বর্ষায় ঢাকার সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি বন্ধের সিদ্ধান্ত

বাহরাম খান
বাহরাম খান
মোহাম্মদ জামিল খান
মোহাম্মদ জামিল খান

বর্ষা মৌসুমে রাজধানীর সড়ক মেরামত ও খোঁড়াখুঁড়ি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সেইসঙ্গে অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশার চার্জিং স্টেশন উচ্ছেদের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।

একই সড়কে বারবার খোঁড়াখুঁড়ি এড়াতে ওয়াসা, রাজউক, ডেসকো ও তিতাসসহ বিভিন্ন সেবা ও উন্নয়ন সংস্থাকে নিজেদের কাজের সময়সূচির মধ্যে সমন্বয় করতে হবে।

চলমান ও পরিকল্পিত মেগা প্রকল্পের কারণে সৃষ্ট যানজট কমানো এবং স্বাভাবিক যান চলাচল নিশ্চিত করতে গত ১৫ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রাজধানীতে সড়ক, ইউটিলিটি ও উন্নয়নকাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন।

নির্মাণকাজ ও যান চলাচলের ওপর এর প্রভাব কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সে বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) বৈঠকে বিভিন্ন প্রস্তাব ও নির্দেশনা উপস্থাপন করে।

এসব প্রস্তাব ও নির্দেশনার একটি কপি দ্য ডেইলি স্টারের হাতে এসেছে।

সূত্র জানায়, বৈঠকে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার আনিসুর রহমান রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সড়ক খোঁড়াখুঁড়ির ছবি ও ভিডিও উপস্থাপন করেন।

এতে উপস্থিত কর্মকর্তারা জানান, ইউটিলিটি স্থানান্তর ও নির্মাণকাজের মধ্যে সমন্বয় করতে হবে, যাতে একসঙ্গে একাধিক কাজ সম্পন্ন করা যায়। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আরও একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে বলেও জানান তারা।

অবৈধ চার্জিং স্টেশন বন্ধ

বৈঠকে যান চলাচলে বিশৃঙ্খলার অন্যতম কারণ হিসেবে ব্যাটারিচালিত রিকশাকে চিহ্নিত করা হয়। রাজধানীজুড়ে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এসব রিকশার চার্জিং স্টেশনগুলো বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তবে কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, এসব উচ্ছেদ অভিযানে বিভিন্ন বাধার মুখে পড়তে হতে পারে।

সূত্র জানায়, মিরপুরে একটি চার্জিং স্থাপনার বিরুদ্ধে রাতে অভিযান চালাতে গিয়ে কর্মকর্তারা বাধার মুখে পড়েছিলেন। এমন অভিযান নিয়ে ভবিষ্যত পরিকল্পনায় ওই অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিতে বলা হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।

বৈঠকের পর ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করে পরিচালিত চার্জিং পয়েন্টগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং অনেক অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।

ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলোকে একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর আওতায় আনতে সরকার কাজ করছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

সড়ক খোঁড়ার আগে ডিএমপির অনুমোদন

বৈঠকে উপস্থাপিত নির্দেশনায় সড়ক মেরামত ও খোঁড়াখুঁড়ির অনুমোদন প্রক্রিয়া আরও কঠোর করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সড়ক খোঁড়ার আগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি), ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি), সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরসহ অন্যান্য সংস্থাকে সংশ্লিষ্ট ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগের মতামত নিতে হবে।

আবেদনের সঙ্গে কাজের ফলে সৃষ্ট সম্ভাব্য যান চলাচল পরিস্থিতি, ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান (টিএমপি) এবং কাজের সময়সূচি দিতে হবে। কাজ শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও ডিএমপির ট্রাফিক কর্মকর্তারা যৌথভাবে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করবেন।

গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ক্ষেত্রে যান চলাচলের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব যাচাই করতে পরীক্ষামূলকভাবে কাজ শুরুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বিকল্প কোনো সড়ক থাকলে নির্মাণকাজের সুবিধার্থে শাখা সড়ক সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা যেতে পারে।

ঠিকাদারদেরও লিখিত অঙ্গীকারনামা দিতে হবে এবং সড়ক খোঁড়ার আগে ট্রাফিক ক্লিয়ারেন্স নিতে হবে।

মেরামত কাজ হবে রাতে

আরেকটি প্রস্তাবে—নির্মাণ ও মেরামত কাজের বড় একটি অংশ দিনের ব্যস্ত সময়ের পরিবর্তে রাতে করার কথা বলা হয়েছে।

রোব থেকে বৃহস্পতিবার রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টার মধ্যে নির্মাণকাজ করতে হবে। তবে কাজ দ্রুত শেষ করতে শুক্র ও শনিবার দিন-রাত কাজ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

কাজের এলাকায় প্রশিক্ষিত ট্রাফিক কর্মী, সতর্কতামূলক সাইন, ফ্ল্যাশিং লাইট ও ব্যারিয়ার রাখার কথাও বলা হয়েছে নির্দেশনায়। নির্মাণসামগ্রী কোনোভাবেই যান চলাচলের লেনে রাখা বা কোনো উপায়ে পথচারীদের চলাচলে বাধা দেওয়া যাবে না।

যান চলাচল অন্য পথে সরিয়ে দেওয়ার কারণে বিকল্প সড়কে কোনো গর্ত বা ক্ষতি হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাকেই তা মেরামত করতে হবে।

যান চলাচলে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে—এমন প্রকল্পের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় ট্রাফিক ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (টিআইএ) অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এতে শুধু নির্মাণস্থল নয়, ঢাকার বৃহত্তর সড়ক নেটওয়ার্কের ওপর প্রকল্পের প্রভাবও মূল্যায়ন করা হবে।

প্রকল্প কর্তৃপক্ষকে যানজট, বিলম্ব এবং ‘লেভেল অব সার্ভিস’-এর ভিত্তিতে যান চলাচল অন্য পথে সরিয়ে নেওয়ার সম্ভাব্য বিভিন্ন পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে হবে। এরপর সবচেয়ে কার্যকর বিকল্পটি নির্বাচন করতে হবে।

পরে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগে বিস্তারিত ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট বা ডাইভারশন প্ল্যান জমা দিতে হবে।

কাজে দেরি হলে জরিমানা

কাজ শুরুর আগে ঠিকাদারদের প্রকল্প শেষ করার সময়সূচি জমা দিতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হলে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী জরিমানাসহ ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

নথি অনুযায়ী, কাজ শেষ হওয়ার সনদ (ওয়ার্ক কমপ্লিশন সার্টিফিকেট) দেওয়ার সময় ঠিকাদারের বিষয়ে ডিএমপির মূল্যায়নও বিবেচনায় নেওয়া হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বড় প্রকল্প ও বিভিন্ন সংস্থার জন্য ফোকাল পয়েন্ট নির্ধারণ করা হয়েছে। কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনায় প্রতি ১৫ দিন পরপর সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হবে।

তিনি বলেন, একটি সংস্থা কাজ শেষ করার পরপরই যাতে আরেকটি সংস্থা এসে একই সড়ক খুঁড়ে না ফেলে, তা নিশ্চিত করাই এর লক্ষ্য। এতে জনভোগান্তি কমার পাশাপাশি সময় ও অর্থের অপচয়ও রোধ হবে।