতরে প্রচুর গ্যাস জমে ছিল। আজ প্রথমে কয়েকজন যখন জাহাজ কাটার জন্য ভেতরে ঢুকল, তখন পানির সংস্পর্শে গ্যাস চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। যারা তাদের উদ্ধার করতে ভেতরে ঢুকেছিল, তারাও গ্যাসে অসুস্থ হয়ে পড়ে।'

'অনেকের মুখেই মাস্ক ছিল। কেউ কেউ কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছিলেন। কিন্তু গ্যাসের তীব্রতা ছিল ভয়াবহ। ঢোকার পর দ্রুত বাইরে আসার পর আমি জ্ঞান হারাই। যারা ভেতরে উদ্ধার করতে গিয়েছিল তাদের বেশিরভাগই বিষাক্ত গ্যাসে অসুস্থ হয়ে পড়ে,' সেলিম বলেন।

গত ১৮ বছর ধরে এই জাহাজ কাটার পেশায় রয়েছেন সেলিম। 'কিন্তু এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি আগে হইনি,' বলেন তিনি।

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৯ জন মারা গেছেন। তাদের মধ্যে ৮ জনের পরিচয় নিশ্চিত করেছে পুলিশ।

তারা হলেন—ভাটিয়ারীর পলাশ দাস ও সানি দাস, গাইবান্ধার মোহাম্মদ খোকন মিয়া, মোহাম্মদ মনসুর, আব্দুল আলিম সুজন, মো. রানা, নাসির উদ্দিন এবং মিরসরাইয়ের সোনাইছড়ির মো. মতিউর রহমান।

সুজন শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে সহকারী সেফটি ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত ছিলেন বলে তার পরিবার নিশ্চিত করেছে।

নিহত খোকন মিয়ার স্বজন আঙ্গুর আলী গত ৩৫ বছর ধরে সীতাকুণ্ডে শিপব্রেকিং শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'খোকন শিপব্রেকিংয়ে গ্যাস কাটিংয়ের কাজ করতেন। তার সহকর্মীরা আমাকে জানিয়েছেন, ভেতর থেকে চিৎকার শুনে তিনি অন্যদের উদ্ধার করতে জাহাজে ঢোকেন। পরে নিজেই আটকে পড়েন।'

চমেক হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আলাউদ্দিন দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, গ্যাসে অসুস্থ হয়ে পড়া শ্রমিকদের কয়েকজনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক ৫ জনকে মৃত ঘোষণা করেন।

চমেক হাসপাতালের মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে নিহত আব্দুল আলিম সুজনের ছোট ভাই আব্দুল আউয়াল সুভাষ বলেন, 'আমার ভাই অন্যদের বাঁচাতে গিয়ে মারা গেছেন। প্রথমে তিনি একজনকে উদ্ধার করে উপরে নিয়ে আসে। এরপর যখন আবার নিচে নামেন, তখন বিষাক্ত গ্যাসে অসুস্থ হয়ে পড়েন।'

সুজন প্রায় দেড় বছর আগে এই ইয়ার্ডে যোগ দিয়েছিলেন বলে জানান তিনি।

নিহত রানার চাচাতো ভাই মোহাম্মদ কাওসার বলেন, 'রানা প্রায় ৫-৬ মাস আগে ইয়ার্ডে কাজ শুরু করে। তার পরিবারের ফোন পেয়ে আমি চমেক হাসপাতালে যাই। গিয়ে শুনি মারা গেছে।'

আহতদের দেখতে চমেক হাসপাতালে যান চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিয়া।

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, 'জাহাজটি ভাঙার কাজ প্রায় শেষদিকে ছিল। আজ কাজ শুরু হওয়ার পর গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে। প্রাথমিকভাবে আমরা জানতে পেরেছি, কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস ছড়িয়ে পড়ার কারণে অক্সিজেনের অভাবে অনেকে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরে যারা উদ্ধার করতে যান, তারাও অসুস্থ হয়ে পড়েন।'

নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

জেলা প্রশাসক জানান, জাহাজের গ্যাস নিয়ন্ত্রণে কেমিস্টদের একটি দল এবং সেনাবাহিনীর একটি দল কাজ করছে।

'তদন্তে এ ঘটনায় কারখানা কর্তৃপক্ষের কোনো অবহেলা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে,' যোগ করেন তিনি।